প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য, পাহাড়ের হাতছানি, স্বচ্ছ নদীর জল এবং পরিবারের সঙ্গে কাটানো কিছু আনন্দঘন মুহূর্ত, সব মিলিয়ে সিলেট ভ্রমণ হতে পারে স্মরণীয় এক অভিজ্ঞতা। ব্যস্ত জীবনের নানা ব্যস্ততা আর কাজের চাপ থেকে একটু বিরতি নিতে পরিবার নিয়ে ঘুরতে যাওয়ার আনন্দই আলাদা। প্রিয় মানুষগুলোর সঙ্গে নতুন জায়গা দেখা, প্রকৃতির কাছাকাছি সময় কাটানো আর একসঙ্গে কিছু সুন্দর স্মৃতি তৈরি করার জন্য সিলেট হতে পারে চমৎকার একটি গন্তব্য। তাই আমরা শরতের এই সুন্দর সময়টি বেছে নিলাম দূরে কোথাও ঘুরে বেড়ানো জন্য। হঠাৎ সিদ্ধান্তে সেপ্টেম্বরের ২৫ তারিখ শুক্রবার সকালে ইলিশের বাড়ি চাঁদপুর থেকে সড়ক পথে রওনা দেই বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত তিনশ ষাট আউলিয়ার দেশ সিলেটের উদ্দেশ্যে। প্রথমে সকাল সাড়ে ৮টায় প্রথমে রেল স্টেশনে গিয়ে পাশের একটি হোটেলে সকালের নাস্তা সেরে সকাল ১০টায় আন্তঃনগর পাহাড়িকা এক্সপ্রেস ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করতে করতে সেই ট্রেন এলো দুপুর পৌনে ১২টায়। যাক সবাই দ্রুত ট্রেনে উঠে অনলাইনে কেনা টিকিটের নির্ধারিত আসনে বসে পড়ি আমরা সবাই। আমাদের এবারের সফর সঙ্গী একমাত্র বোন, ভাগ্নি-ভাগিনা এবং আমরা পুরো পরিবার।
সিলেট ভ্রমণের আনন্দ যেন শুরু হয়ে যায় ট্রেনে ওঠার পর থেকেই। গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই ট্রেনের জানালা দিয়ে দেখা প্রকৃতির অপরূপ দৃশ্য মনকে ভরিয়ে দেয় প্রশান্তিতে। দুই পাশের সবুজ চা বাগান, সারি সারি গাছ, নদী-খাল আর দূরের দিগন্তজোড়া সবুজের সমারোহ, সব মিলিয়ে রেলপথের এই যাত্রা আমাদের হয়ে ওঠে এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা। ট্রেন যত সামনের দিকে এগিয়ে যায়, ততই বদলে যেতে থাকে চারপাশের দৃশ্যপট। কোথাও বিস্তীর্ণ ধানখেত, কোথাও গাছপালায় ঘেরা ছোট্ট জনপদ। আবার কোথাও জলাশয়ের শান্ত পানিতে আকাশের ছায়া পড়ে তৈরি করে এক মনোমুগ্ধকর দৃশ্য। রেললাইনের পাশ দিয়ে ছুটে চলা প্রকৃতির এই সৌন্দর্য দেখতে দেখতে কখন যে সময় কেটে গিয়েছে, তা বোঝাই কঠিন। টানা প্রায় ৭ ঘণ্টার জার্নি শেষে রাত পৌনে ৭টার দিকে আমরা সিলেট রেলস্টেশনে পৌঁছাই। সেখান থেকে ২০০ টাকায় একটি সিএনজি ভাড়া নিয়ে শহরের আম্বরখানা পয়েন্টের একটি আবাসিক হোটেলে অবস্থান নিয়ে সেখানে ফ্রেশ হয়ে নিচে নেমে খাবার খাই। সারাদিনের জার্নি শেষে ভারি খাবারেই শরীরে নেমে আসে এক স্বস্তির নিঃশ্বাস। ততক্ষণে রাত হয়ে যায় ৯টা। হাঁটতে হাঁটতে চলে গেলাম আমরা হজরত শাহজালাল (রহঃ) এর মাজারে। সিলেট শহরের চারপাশের পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, ব্যস্ত সড়ক, আধুনিক স্থাপনা আর স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রা নতুন এক অভিজ্ঞতার জন্ম দেয় আমাদের। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে শহরের আলোঝলমলে পরিবেশে কিছুটা সময় কাটানো- ভ্রমণের শুরুতেই এনে দিয়েছে এক প্রশান্তি। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টিতে পুরো দরগাহ ঘুরে দেখে হেঁটেই এসে পড়ি হোটেলে।
