এমন ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতির ক্ষেত্রে রাজনৈতিকভাবে পদক্ষেপ নেয়ার সক্ষমতা প্রয়োজন। থিংক ট্যাংক, স্বাধীন গণমাধ্যম, ফাউন্ডেশন, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলোর আরো শক্তিশালী ও পরস্পর-সংযুক্ত একটি ইউরোপপন্থী উদার-গণতান্ত্রিক ইকোসিস্টেম তৈরি করা উচিত।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি যদি রাশিয়ার আগ্রাসন, চীনা রফতানি কিংবা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প না হয়ে এলে জোটের ভেতর থেকেই আসে, তাহলে কী হবে? স্পেন, ফ্রান্স, পোল্যান্ড এবং জার্মানির কয়েকটি রাজ্যে নির্বাচন সামনে রেখে উদারনৈতিকতাবিরোধী ও জাতীয়তাবাদী শক্তিগুলো ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে উঠছে। ফলে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও দিন দিন বাড়ছে। এসব দল ক্ষমতায় এলে তারা ভেতর থেকেই ইউরোপীয় ইউনিয়নকে (ইইউ) ফাঁপা করে দিতে পারে, এর মৌলিক মূল্যবোধগুলোকে দুর্বল করতে পারে এবং সম্মিলিত পদক্ষেপে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। ইইউর বর্তমান উদার-গণতান্ত্রিক রূপের সমর্থকদের সামনে ঘনিয়ে আসা এ ঝড়ের বাস্তবতা স্বীকার করতে হবে এবং নতুন রাজনৈতিক কৌশল ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার মাধ্যমে এর মোকাবেলার প্রস্তুতি নিতে হবে।
কয়েক দশক ধরে ইউরোপীয় একীভবনের ভিত্তি ছিল এ ধারণা যে বারবার সংকট দেখা দিলেও সদস্য রাষ্ট্রগুলো ইইউর টিকে থাকা ও সফলতার প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সেই ধারণা এখন আর কার্যকর নয়। ইউরোপবিরোধী শক্তিগুলো এখন শুধু ইইউর নীতিকেই চ্যালেঞ্জ করছে না; তারা যৌথ সার্বভৌমত্ব থেকে শুরু করে অভিন্ন নিয়মকানুন পর্যন্ত একীভবনের মূল দর্শনকেই চ্যালেঞ্জ করছে। তবে জোট ভেঙে দেয়া বা জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা না করে ইউরোপের উগ্র ডানপন্থী ও জনতুষ্টিবাদীরা এখন ভিন্ন একটি পথ বেছে নিয়েছে: অতিরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করা, জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রাধান্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা এবং ভেটো ক্ষমতা বাড়ানোর মাধ্যমে রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে ইইউকে অকার্যকর করে দেয়া। এতে ইইউ জাতীয় সরকারগুলোর মধ্যে দরকষাকষির একটি ক্ষেত্র মাত্র হয়ে পড়বে।
জার্মানির অলটারনেটিভ ফুর ডয়েচল্যান্ড বা এএফডির কথাই ধরা যাক। সম্প্রতি ইউরোপীয় পার্লামেন্টে দলটি তাদের ‘ইউরোপের জন্য নতুন চুক্তি’ উপস্থাপন করেছে। এএফডির পরিকল্পনায় সরাসরি নির্বাচিত ইউরোপীয় পার্লামেন্ট বিলুপ্ত করে তার জায়গায় জাতীয় পার্লামেন্টগুলোর মনোনীত প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি সংস্থা গঠনের কথা বলা হয়েছে।
এএফডি ইউরোপীয় কমিশনের ক্ষমতা মারাত্মকভাবে সীমিত করা, ইইউ আইনের প্রাধান্য সংকুচিত করা, ইউরোপীয় বিচার আদালতকে একটি আন্তঃসরকারি সালিশি প্যানেলে রূপান্তর করা এবং অভিন্ন ইইউ নীতি থেকে জার্মানিকে বেরিয়ে থাকার সুযোগ দেয়ার প্রস্তাবও দিয়েছে। একই ধারায় হাঙ্গেরির মাথিয়াস করভিনাস কলেজিয়াম—ভিক্টর অরবানের সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে যে থিংক ট্যাংকটিকে অর্থায়ন করেছিল এবং যা পরবর্তী সময়ে বিলুপ্ত করা হয়েছে—গত বছর ইইউ ভেঙে দিয়ে নতুন একটি আন্তঃসরকারি ‘ইউরোপীয় অর্থনৈতিক ইউনিয়ন’ প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়েছিল।
