বিশেষ প্রতিনিধি ॥
সারা বছর কাজের তেমন চাপ থাকে না মৃৎশিল্পীদের। তবে দুর্গাপূজা এলেই বদলে যায় চিত্র। প্রতিমা তৈরির ব্যস্ততায় কর্মচঞ্চল হয়ে ওঠে তাদের কর্মশালা। এই কয়েক মাসের আয়েই চলে বছরের বাকি সময়ের সংসার। তাই দুর্গাপূজা শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, মৃৎশিল্পীদের জীবিকা ও টিকে থাকারও বড় অবলম্বন।
ভোলার পৌর বাপ্তা এলাকার ভদ্রবাড়িতে এখন দুর্গাপ্রতিমা তৈরির কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন মৃৎশিল্পীরা। পূজার সময় ঘনিয়ে আসায় প্রতিমার কাঠামো তৈরি, মাটির কাজ ও সাজসজ্জা নিয়ে তাদের ব্যস্ততা বেড়েছে। সময়মতো প্রতিমা তৈরির কাজ শেষ করতে চলছে বিরামহীন প্রস্তুতি।
ভোলার পৌর বাপ্তা এলাকার ভদ্রবাড়িতে দুর্গাপ্রতিমা তৈরির ফাঁকে মৃৎশিল্পী শ্যামল পাল বলেন, প্রতি বছর দুর্গা পূজা এলেই আমাদের ব্যবস্ততা বাড়ে। সারা বছর বসে থাকলেও দূর্গাপ্রতিমা তৈরির আয় দিয়ে চলে পুরো বছর। বর্তমানে মহা ব্যস্ততার মধ্যে ব্যস্ত সময় পার করছি।
‘ইতোমধ্যেই কয়েক দফা জেলার সব পূজা মন্ডপের কমিটির সঙ্গে মতবিনিময় করা হয়েছে। প্রতিটি মন্ডবে পোশাকধারী, সাদা পোশাক, মোবাইল টিম ও পেট্রোল টিমসহ বিভিন্ন স্তরের নিরাপত্তার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়াও সব মন্ডপের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে নিয়ে একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ খোলা হয়েছে। তৎতক্ষণিক তথ্য সরবরাহ দেওয়ার জন্য। এবারের দুর্গাপূজা সুন্দরভাবে সম্পূর্ণ হওয়ার লক্ষ্যে আমরা জেলা পুলিশ কঠোরভাবে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছি।’
তিনি জানান, তার বাড়ি ফরিদপুর জেলায়। প্রতি বছরই ভোলা জেলা আসেন দূর্গাপ্রতিমা তৈরি করতে। এবছরও তিনি ভোলার বিভিন্ন এলাকায় ১১টি প্রতিমা তৈরি করেছেন। এখন পর্যন্ত ৭ টি প্রতিমার রং তুলির কাজ সম্পূর্ণ করেছেন। বাকিগুলোও মহাষষ্ঠী পূজার আগেই শেষ হবে।
শ্যামল পাল জানান, চলতি বছর ১ লাখ ২০ হাজার টাকা সর্বোচ্চ ও সর্বনি¤œ ৫০ হাজার টাকায় প্রতিমা তৈরি করেছি। প্রতিমা তৈরির কাজে বিভিন্ন ধরনের দেশী ও বিদেশি রঙ ব্যবহার করা হয়। কিন্তু প্রতি বছরই রঙের দাম দৃদ্ধি পাওয়ায় আগের মতো বেশি লাভ হয় না। প্রতি বছরই তার তিন সহযোগী নিয়ে প্রতিমা তৈরি করা হয়। যা আয় হয় তার দিয়েই সংসার ভালো ভাবেই চলে।
আরেক প্রতিমা তৈরি মৃৎশিল্পী উৎপল পাল বলেন, প্রতি বছর আমরা মৃৎ শিল্পীরা দুর্গা পূজার অপেক্ষা করি। দুর্গা প্রতিমা তৈরির আয় দিয়েই সারা বছর ভালোভেবে সংসার চলে। সন্তানদের লেখা-পড়াসহ সব কিছুই চলে।
তিনি বলেন, এবছর আমরা ভোলার বিভিন্ন এলাকায় ১২টি প্রতিমা তৈরি করেছি। বিভিন্ন ডিজাইনের প্রতিমা তৈরি করে থাকি। কোনটি ১ লাখের বেশি আবার কোনটি ১ লাখ আবার কোনটি ৫০/৬০ হাজার টাকা।
![]()