রাত্রীযাপন শেষে সবাই সকাল সকাল বের হয়ে নাস্তা সেরে একটি সিএনজি রিজার্ভ করে নেই জাফলং এর উদ্দেশ্যে। যেতে যেতে সিলেটের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর এ অঞ্চলটি চা-বাগানের সবুজ গালিচা, মেঘে ঢাকা পাহাড়, পাথরের বুক চিরে বয়ে চলা নদী আর স্বচ্ছ নীলাভ পানির আকর্ষণ আমাদের নিয়ে নেয় অন্য এক জগতে। সিলেট-তামাবিল মহাসড়কের পাশে শ্রীপুরে মেঘালয়ের জৈন্তা পাহাড়টি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে এতটাই ভরপুর যে কারো মন ভরে যাবে। সেখানে কিছুক্ষণ ঘুরেফিরে সবাই ছবি তুলে চলে গেলাম প্রকৃতি কন্যা জাফলং এর জিরো পয়েন্টে। সেখানের পাহাড় আর নদীর অপূর্ব মেলবন্ধন সিলেট ভ্রমণের আনন্দ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে আমাদের। ভারতের মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত এই পর্যটনকেন্দ্র আমাদের কাছে বিশেষ আকর্ষণীয় মনে হয়েছে। দূরে সারি সারি পাহাড়, নিচে বয়ে চলা পিয়াইন নদী আর নদীর বুকে ছড়িয়ে থাকা পাথরÑ সব মিলিয়ে জাফলংয়ের দৃশ্য যেন প্রকৃতির নিজ হাতে আঁকা একটি ছবি। পরিবারের খুদে সদস্যদের নিয়ে নদীর তীর ধরে হাঁটা, পাহাড়ের সৌন্দর্য উপভোগ করা এবং স্মৃতিময় মুহূর্তগুলো ক্যামেরায় ধরে রাখি আমরা। তবে নদীতে নামার বায়না ধরে বাচ্চারা। তাদেরকে পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়ে নামিয়ে দিলাম তপ্ত রোধে জড়িয়ে থাকা শীতল পানির এ নদীতে।
সেখান থেকে বিদায় নিয়ে উপরে উঠতে উঠতে সবাই সবার পছন্দের জিনিসপত্র কেনাকাটা সেরে চলে গেলাম জাফলং চা বাগানে। যদিও আমি ব্যতীত সবারই এই প্রথম চা বাগান দর্শন। চারদিকে সবুজের সমারোহ, সারি সারি চা-গাছ আর দূরে পাহাড়ের হাতছানিÑ সব মিলিয়ে জাফলং চা বাগান যেন প্রকৃতির আঁকা এক জীবন্ত ছবি। মৃদু বাতাসে দুলতে থাকা সবুজ পাতার মাঝে হারিয়ে গিয়েছে মনের সব ক্লান্তি। পাহাড়, মেঘ আর সবুজের মিতালি আমাদের মনকে করে তোলে প্রশান্ত। পরে বিছানাকান্দি হয়ে সিলেট শহরে প্রবেশ করি ততক্ষণে বিকেল সাড়ে ৫টা। আম্বরখানা পয়েন্টের অন্যতম হোটেল পালকিতে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে দুপুরের খাবার খেতে খেতে মাগরিবের পর হয়ে যায়। খাবার সেরে হোটেলে গিয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আবার চলে গেলাম হযরত শাহজালাল (রহঃ) এর মাজারে। সেখানে সবাই নামাজ আদায় করেন। এবং পরদিন সকাল সাড়ে ৯টার মধ্যে হোটেল ত্যাগ করে নাস্তা সেরে রেল স্টেশনে আসার কিছুক্ষণ পরেই ট্রেন ছেড়ে দেয় চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে। সিলেটে ঘুরে দেখার মতো অন্যান্য যে স্থানগুলো রয়েছেÑ পাহাড়, পিয়াইন নদী, পাথর ও মেঘে ঢাকা পাহাড়ের দৃশ্য উপভোগ করার জন্য দারুণ জায়গা হচ্ছে জাফলং। এ ছাড়াও রয়েছেÑ লালচে-সবুজ নদীর পানি, নৌভ্রমণ ও দুই পাশের পাহাড়ের মনোরম দৃশ্য লালাখালের প্রধান আকর্ষণ। পাথর, পাহাড় ও পানিপ্রবাহ মিলিয়ে বিছানাকান্দির অসাধারণ প্রাকৃতিক পরিবেশ পর্যটকদের আকৃষ্ট করে। তবে বর্ষাকালে-এর সৌন্দর্য বিশেষভাবে ফুটে উঠে। পানির মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা গাছপালা ও নৌকায় বনের ভেতর ঘোরার অভিজ্ঞতার জন্য রাতারগুল বিখ্যাত। সাদা পাথর, স্বচ্ছ পানির প্রবাহ ও পাহাড়ের দৃশ্য দেখতে চলে যেতে পারেন ভোলাগঞ্জের সাদাপাথর পর্যটন কেন্দ্রে। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত মেঘালয়ের পাহাড় আর পিয়াইন নদীর পাড়েই আছে প্রকৃতির আরেক অপরূপ নিদর্শন পান্থুমাই ঝর্ণা। সিলেট শহরের খুব কাছেই সবুজ চা-বাগানের সৌন্দর্য উপভোগ করতে চলে যেতে পারেন মালনীছড়া চা-বাগান সহ ছোট বড় আরও কয়েকটি পর্যটন স্পট। সেই সঙ্গে ইসলাম ধর্মালম্বীদের জন্য রয়েছেÑ হজরত শাহজালাল (রহ্ঃ) এবং হজরত শাহপরান (রহ্ঃ) এর মাজার।
