কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে মেরিন ড্রাইভের পাটুয়ারটেক সমুদ্রসৈকত এলাকার ‘টুপটুপ’ নামের একটি কাঠের রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এতে ১০ জন নিহত হয়েছে। তারা সবাই পর্যটক। সমুদ্র দেখতে তারা ঘুরতে আসেন। ফায়ার সার্ভিসের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা দোলন আচার্য এ তথ্য জানান।
নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ছয়জনের পরিচয় প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। তারা হলেন- ঢাকার বনশ্রীর ইসরাত জাহান মালিহা (৩০), মিলিতা মেহেজাবিন আলভী (২৩), খিলগাঁওয়ের লায়লা জাহান নাবিলা (২৭) ও নাফিসতা মীম (২৭), চুয়াডাঙ্গার ফারিহা কবির (৩৩) পাঁচ বছর বয়সী ফায়িজান আহম্মেদ, নাফিজ ও নাবিলা। বাকি দুইজনের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
সর্বশেষ উদ্ধার করা চারজনের মধ্যে একজন পুরুষ, দুজন নারী ও একটি শিশু রয়েছে। তাদের পরিচয় এখনো শনাক্ত করা যায়নি।
নিহত ১০ জনের মধ্যে নাবিলাসহ ৬ জনই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি)এর ১৫তম ব্যাচের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী আহাদের পরিবারের সদস্য বলে জানা গেছে।
অগ্নিকাণ্ডের পর ছয়জনকে জীবিত উদ্ধার করে কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়। তাদের মধ্যে রয়েছেন মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক শিহাব উদ্দীন (৩১), তাঁর স্ত্রী নাফিজা নেওয়াজ খান (২৯), মান্নান (৩৪), মেহেরুন্নেসা (৩০), মাসুদ রানা (৩০) ও সামিদা (৩২)।
আহাদ বলেন, পরিস্থিতি খুব একটা ভালো না। আমাদের পরিবারের ছয়জন এ ঘটনায় মারা গেছেন। তাদের মধ্যে আমার চারজন মেয়ে কাজিন, একজন ছেলে কাজিন এবং আমার এক মেয়ে কাজিনের ছোট সন্তান ফাইয়াজ রয়েছে। নাফিজ ও নাবিলাও আমাদের আত্মীয়। তারা আমার মায়ের ফুফাতো বোনের পরিবারের সদস্য।
তিনি আরও বলেন, আমাদের পরিবারের মোট ছয়জন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া আহত তিনজন বর্তমানে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
ফায়ার সার্ভিসের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, হাসপাতালে পাঠানো ছয়জনের মধ্যে দুজনকে প্রাথমিক চিকিৎসার পর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। বাকি চারজন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
অগ্নিকাণ্ডের খবর পেয়ে পুলিশ, কোস্ট গার্ড, এসআরবি ও স্থানীয় লোকজন উদ্ধার তৎপরতায় অংশ নেন। স্থানীয় সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী, জেলা প্রশাসক আবদুল মান্নান, পুলিশ সুপার, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং উখিয়ার সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোহাম্মদ আব্দুল্লাহসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে পরিস্থিতি তদারকি করছেন।
ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা গেছে, শনিবার সকাল ৭টার দিকে রিসোর্টটিতে আগুন লাগে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নেভানোর কাজ শুরু করেন। সকাল ১১টার দিকে আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসে। এরপর রিসোর্টের ভেতরে উদ্ধার অভিযান চালানো হয়। অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা সবুক্তগীন মাহমুদ সোহেল জানান, দগ্ধ পাঁচজনের শরীরের প্রায় ৫ শতাংশ পুড়ে গেছে। তাদের হাসপাতালে ভর্তি রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। অপর আহত ব্যক্তি পড়ে গিয়ে আঘাত পেয়েছিলেন। তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, কাঠের তৈরি টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্টে মোট নয়টি কক্ষ ছিল। শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) রাতে তিনটি কক্ষের পর্যটকেরা চেকআউট করে চলে যান। বাকি ছয়টি কক্ষে ১৬ জন পর্যটক অবস্থান করছিলেন। তাদের মধ্যে কয়েকজন শনিবার সকালে বিভিন্ন কাজে রিসোর্টের বাইরে ছিলেন।
সকালে আগুন লাগার পর রিসোর্টে থাকা পর্যটকদের উদ্ধারে তৎপরতা শুরু হয়। তবে রিসোর্টে অবস্থানরত সবাইকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে কি না, তা নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। এ কারণে হতাহতের সংখ্যা বাড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
অগ্নিকাণ্ডের খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নেভানোর কাজ শুরু করে। অগ্নিকাণ্ডের কারণ তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।
উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান মজুমদার শনিবার সকাল ১১টার দিকে জানান, রিসোর্টটিতে ২৭ জনের প্রবেশের তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে নয়জন রিসোর্টের বাইরে ছিলেন। উদ্ধার অভিযান শেষ না হওয়া পর্যন্ত হতাহতের বিষয়ে বিস্তারিত জানানো সম্ভব নয়।
ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা মোরশেদ দুপুরে সাংবাদিকদের বলেন, ঘটনাস্থল থেকে ছয়জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। আহত ছয়জনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়।
জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান জানান, হতাহত ব্যক্তিরা সবাই পর্যটক। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, রিসোর্টের রান্নাঘরের চুল্লি থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে। তবে অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ জানতে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, অগ্নিকাণ্ডের সময় রিসোর্টটিতে প্রায় ৩০ জন অবস্থান করছিলেন। তাদের মধ্যে চার থেকে পাঁচজন বের হতে পেরেছেন বলে জানা গেছে। তবে এ তথ্য স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। রিসোর্টে মোট কতজন ছিলেন এবং আর কেউ নিখোঁজ রয়েছেন কি না, তা জানতে উদ্ধার অভিযান চলছে।
স্থানীয়দের ধারণা, রিসোর্টের রান্নাঘর থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অগ্নিকাণ্ডের পর রিসোর্ট কর্তৃপক্ষের লোকজন ঘটনাস্থল ছেড়ে চলে গেছেন বলেও দাবি করা হয়েছে। তবে এ তথ্যও স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। উদ্ধার অভিযান ও তদন্ত শেষে অগ্নিকাণ্ডের কারণ এবং ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে।
