সম্পাদকীয়
বাংলাদেশের প্রচলিত দণ্ডবিধির ৪৯৭ ধারা অনুযায়ী পরকীয়া বা ব্যভিচারের শাস্তি সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড, জরিমানা বা উভয় দণ্ড। তবে এই আইনে কেবল অন্য পুরুষের স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনকারী পরকীয়া সৃষ্টিকারী পুরুষের শাস্তির বিধান রয়েছে। এবং এতে নারীর কোনো শাস্তির বা অপরাধী হিসেবে গণ্য হওয়ার বিধান নেই। তবু আইনকে থোড়াই কেয়ার করে ঝিনাইদহ সদর উপজেলায় পরকীয়ার অপবাদ দিয়ে এক নারীকে মারধর করে তাঁর চুল কেটে দেওয়া হয়েছে!
আজকের পত্রিকায় যে খবর প্রকাশিত হয়েছে, সেটির বিবরণ অনুযায়ী, ২২ অক্টোবর বিকেলে করোতিপাড়া গ্রামের ওই নারীর বাড়িতে গিয়ে প্রথমে তাঁকে সতর্ক করেন পাশের গ্রাম নসায়নপুরের রশিদ। তিনি অভিযোগ অস্বীকার করতেই আরও কয়েকজন সেখানে উপস্থিত হন। পরে তাঁকে মারধর, চুল কেটে দেওয়া এবং শরীরে মরিচের গুঁড়া মাখানোর ঘটনা ঘটে। মাকে রক্ষা করতে গেলে তাঁর ছেলেও লাঠির আঘাত পান। যার সঙ্গে পরকীয়ার অভিযোগ উঠেছে, আনোয়ার নামের সেই ব্যক্তির স্ত্রী নিজ হাতে ওই নারীর চুল কেটে যেন নারকীয় ‘প্রতিশোধ’ নিলেন! অথচ তিনি হয়তো জানেনই না যে দেশের আইনে তাঁর স্বামীরই শাস্তি হওয়ার কথা। এবং নিজেও যে একটি ফৌজদারি অপরাধ করে ফেলেছেন আইন হাতে তুলে নিয়ে, সে ব্যাপারেও নিশ্চয় তিনি জ্ঞাত নন। জানা থাকলে তাঁর সঙ্গীরাও হয়তো আইনকে শ্রদ্ধা করতেন।
সমাজে কারও বিরুদ্ধে অনৈতিক সম্পর্কের অভিযোগ উঠতেই পারে। কিন্তু অভিযোগের বিচার করার দায়িত্ব কি ব্যক্তির, নাকি রাষ্ট্রের আইন ও বিচারব্যবস্থার? ঝিনাইদহের এই ঘটনা আমাদের সেই মৌলিক প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের আগেই কয়েকজন ব্যক্তি যেভাবে একজন নারীর ওপর নির্যাতন চালিয়েছেন, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পরকীয়ার অভিযোগ সত্য কি মিথ্যা, সেটি নির্ধারণের আগেই অভিযুক্তরা নিজেদের বিচারক ও শাস্তিদাতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। অথচ কোনো অভিযোগের সত্যতা যাচাই, সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহ এবং অপরাধের বিচার করার জন্য রাষ্ট্রের নির্দিষ্ট আইন ও প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ব্যক্তিগত সন্দেহ কিংবা সামাজিক অপবাদ কাউকে অন্যের বাড়িতে প্রবেশ, শারীরিক নির্যাতন বা অপমান করার অধিকার দেয় না।
নারীর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে সমাজের একাংশের অতিরিক্ত কৌতূহল এবং নৈতিকতার নামে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রবণতা নতুন নয়। কিন্তু নৈতিকতার প্রশ্নে সমাজ যতটা কঠোর, নারীর মর্যাদা ও নিরাপত্তা রক্ষায় ততটা দায়িত্বশীল কি না, সেটিও ভাবতে হবে। কোনো নারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তাঁর আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ থাকা উচিত। অভিযোগের ভিত্তিতে তাঁকে শাস্তি দেওয়ার নামে চুল কেটে দেওয়া কিংবা শরীরে মরিচের গুঁড়া মাখানো কোনো সামাজিক বিচার নয়, এটি নির্যাতন।
সবাই যদি নিজের হাতে আইন তুলে নেয়, তাহলে সমাজকাঠামো ভেঙে পড়তে বাধ্য। যারা আইন ভাঙছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে এ ধরনের অন্যায় আচরণ ঘটতেই থাকবে। অভিযোগের বিচার আইনের হাতে ছেড়ে দেওয়াই সভ্যতার পরিচয়।