তবে জেনে রাখা ভালো : শিশুদের কাছে পাহাড়, নদী ও নতুন জায়গা দেখা হতে পারে আনন্দের পাশাপাশি শেখার অভিজ্ঞতা। বড়দের জন্যও এটি মানসিক প্রশান্তি ও নতুন উদ্যম নিয়ে ফিরে আসার সুযোগ। সিলেট এমন একটি জায়গা, যেখানে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে খুব বেশি আয়োজনের প্রয়োজন হয় না। পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে থাকা, নদীর পাশে বসে সময় কাটানো কিংবা সবুজ চা-বাগানের পথ ধরে কিছুটা হাঁটাÑ ছোট ছোট এসব মুহূর্তই হয়ে উঠতে পারে জীবনের সুন্দর স্মৃতি। পরিবার নিয়ে সিলেট ভ্রমণ তাই কেবল কয়েকটি দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখার গল্প নয়; এটি প্রিয় মানুষদের আরও কাছাকাছি আসা, ব্যস্ত জীবনের বাইরে কিছুটা সময় নিজেদের মতো করে কাটানো এবং স্মৃতির পাতায় নতুন কিছু মুহূর্ত যোগ করার এক আনন্দময় আয়োজন।
কিভাবে যাবেন : দেশের যেকোন স্থান থেকেই সড়ক, রেল ও আকাশ পথে সিলেটে যাওয়া যায়। তবে ঢাকার কল্যাণপুর, ফকিরাপুল, সায়দাবাদসহ বেশকিছু জায়গা থেকে গ্রীন লাইন, শ্যামলি, সৌদিয়া, এস আলম, ইউনিক, হানিফ ও এনা পরিবহনের এসি-ননএসি বাস যাতায়াত করে। ভাড়া পড়বে প্রকারভেদে জনপ্রতি ৭০০ থেকে ১৫০০ টাকা পর্যন্ত। এ ছাড়াও ট্রেনে করে সিলেট যেতে কমলাপুর কিংবা বিমান বন্দর রেলওয়ে স্টেশন হতে উপবন, জয়ন্তিকা, পারাবত অথবা কালনী এক্সপ্রেস ট্রেনকে বেছে নিতে পারেন আপনার ভ্রমণ সঙ্গী হিসেবে। ট্রেনে যেতে সময় লাগবে ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা। ট্রেনে শ্রেণিভেদে ভাড়া লাগবে ৩৭৫ থেকে ১২৮৮ টাকা। আর চট্টগ্রাম থেকে বাসে বা ট্রেনে সিলেট যাওয়া যায়। চট্টগ্রাম থেকে ট্রেনে যেতে চাইলে পাহাড়িকা এবং উদয়ন এক্সপ্রেস নামের দুটি ট্রেন সপ্তাহে ৬ দিন চলাচল করে। ট্রেনে শ্রেণিভেদে ভাড়া লাগবে ৪৫০ থেকে ১৫৪১ টাকা। আর ঢাকা বা চট্টগ্রাম থেকে সবচেয়ে দ্রুত সময়ে সিলেট যেতে বিমানে ভ্রমণ করতে পারেন। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বিমান বাংলাদেশ এবং ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সের বিমান প্রতিদিন সিলেটের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। তবে চট্টগ্রাম থেকে সিলেটে যেতে হলে ঢাকা হয়েই সিলেটে যেতে হবে।
কোথায় থাকবেন : যাওয়া আসার সময় কম লাগার কারণে থাকার জন্য সিলেট শহরকে বেছে নিতে পারেন। হোটেল হিল টাউন, গুলশান, দরগা গেট, সুরমা, কায়কোবাদ ইত্যাদি হোটেলে আপনার প্রয়োজন ও সামর্থ্য অনুযায়ী থাকতে পারবেন। এ ছাড়া লালাবাজার এলাকায় ও দরগা রোডে কম ভাড়ায় অনেক মানসম্মত রেস্ট হাউস আছে। যেখানে ৪০০ থেকে ১০০০ টাকায় বিভিন্ন ধরনের রুম পাবেন।
কোথায় খাবেন : সিলেট শহরে বিভিন্ন মানের রেস্টুরেন্ট আছে, আপনার চাহিদামতো সবকিছুই পাবেন। সিলেটের জিন্দাবাজার এলাকার পানসী, পাঁচ ভাই কিংবা পালকি রেস্টুরেন্টের পছন্দমতো দেশীয় খাবার খেতে পারেন। এই রেস্টুরেন্টগুলোতে অনেক রকম ভর্তা ভাজি সুলভ মূল্যে পাওয়া যায়।
লেখক : সমাজকর্মী