‘প্রতি বছর দুর্গা পূজা এলেই আমাদের ব্যবস্ততা বাড়ে। সারা বছর বসে থাকলেও দূর্গাপ্রতিমা তৈরির আয় দিয়ে চলে পুরো বছর। বর্তমানে মহা ব্যস্ততার মধ্যে ব্যস্ত সময় পার করছি। চলতি বছর ১ লাখ ২০ হাজার টাকা সর্বোচ্চ ও সর্বনি¤œ ৫০ হাজার টাকায় প্রতিমা তৈরি করেছি। প্রতিমা তৈরির কাজে বিভিন্ন ধরনের দেশী ও বিদেশি রঙ ব্যবহার করা হয়। কিন্তু প্রতি বছরই রঙের দাম দৃদ্ধি পাওয়ায় আগের মতো বেশি লাভ হয় না। প্রতি বছরই তার তিন সহযোগী নিয়ে প্রতিমা তৈরি করা হয়। যা আয় হয় তার দিয়েই সংসার ভালো ভাবেই চলে।’
মৃৎ শিল্পী বিষ্ণু চন্দ্র পাল বলেন, ৩ জন সহযোগী নিয়ে দূর্গাপ্রতিমা তৈরি করি। এবছরও বিভিন্ন জেলায় ১৬টি দুর্গা প্রতিমা তৈরি করেছি। এবছর প্রায় ১২ লাখ টাকা দুর্গা প্রতিমা তৈরি করা হয়েছে। রঙসহ যাবতীয় খরচ ও তিন সহযোগীর মজুরি দিয়ে হয়তো ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা থাকবে।
তিনি আর বলেন, প্রতিবছর শুধু দুর্গা প্রতিমাই তৈরি কফা। অন্য কোনো কাজ করি না। বছরের ওই আয় দিয়ে সন্তানদের পড়াশুনা ও সংসার মোটামুটিভাবে চলে যায়। তবে সরকারিভাবে কোন সহযোগিতা আমরা পাই না।
ভোলা জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের তথ্য মতে, ভোলার সাত উপজেলায় এবছর ১১৮টি পূজা মন্ডপে দুর্গা পূজা অনুষ্ঠিত হবে। এরমধ্যে ভোলা সদর উপজেলায় ২৭টি, বোরহানউদ্দিন উপজেলায় ২০টি, দৌলতখান উপজেলায় ৮টি, তজুমদ্দিন উপজেলায় ১৫টি, লালমোহন উপজেলায় ২৩টি, চরফ্যাশন উপজেলায় ১৪টি ও মনপুরা উপজেলায় ১১টি পূজা মন্ডবে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, ভোলার সাত উপজেলার ১১৮টি পূজা মন্ডবগুলোতে বর্তমানে চলছে প্রতিমার রং তুলির কাজ। বিভিন্ন রঙের মাধ্যমে দুর্গা, লক্ষ্মী, স্বরসর্তী, কার্তিক ও গনেষ প্রতিমাকে সুন্দরভবে ফুটিয়ে উঠার কাজ করছেন মৃৎশিল্পীরা। সকাল থেকে মধ্য রাত পর্যন্ত চলে মৃৎ শিল্পীদের এই মহা ব্যস্ততা। এছাড়াও ম-বে ম-বে ডেকোরেশন ও বিভিন্ন লাইটিংসহ সাজ-সজ্জার কাজও চলছে দ্রুতগতিতে। কারো বসে থাকার সময় নেই।
‘গত বছরের স্থায়ী ও অস্থায়ী মিলে ১১৫টি পূজা মন্ডবে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়। আর এবছর ১১৮টি পূজা মন্ডবে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। আগের বছরের চেয়ে এবছর বেড়েছে তিনটি পূজা মন্ডব।’
ভোলা জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অসীম কুমার সাহা জানান, গত বছরের স্থায়ী ও অস্থায়ী মিলে ১১৫টি পূজা মন্ডবে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়। আর এবছর ১১৮টি পূজা মন্ডবে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। আগের বছরের চেয়ে এবছর বেড়েছে তিনটি পূজা মন্ডব।
তিনি আরও বলেন, ভোলার সাত উপজেলার স্থায়ী ও অস্থায়ী সবগুলো পূজা মন্ডবে সিসি ক্যামেরা নিশ্চিত করা হয়েছে। এছাড়াও প্রশাসন থেকে আমাদের সঙ্গে বেশ কয়েকবার মতবিনিময় সভা করেছেন। প্রশাসনের কঠোর নিরাপত্তার আশ্বাসে শান্তিপ্রিয়ভাবে পূজা শেষ করার আশা করছি।
