Published on
:
2 min read
বোধনের আগেই বিসর্জনের শোক। জন্মদাত্রী মায়ের অমৃতলোকে যাত্রা। যে মায়ের হাত ধরে পথচলা, শৈশবের রীতিনীতি, নিষ্ঠা ও নিয়মের বেড়াজালে তিলে তিলে গড়ে তুলেছিলেন এই সন্তানকে, সে সব থমকে গেল স্মৃতির বেড়াজালে। এ যেন এক মায়ের আগমন। আর এক মায়ের জাগতিক নিয়মে প্রস্থান।
তবুও ভুলিনি শৈশবকে। পাড়ার ক্লাবে বাঁশ পড়তেই এক ছুটে মায়ের কাছে চলে যেতাম। নতুন জামা, প্যান্ট আর জুতোর বায়না নিয়ে। মহালয়ার অনেক আগেই পুজোর বাজার হয়ে যেত। তখন তো ক্লাবের ছেলেরাই কিছুটা করে প্যাণ্ডেলের কাজ এগিয়ে রাখত। আমরা সমবয়সি কয়েকজন বন্ধু বিকেলে আর খেলার মাঠে যেতাম না। সেই কাজ দূর থেকে দেখতাম। আনন্দে বাঁশের স্ট্রাকচার বেয়ে অনেক উঁচুতে উঠে যেতাম। ঝুলতাম, আবার দোলও খেতাম। প্যাণ্ডেল হয়ে গেলে পাড়ার সবাই মিলে দল বেঁধে ঠাকুর আনতে যাওয়ার মুহূর্তগুলো আজও ভুলতে পারি না। ঠাকুর এসে পৌঁছলে প্রায় সব বাড়ি থেকেই শাঁখ বেজে উঠত। শাস্ত্রীয় রীতি বাদ দিলে মায়ের পুজো যেন ওইদিন থেকেই শুরু হয়ে যেত।
আমরা চার ভাই এক বোন। পুজোয় নতুন জামাকাপড় হলেও তার বেশি একটা আধিক্য ছিল না। একটি জামা আর একটি প্যান্ট। খুব বেশি হলে আরও একটি জামা বাড়ত। মনে আছে, পুজো দেখে এসে রাতে সেই জামাটি ভাঁজ করে বিছানার বালিশের তলে রেখে দিতাম। ইস্ত্রি হয়ে যেত। পরদিন পরতে হবে তো? সেটার মধ্যেও খুব আনন্দ ছিল। সারল্যও ছিল। ভাসানের আগের দিন পাড়ার পুজোয় খুব ধুমধাম সহকারে প্রতিযোগিতামূলক ধুনুচি নাচ হতো। প্রাইজ় না পেলেও সবাই আমার যথেষ্ট তারিফ করত। পুজোর সময়ে খুনসুঁটিও করেছি অনেক। তখন তো বয়স অনেক কম। কয়েকজন বন্ধু মিলে দশমীর দিনে কোনও হোটেলে ভালো-মন্দ খেয়ে ভিড়ের ফাঁক গলে বেরিয়ে এসেছি। এখন কোনও অবসরের মুহূর্তে সে সব কথা খুব মনে পড়ে। খুবই হাসি পায়।
এরকমই একদিন পুজোর রাতে বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে প্রথম সিগারেটে টান দিয়েছিলাম। একদিন তো বাবার হাতে ধরা পড়ে গিয়েছিলাম। কথায় আছে না, যেখানে বাঘের ভয় সেখানেই সন্ধ্য্য হয়। বাড়ির দরজার মুখেই উনি দাঁড়িয়ে ছিলেন। বুঝতে দেরি হয়নি তাঁর। অনেক বলেছিলেন তিনি। তার পরে বেশ কিছুকাল আর সিগারেট খাইনি।
আরে আসল কথাই তো এড়িয়ে গিয়েছি। চারদিকে চারটি মাইকের চোঙ খুব উঁচু বাঁশে লাগিয়ে গান শুরু হয়ে যেত। ছোটবেলা থেকেই গানের প্রতি আমি খুবই দুর্বল তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তখন আমার পছন্দের শিল্পীদের গান বাজলেই আমার মনে ঝড় উঠত। ঘুরে-ফিরে সারাদিন বাজত। আমিও নিজের মনে সেই গানের সুর তুলতাম। পুজো মানেই তো মনের আনন্দ। যাঁর গানের সঙ্গে আমার সখ্যতা ও প্রেম গড়ে উঠেছিল তিনি আমার পরম পূজনীয় মান্না দে। ওই শিল্পীর পুজোর গান মন দিয়ে শুনতাম। খাতায় লিখতাম। হারমোনিয়ামে চর্চা করতাম। পুজোর পরে যখন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হতো আমি সেই গানগুলো গাইতাম।
তারপরে তো প্রায় প্রত্যেক পুজোতেই আমার নিজের গানের অ্যালবাম রিলিজ় হতো। কোথাও হয়তো পুজোর অনুষ্ঠানে গান গাইতে যাচ্ছি। শুনতে পেলাম অন্য কোনও পুজোর মণ্ডপে আমার গান বাজছে। এ আনন্দ, এ অনুভূতি বোধহয় কোনও ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না।