আগে যে কাজ অনয়াসে করে ফেলতেন, এখন সেই কাজ করতে গিয়েই হাঁপিয়ে উঠছেন। সিঁড়ি নিয়ে উপর-নীচ করতে গিয়ে পায়ে ব্যথাও বাড়ছে। খিটখিটে হয়ে যাচ্ছে মেজাজ? এ কিন্তু আসলেই বয়সের ‘দোষ’! বয়স ৪০ পার হলে মহিলা এবং পুরুষের শরীরে নিজস্ব কিছু পরিবর্তন শুরু হয়। এই সময়ে মহিলা-পুরুষ নির্বিশেষেই নিজেদের স্বাস্থ্যের দিকে বাড়তি নজর দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
ঠাণে নিবাসী প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ চিকিৎসক নিকিতা কুলকার্নি জানাচ্ছেন, চল্লিশোর্ধ্ব মহিলাদের শরীরে হরমানোর হেরফের হওয়াটা স্বাভাবিক। সাধারণত এই সময় থেকে মহিলাদের শরীরে ইস্ট্রোজেন হরমোনের ক্ষরণ ধীরে ধীরে কমতে থাকে। হার্ট ভাল রাখতে, হাড়ের জোর বৃদ্ধিতেও ইস্ট্রোজেন হরমোন জরুরি। তার ফলে শরীরে বদল আসতে শুরু করে। সেই কারণেই, চল্লিশের পরে বিশেষ যত্নের দরকার হয়।
শরীরের পরিবর্তন গুরুত্ব দিয়ে বোঝা
বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে হরমোনের তারতম্য দেখা দেয়, যা পেশির শক্তি, হাড়ের স্বাস্থ্য এবং শরীরের গঠনের ওপর প্রভাব ফেলে। একই সঙ্গে এই বয়সে ডায়াবিটিস, উচ্চ রক্তচাপ এবং হৃদ্রোগের ঝুঁকিও বাড়তে থাকে। শরীরে কোনও অস্বাভাবিক বা দীর্ঘস্থায়ী লক্ষণ দেখা দিলে, তা এড়িয়ে যাওয়া ঠিক নয়। বিশেষ করে ঋতুস্রাবের সময় অতিরিক্ত বা অস্বাভাবিক রক্তপাত হলে দেরি না করে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া দরকার।
প্রতিদিনের রুটিনে স্ট্রেংথ ট্রেনিং যোগ করা
শরীরচর্চা মানে শুধু ওজন কমানো বা বাহ্যিক সৌন্দর্য ধরে রাখা নয়। বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে পেশির জোর এবং শরীরের সচলতা বজায় রাখতে স্ট্রেংথ ট্রেনিং অপরিহার্য। এতে সিঁড়ি ভাঙা বা বাজারের ব্যাগ বওয়ার মতো রোজকার কাজগুলি অনেক সহজ হয়ে যায়। সপ্তাহে অন্তত দু’দিন স্কোয়াট, হালকা ওজন তোলার মতো শারীরচর্চা রুটিনে রাখা ভাল। যাঁরা নতুন শুরু করছেন, তাঁরা নিজের ফিটনেস ও শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী হালকা ব্যায়াম দিয়ে শুরু করে ধীরে ধীরে মাত্রা বাড়াতে পারেন।
নিয়মিত শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা
হরমোনের মাত্রার হেরফের হলে মানসিক স্বাস্থ্যেও তার প্রভাব পড়তে বাধ্য। মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায় এই বয়সে এসে। চিকিৎসক মনে করাচ্ছেন, ৪০-এর পর নির্দিষ্ট কিছু শারীরিক পরীক্ষা করানো জরুরি। এই সময় রক্তচাপ, রক্তের শর্করার মাত্রা এবং কোলেস্টেরল পরীক্ষা করানো প্রয়োজন।
মহিলাদের ক্ষেত্রে স্তন ক্যানসার এবং জরায়ুমুখের ক্যানসারের মতো পরীক্ষাগুলি সময়মতো করানো জরুরি। পরিবারের কারও পুরোনো অসুখের ইতিহাস থাকলে সেগুলি নিয়ে সতর্ক হতে হবে। থাইরয়েড, ভিটামিন বা ক্যালশিয়ামের ঘাটতি এবং হাড়ের ঘনত্ব পরীক্ষারও প্রয়োজন হতে পারে।
মানসিক স্বাস্থ্য
শারীরিক সুস্থতার পাশাপাশি মনের খেয়াল রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। চাকরি, সংসার, সন্তান ও বয়স্ক বাবা-মায়ের দেখাশোনা— সব দিক সামলাতে গিয়ে মহিলারা প্রায়ই অতিরিক্ত মানসিক চাপ, ঘুমের সমস্যা ও মানসিক ক্লান্তিতে ভোগেন। অনেক সময় শারীরিক সব পরীক্ষার রিপোর্ট ঠিক এলেও মনে তীব্র ক্লান্তি থেকে যায়। ক্লান্ত লাগলে বা সামলাতে না পারলে দ্বিধা না করে অন্যদের সাহায্য চাইতে পারেন। দিনভর ব্যস্ততার মধ্যেও কিছুটা সময় রাখুন নিজের জন্য। শারীরচর্চা, সঠিক সময়ে স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং মনকে শান্ত রাখা—চল্লিশের পর সুস্থ থাকার চাবিকাঠি।
পুরুষদের শরীরে কী প্রভাব পড়ে
চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন, ৪০-এর কোঠায় পৌঁছোলে পুরুষদেরও শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়াতে বদল আসে। তার প্রভাব শুধু শরীরে বা মনে নয়, পড়ে যৌনজীবনেও। পুরুষদের ক্ষেত্রে ৪০-এর পর থেকে শরীরে টেস্টোস্টেরন হরমোনের মাত্রা ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে। তার ফলে ক্লান্তি, পেশিক্ষয় ঘটতে থাকে। মেজাজও প্রভাব পড়ে। যৌন ইচ্ছা এবং ক্ষমতাও কমে যায়।পুরুষদের ক্ষেত্রেও স্বাস্থ্যপরীক্ষার পাশাপাশি জীবনযাপনে নিয়ন্ত্রণ আনার পরমার্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকেরা। খেলাধুলো বা শারীরচর্চা করলে শরীর সুস্থ রাখা সম্ভব।