এসব কৌশল বাস্তবায়ন হলে আমরা যে ইইউকে চিনি, সেটি ধ্বংস হয়ে যাবে। একক বাজার, অভিন্ন মুদ্রা, অবাধ চলাচল, স্বাধীন প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক, ব্যবসা ও মৌলিক অধিকার সুরক্ষাকারী বিধিবিধানসহ বড় অর্জনগুলো ঝুঁকির মুখে পড়বে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সমৃদ্ধি ধরে রাখা এবং অভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার সম্মিলিত সক্ষমতা হারিয়ে যাবে। ভূরাজনৈতিক সংঘাত, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, প্রযুক্তিগত বিপর্যয় এবং গণতান্ত্রিক পশ্চাৎপসরণের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ এ ‘স্থায়ী পরিবর্তনের’ যুগে একটি অচল ইইউ ইউরোপীয়দের আরো ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলবে এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ গঠনের ক্ষমতা কমিয়ে দেবে। এর অর্থ হলো আমাদের ইইউর বাইরেও তাকাতে হবে এবং আমি যাকে ‘ইইউরোপ’ বলি, তার ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে হবে। এটি এমন একটি বিস্তৃত ধারণা, যার মধ্যে ইইউ, ইউরোপ মহাদেশ এবং সহযোগিতার সম্ভাব্য বিকল্প কাঠামোগুলো অন্তর্ভুক্ত। নিছক ভৌগোলিক বা প্রাতিষ্ঠানিক শ্রেণীবিন্যাসের চেয়ে ‘ইইউরোপ’ এমন একটি আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন, যার উদ্দেশ্য ইউরোপীয় একীভবনকে অনন্য করে তোলা বৈশিষ্ট্যগুলো সংরক্ষণ ও এগিয়ে নেয়া: সার্বভৌম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো ক্ষমতা ভাগ করে নেবে, অভিন্ন নিয়ম মেনে চলবে এবং একসঙ্গে নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলবে। এটি আরো সক্ষম, সংকট ও ভবিষ্যৎ মোকাবেলায় অধিক প্রস্তুত এমন একটি জোটের ইতিবাচক ধারণা দেয়, যা নাগরিকদের সুরক্ষা দেবে, অভিন্ন জনকল্যাণে বিনিয়োগ করবে এবং ইউরোপীয় স্বার্থ ও মূল্যবোধ রক্ষা করবে।
এ দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবায়নের প্রথম পদক্ষেপ হলো বিদ্যমান ইউনিয়নকে রক্ষা ও সংস্কার করা। এর জন্য অভ্যন্তরীণ হুমকি থেকে ইইউর মৌলিক মূল্যবোধ ও প্রতিষ্ঠান রক্ষার সক্ষমতা শক্তিশালী করতে হবে। সদস্য রাষ্ট্রগুলোর পক্ষ থেকে এর গণতান্ত্রিক ও অতিরাষ্ট্রীয় ভিত্তিকে পরিকল্পিতভাবে দুর্বল করার প্রচেষ্টার জবাব দিতে ইইউকে আরো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের সক্ষমতা দিতে হবে, যার মধ্যে আরো শক্তিশালী আর্থিক শর্তারোপও থাকবে। একই সঙ্গে ইচ্ছুক দেশগুলোর একটি জোটকে আরো গভীর একীভবনের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে—অগ্রাধিকার হিসেবে ইইউ কাঠামোর ভেতরে এবং প্রয়োজন হলে এর বাইরেও। ক্রমে বৈচিত্র্যপূর্ণ হয়ে ওঠা একটি ইইউতে ঐক্যের অর্থ একরূপতা হতে পারে না।
ইইউ চুক্তিগুলোতে বর্ধিত সহযোগিতার বিধান রয়েছে, যার মাধ্যমে অন্তত নয়টি সদস্য রাষ্ট্র আরো অগ্রসর একীভবনের পথে এগোতে পারে। ইচ্ছুক সরকারগুলোর এ ব্যবস্থাটি আরো উচ্চাকাঙ্ক্ষার সঙ্গে ব্যবহার করা উচিত এবং আইনগতভাবে যেখানে সম্ভব, সেখানে আরো এক ধাপ এগিয়ে নিজেদের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দেয়া উচিত, যাতে কোনো একটি দেশ সম্মিলিত পদক্ষেপ আটকে দিতে না পারে।