জানা গেছে, গত ১০ অক্টোবর মহালয়ার মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে সনাতন ধর্মালম্বীদের সব চেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা আনুষ্ঠানিকতা। আগামী ১৬ অক্টোবর মহাষষ্ঠী পূজার মধ্য দিয়ে শুরু হবে শারদীয় দুর্গাপূজা। শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষ্যে ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনা নিয়ে মন্ডবে ম-বে ঘুরতে যাওয়া, কেনাকাটা ও বিভিন্ন খাবার খাওয়া-দাওয়াসহ নানান পরিকল্পনা করতেন সনাতন ধর্মাবলম্বী নানা বয়সের শিশু থেকে শুরু করে নানা বয়সের নারী-পুরুষরা। তবে এবারের দুর্গাপূজা মাহাসপ্তমী পূজা দুইদিনসহ দুর্গাপূজা ৫ দিন হওয়ায় খুশি তারা। বিগত বছরগুলোর মতো এবারও মহা আনন্দে পূজায় উপভোগ করতে চান তারা।
ভোলা পৌর ওয়ের্স্টান পাড়া এলাকার সনাতন ধর্মীলম্বী কলেজ ছাত্রী কৃষ্ণা রানী পোদ্দার বলেন, পূজার আর কয়েক দিন আছে মাত্র। প্রতিবছরই দূর্গাপূজার অপেক্ষা করি। পূজা এলেই নতুন নতুন পোশাক কিনি। এবছরও পরিবারের সবাই মর্কেটে দিয়ে পূজার জন্য নতুন পোশাক ও শাড়ি কিনেছি।
শিশু শ্রেয়া সাহা বৃষ্টি বলেন, পূজায় ঘুরতে যাওয়ার জন্য নতুন জামা- জুতা বাবা কিনে দিয়েছে। পূজায় বাবা-মার সঙ্গে বিভিন্ন ম-বে গিয়ে পূজা দেখতে যাবো। অনেক ঘুড়াঘুড়ি করবো। অনেক কিছু খাবো। পূজায় অনেক মজা করবো।
সদরের বাপ্তা ইউনিয়নের ৫নম্বর ওয়ার্ডের দিপক মহড়ি বাড়ির বাসিন্দা প্রতিমা মজুমদার ও সঙ্গীতা রানী রায় বলেন, পূজার ১৫ দিন আগেই বসতঘর গুছিয়ে রাখার কাজ শেষ করা হয়। পূজা উপলক্ষ্যে লাড়–, মোয়াসহ নারকেল, সুজি, ঘির দিয়ে বিভিন্ন ধরনের বাহারি খাবার তৈরি করি। পূজা উপলক্ষ্যে পরিবারের শিশু থেকে সবার জন্য নতুন জামা, শাড়ি, শার্ট, জুতাসহ নানা কিছু ক্রয় করি। সবাই মিলে মার্কেটে গিয়ে কেনাকাটার আনন্দ অন্যরকম।
সুমিত্রা রানী দে ও কাকলি রানী দাস বলেন, পূজা মানেই আনন্দ। পূজা মানেই খুশি। আমরা প্রতি বছরই দুর্গা পূজায় গাড়ি ভাড়া করে তিন দিন পরিবারের সবাই মিলে ভোলা সদর, দৌলতখান, বোরহানউদ্দিন, তজুমদ্দিন, লালমোহন ও চরফ্যাশন পূজা দেখতে যাই।
ভোলা জেলা পুলিশ সুপার মো. শহীদুল্লাহ কাওছার জানান, ইতোমধ্যেই কয়েক দফা জেলার সব পূজা মন্ডপের কমিটির সঙ্গে মতবিনিময় করা হয়েছে। প্রতিটি মন্ডবে পোশাকধারী, সাদা পোশাক, মোবাইল টিম ও পেট্রোল টিমসহ বিভিন্ন স্তরের নিরাপত্তার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়াও সব মন্ডপের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে নিয়ে একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ খোলা হয়েছে। তৎতক্ষণিক তথ্য সরবরাহ দেওয়ার জন্য। এবারের দুর্গাপূজা সুন্দরভাবে সম্পূর্ণ হওয়ার লক্ষ্যে আমরা জেলা পুলিশ কঠোরভাবে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছি।
ভোলা জেলা প্রশাসক ডা. শামীম রহমান জানান, মৃৎশিল্পীদের জন্য আপাতত কোনো বরাদ্দ নেই। তবে কেউ যদি আমাদের কাছে সহযোগিতার আবেদন করেন তাহলে তাকে সহযোগিতা করা হবে।
