ছোটবেলার পুজো আমার উত্তর কলকাতার পাড়াতেই কাটত। ওখানে বারোয়ারি পুজো হত। চার দিনের মধ্যে অন্তত তিন দিন তিন রকম নাটক হত, আমার কাছে মূল আকর্ষণ ছিল সেটাই। এক দিন শুধু মহিলারা অভিনয় করতেন, তাঁরাই পুরুষ চরিত্রে অভিনয় করতেন তাঁরা। এক দিন ছোটদের অভিনয়ও হত আর অন্য একটা দিন সবাই মিলে অভিনয় করতাম। আমার বাবা মূলত নাটক পরিচালনা করতেন।
পুজোর আগে এক মাস আগে থেকে মহড়া শুরু হয়ে যেত। বিভিন্ন বাড়িতে গিয়ে আমরা নাটকের মহড়া দিতাম। পুজোর কাছাকাছি এসে গেলে আমরা সবাই মিলে পোশাক তৈরি করতাম, সেট তৈরি করতাম। ওটা একটা সবচেয়ে বড় উৎসাহের জায়গা ছিল, ছোটবেলার পুজোর সঙ্গে যা ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে আছে। আমার প্রথম অভিনয় কিন্তু আমার পাড়ার পুজো স্টেজেই। ‘গুলশান’ বলে একটা নাটকে আমি অভিনয় করেছিলাম।
পুজোর আগে এক মাস আগে থেকে মহড়ায় মাততেন অম্বরীশ। ছবি: সংগৃহীত
প্রথমে তো আমি কিছুতেই অভিনয় করতে চাইছিলাম না। কারণ, স্টেজে উঠতে আমি খুব ভয় পেতাম। আমার পাড়ায় ছিলেন ধ্রুবকাকু, তিনি পরিচালনা করেছিলেন। তিনি আমাকে বলেছিলেন, ‘আমি জানি তুই পারবি। মহড়া দিলেই পারবি, তোর কোনও ভয় নেই।’ তখন আমি ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ি। সপ্তমীর দিন স্টেজে ওঠার আগেও আমার প্রচণ্ড পা কাঁপছিল, ভয় করছিল। এর পর যখন স্টেজে উঠে পড়লাম, এবং প্রথম দৃশ্যেই দর্শক খুব হাততালি দিলেন, তখন আমি বুঝতে পারলাম যে এটাই আমার জায়গা। এই উপলব্ধি খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
অষ্টমীতে অঞ্জলি দিতাম, ভোগ পরিবেশন করতাম। বন্ধুদের প্রেম করা দেখতাম। আমার প্রেম কোনওদিন হয়নি। কেউ আমার দিকে ফিরেও তাকাত না। আমি কারও দিকে এগিয়ে গেলে সে আমার গাল টিপে আদর করে দিত। প্রেমের দৃষ্টিতে কেউ কোনওদিনই দেখেনি। এই দুঃখ আমার আজীবন থেকে যাবে। এখনও দেখে না অবশ্য, এমনই আমার কপাল! কিছু কিছু লোক বিভিন্ন কপাল নিয়ে আসে না! আমার যেমন। দেখো, জীবনে আমি অনেক বড় মানুষের সঙ্গে অভিনয় করেছি। তেমন এটাকেও মেনে নিতে হবে যে, আমার জীবনে প্রেম হবে না।
পুজোর খাওয়া ছিল তাঁর বিশেষ আগ্রহের বিষয়। ছবি: সংগৃহীত
আর পুজোর খাওয়াদাওয়া! আহা! আগে একসঙ্গে দু-প্লেট বিরিয়ানি খেতাম, এখন অবশ্য অর্ধেক প্লেটও শেষ করতে পারি না। আমি নানা ধরনের খাওয়ায় বিশ্বাসী। ষষ্ঠীর দিন নিরামিষ খাই। বিভিন্ন রকম সবজি দিয়ে একটা নবরত্ন তরকারি হবে, তার সঙ্গে একটা কড়াইশুঁটি দিয়ে ডাল, কড়াইশুঁটি এবং অন্যান্য সব্জি দিয়ে মুগের ডাল, তার সঙ্গে একটা হালকা পোলাওয়ের সঙ্গে ছানা হতে পারে, ধোঁকাও হতে পারে, আর শেষ পাতে লাগবে রাবড়ি। নিরামিষের দুঃখটা ভোলাতে শেষ পাতে রাবড়ি লাগবেই।
সপ্তমীতে দু’রকমের মাছ খাব। দই-কাতলা হতে পারে, আর সরষে ইলিশ অবশ্যই। তার সঙ্গে পোলাও বা ভাত। আর শেষ পাতে রসমালাই আর নরম পাকের সন্দেশ।
অষ্টমীর দিন তো পুরোপুরি খিচুড়ি ভোগ, লাবড়া, সঙ্গে কষা আলুর দম আর বোঁদে থাকবে। সঙ্গে চাটনি, পাপড় এবং মিষ্টি। নবমীর দিন অবশ্যই সাদা ভাত, পাঁঠার মাংস, ডাল, আর নানা ধরনের মিষ্টি। আর দশমীর দিন তো মনটা খারাপ থাকে, তাই ওই দিনটা একটু নিরামিষ খেলেই ভাল হয়। তবে সে দিনও প্রচুর মিষ্টান্ন থাকতেই হবে। এই মেনু আমি সারা জীবন খেয়ে এসেছি পুজোর চার দিন, আর যত দিন বাঁচব তত দিন এই মেনু আমার বাঁধা প্ল্যান। আগে স্ট্রিট ফুডও ছিল, প্রত্যেক সন্ধ্যেবেলায়, ডিনারটাও রাস্তাতেই হত। রাস্তার ধারের চাউমিন, এগ রোল থেকে শুরু করে ফিশ ফিঙ্গার, বিরিয়ানি— যা পেতাম তাই খেতাম।
পুজোর চার দিনের পোশাক নিয়ে আমি কোনওদিন খুব একটা সচেতন ছিলাম না। ওই একটা সময় অবধি পুজোয় জিনিসপত্র দেওয়া হত, আত্মীয়স্বজন, বাবা-মায়েরা দিতেন। সেগুলো পরতাম পুজোর সময়। তবে আমি বরাবরই কিন্তু পুজোর সময় খুব সাজগোজের পক্ষপাতী নই। কারণ, পুজোর সময় প্রচুর গরম লাগে, ঘামও হয়। ফলে বেশি সাজগোজ করলে সমস্যা। ফলে আমি ওই হালকা পাঞ্জাবি, ফতুয়া, টি-শার্টেই কমফর্টেবল।
এ বারে পুজোর চার দিন একেবারে বিশ্রাম নেব। তার পর একটা ছোট্ট অনুষ্ঠান আছে বাইরে, সেই অনুষ্ঠানে যাব। ষষ্ঠীর দিন পরিক্রমায় যাব। সপ্তমীতেও একটা অনুষ্ঠান আছে। ব্যস, এর পর পরিবার আর বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা জমবে। ভারতের বিভিন্ন কোনা থেকে বন্ধুরা আসে, তাদের সঙ্গে আড্ডা দেব। অনেকের বাড়িতে নিমন্ত্রণও থাকে সেখানেও যাই। আর রাত্রিবেলা মাঝেমধ্যে গাড়ি নিয়ে বেরোই। দূর থেকে সবাইকে দেখি, আর এই করেই কেটে যায় আমার পুজো।