যেখানে এসব ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়, সেখানে ইচ্ছুক দেশগুলোর ইইউ কাঠামোর বাইরে সহযোগিতা করার প্রয়োজন হতে পারে। এ ধরনের ব্যবস্থা অবশ্যই ব্যতিক্রমী হতে হবে, অন্যদের জন্য উন্মুক্ত থাকতে হবে, ইইউ আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে, স্বচ্ছ হতে হবে, গণতান্ত্রিক জবাবদিহির আওতায় থাকতে হবে এবং শেষ পর্যন্ত ইউনিয়নের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার লক্ষ্য রাখতে হবে। এসব ব্যবস্থার উদ্দেশ্য হওয়া উচিত অতিরাষ্ট্রীয় একীভবনকে শক্তিশালী করা, ইইউবিরোধী শক্তিগুলোর পক্ষে প্রস্তাবিত আন্তঃসরকারি দরকষাকষিকে স্থায়ী করে তোলা নয়।
আর যদি উদারনৈতিকতাবিরোধী ও জাতীয়তাবাদী শক্তিগুলো ইইউকে এতটাই অকার্যকর করে তোলে যে অর্থবহ সংস্কার বা আরো গভীর একীভবন অসম্ভব হয়ে পড়ে, তাহলে ইউরোপপন্থী শিবিরকে ইচ্ছুক ইইউ সদস্য এবং সম্ভাব্যভাবে ইইউর বাইরের কয়েকটি দেশকে নিয়ে নতুন একটি অতিরাষ্ট্রীয় কাঠামো গঠনের বিষয়টি বিবেচনা করতে হতে পারে। অবশ্যই এমন চরম পদক্ষেপ শেষ বিকল্প হিসেবেই নেয়া উচিত এবং এর ঝুঁকিও হবে উল্লেখযোগ্য—গভীরতর বিভাজন থেকে শুরু করে দুর্বল প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত। তবে এসব ঝুঁকিকে তুলনা করতে হবে এমন একটি ইইউর সম্ভাব্য আরো বড় বিপদের সঙ্গে, যা ইউরোপীয় একীভবনকে সুরক্ষা ও এগিয়ে নিতে মৌলিকভাবেই অক্ষম।
এমন ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতির ক্ষেত্রে রাজনৈতিকভাবে পদক্ষেপ নেয়ার সক্ষমতা প্রয়োজন। থিংক ট্যাংক, স্বাধীন গণমাধ্যম, ফাউন্ডেশন, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলোর আরো শক্তিশালী ও পরস্পর-সংযুক্ত একটি ইউরোপপন্থী উদার-গণতান্ত্রিক ইকোসিস্টেম তৈরি করা উচিত। উদারনৈতিকতাবিরোধী শক্তিগুলোর দীর্ঘমেয়াদি কৌশল ও সাংগঠনিক সক্ষমতা থেকে শিক্ষা নিয়ে—তাদের পদ্ধতি অনুকরণ না করে বা গণতান্ত্রিক নীতির সঙ্গে আপস না করে—এমন একটি ইকোসিস্টেমকে ‘ইইউরোপ’-এর আকর্ষণীয় দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করতে হবে, জনপরিসরে বিতর্ক উৎসাহিত করতে হবে, আরো গভীর একীভবনের সুযোগগুলো চিহ্নিত করতে হবে এবং অকার্যকারিতা বেড়ে গেলে বিশ্বাসযোগ্য বিকল্প প্রস্তুত রাখতে হবে।
ইইউর অতিরাষ্ট্রীয় (সুপ্রান্যাশনাল) ভিত্তি দুর্বল করতে চাওয়া শক্তিগুলো এএফডির ‘নতুন চুক্তি’র মতো তাদের মৌলিক পরিবর্তনের পরিকল্পনা এরই মধ্যে প্রস্তুত করছে। ইউরোপপন্থী শক্তিগুলোর কল্পনাশক্তি, দৃঢ়তা বা প্রস্তুতি তাদের চেয়ে কম হওয়ার সুযোগ নেই। ইউরোপের ভবিষ্যৎ এমন লোকদের হাতে ছেড়ে দেয়া যায় না, যারা একীভবনকে পেছনে ফিরিয়ে নেয়ার চিন্তায় আচ্ছন্ন। এরই মধ্যে যা অর্জিত হয়েছে, তা রক্ষা করা এবং কীভাবে সেই অর্জনকে আরো সামনে এগিয়ে নেয়া যায়, তা কল্পনা করা জরুরি। সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি এড়াতে ‘ইইউরোপ’কে সেই পরিস্থিতির জন্যই প্রস্তুত থাকতে হবে।
[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]
ইয়ানিস এ এমমানুইলিডিস: ইউরোপিয়ান পলিসি সেন্টারের ডেপুটি চিফ এক্সিকিউটিভ ও ডিরেক্টর অব স্টাডিজ
