সামুদ্রিক নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট সূত্র এবং যুক্তরাজ্যের নৌবাহিনী-সংশ্লিষ্ট সংস্থা ইউনাইটেড কিংডম মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনসের (ইউকেএমটিও) নথিভুক্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে গত ৪৮ ঘণ্টায় অন্তত পাঁচটি ঘটনার কথা জানা গেছে। এসব ঘটনার মধ্যে ড্রোন হামলার ঘটনাও রয়েছে। জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন সংস্থার (আইএমও) তথ্যেও অক্টোবরের ৩ থেকে ৫ তারিখের মতো হামলার প্রবণতা ফিরে আসার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
লক্ষ্য শনাক্তে ছোট নৌযান ব্যবহারের অভিযোগ, রয়টার্সকে দেওয়া বক্তব্যে এক মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানের রাডার সক্ষমতার বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর দেশটির ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) সম্ভাব্য লক্ষ্য শনাক্ত করতে ছোট নৌযানে নিরস্ত্র পর্যবেক্ষকদের ব্যবহার করছে। তাঁদের মাধ্যমে মার্কিন নৌযানসহ বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুর অবস্থান শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে বলে ওই কর্মকর্তা জানান।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত সপ্তাহে একটি ঐতিহ্যবাহী আরব নৌযান ‘ধৌ’ থেকে লক্ষ্যবস্তুর তথ্য সরবরাহ করা হচ্ছিল বলে মার্কিন সামরিক বাহিনী ধারণা করে। পরে মার্কিন বাহিনী নৌযানটির আরোহীদের সরে যেতে বলে সেটি ধ্বংস করে। মার্কিন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, ওই ঘটনায় কেউ হতাহত হননি।
এদিকে হরমুজ প্রণালির বাইরেও অভিযান বিস্তারের ইঙ্গিত দিয়েছেন ইরানি কর্মকর্তারা। ওমান উপসাগর এবং কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপকূলসংলগ্ন জলসীমায় জাহাজের বিরুদ্ধে হামলার খবরও উঠে এসেছে। এতে পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে বাড়ছে তেলের দাম, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও সামুদ্রিক পথে জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি বৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে। রয়টার্সের বুধবারের বাজারসংক্রান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৬ দশমিক ৬০ ডলারে পৌঁছায়। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়ে দাঁড়ায় ৯৫ দশমিক ৭৯ ডলারে।
বিশ্লেষকদের মতে, উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল রপ্তানি কমে যাওয়ার আশঙ্কা এবং জাহাজ চলাচলে উচ্চ ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় বাজারে দাম বাড়ছে। তবে রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক উদ্বেগ সত্ত্বেও আঞ্চলিক তেল রপ্তানি এখন পর্যন্ত মোটের ওপর ধরে রাখা সম্ভব হয়েছে। ফলে নতুন হামলার কারণে প্রকৃতপক্ষে তেল সরবরাহ কতটা কমেছে, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
হরমুজ প্রণালির গুরুত্বের কারণেই এ সংকট আন্তর্জাতিক অর্থনীতির জন্য বিশেষ উদ্বেগের বিষয়। যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এ জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হতো। ফলে এখানে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থা, পরিবহন ব্যয় এবং জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোর অর্থনীতিতে চাপ বাড়তে পারে।
তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্রের প্রচেষ্টায় বাধা দেওয়ার লক্ষ্য? রয়টার্সকে দেওয়া বক্তব্যে ইরানের দুই কর্মকর্তা দাবি করেছেন, নতুন কৌশলের অন্যতম লক্ষ্য হলো বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমাতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করা। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, আসন্ন মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগেও তেলের দামকে প্রভাবিত করার বিষয়টি তেহরানের হিসাবের অংশ।
তবে এসব বক্তব্য ইরানি কর্মকর্তাদের দাবি হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর এবং ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাৎক্ষণিকভাবে রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ বজায় রাখা এবং নিষেধাজ্ঞা সম্প্রসারণের মাধ্যমে তেহরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর চেষ্টা করছে। পাল্টাপাল্টি চাপের কারণে হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা প্রশমনের পথ আরও জটিল হয়ে উঠছে। বাণিজ্যিক জাহাজের ঝুঁকি ‘গুরুতর’ মার্কিন নৌবাহিনীর নেতৃত্বাধীন জয়েন্ট মেরিটাইম ইনফরমেশন সেন্টার (জেএমআইসি) তাদের সর্বশেষ মূল্যায়নে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ঝুঁকিকে ‘গুরুতর’ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
সংস্থাটির প্রতিবেদনে ড্রোনের উপস্থিতি, বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর লক্ষ্যভিত্তিক নজরদারি এবং ভিএইচএফ রেডিওতে যোগাযোগের মাধ্যমে জাহাজকে সতর্ক বা হয়রানি করার ঘটনার কথা বলা হয়েছে। ইরানের দুই কর্মকর্তা আরও জানিয়েছেন, তেহরান এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে চায়, যাতে দেশটির ঘোষিত বিধিনিষেধ লঙ্ঘনকারী কোনো জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে না পারে। তাঁদের একজন ভবিষ্যতে প্রণালিটি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনার কথাও বলেছেন। তবে প্রণালিটি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়েছে—এমন তথ্য প্রতিবেদনে নেই।
হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা বাড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারের নজর এখন জাহাজ চলাচলের পরিমাণ, পরবর্তী হামলার ঘটনা এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল রপ্তানির ধারাবাহিকতার দিকে। পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম ও সরবরাহে আরও অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।
The post হরমুজে ইরানের কড়া নজরদারি, জাহাজে হামলা বৃদ্ধি—বিশ্বজুড়ে তেলসংকটের শঙ্কা appeared first on ভোরের চেতনা.
