বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দক্ষিণ পাশে নির্মাণাধীন ক্যানসার, হৃদরোগ ও কিডনি চিকিৎসায় বিশেষায়িত হাসপাতাল ভবন। ছবি: খবরের কাগজ
পাঁচ বছর আগে শুরু হয়েছিল বরিশালে ক্যানসার, কিডনি ও হৃদরোগের চিকিৎসায় নতুন হাসপাতাল নির্মাণকাজ। কিন্তু সেই কাজ এখনো শেষ হয়নি। উল্টো ১৪০ শতাংশ বেড়েছে প্রকল্পের ব্যয়। শুরুতে শুধু ভবন নির্মাণের চুক্তিমূল্য ছিল ৯৯ কোটি ৫১ লাখ টাকা। তিন দফায় সময় বাড়িয়ে এখন পুরো প্রকল্পে খরচ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৩৯ কোটি টাকা। লিফট ও এস্কেলেটর স্থাপনে দরপত্র জটিলতা, চিকিৎসা সরঞ্জাম স্থাপনে বিলম্ব এবং জনবলকাঠামো চূড়ান্ত না হওয়ায় হাসপাতালটি কবে চালু হবে, তা-ও অনিশ্চিত।
২০২১ সালের ২৩ জুলাই শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দক্ষিণ পাশে চার একর জমিতে প্রকল্পটির সাজেস্ট কাজ শুরু হয়। গণপূর্ত বিভাগ জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত প্রায় ১৭৯ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। নির্মাণকাজের ৮০ শতাংশ শেষ হয়েছে। বাকি কাজ ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রথম অনুমোদিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে (ডিপিপি) ব্যয় ধরা হয়েছিল ১৭৫ কোটি টাকা। পরে দুই দফায় তা বেড়ে সর্বশেষ অনুমোদিত ব্যয় দাঁড়িয়েছে ২৩৮ কোটি ৮৩ লাখ ৪৯ হাজার টাকা। প্রাথমিক ভবন নির্মাণ চুক্তিমূল্যের তুলনায় পুরো প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে ১৩৯ কোটি ৩২ লাখ ৪৯ হাজার টাকা।
আরও পড়ুন
হাসপাতালটির ১৭ তলা ভবনের ১৫টি তলা মাটির ওপরে, দুটি বেজমেন্টে। প্রতি তলায় প্রায় ১৫ হাজার ৫০০ বর্গফুট জায়গা রয়েছে। এখানে মোট ৪৬০টি শয্যা রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ক্যানসার রোগীদের জন্য ১৫৪টি, কিডনি রোগীদের জন্য ১৬৪টি এবং হৃদরোগীদের জন্য ১৪২টি শয্যা থাকবে। এ ছাড়া ২০টি নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্র (সিসিইউ), ১০টি অস্ত্রোপচার কক্ষ ও চারটি ক্যাথল্যাব স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
গণপূর্ত বিভাগের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী রাশেদুল ইসলাম বলেন, ‘বর্তমানে ভবনের টাইলস, মার্বেল, স্যানিটারি ও বৈদ্যুতিক কাজ চলছে। অর্থ বরাদ্দ পাওয়া সাপেক্ষে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘লিফট ও এস্কেলেটর স্থাপনে দরপত্র জটিলতা দেখা দিয়েছে। ২০২৩ সালে এসব সরঞ্জাম সরবরাহ ও স্থাপনের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। কিন্তু প্রাক্কলিত মূল্যের চেয়ে বেশি দর প্রস্তাব করায় ঠিকাদার নির্বাচন করা সম্ভব হয়নি। পরে দরপত্র প্রক্রিয়া পুনর্বিবেচনার জন্য পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
গণপূর্ত বিভাগের ইলেকট্রিক্যাল ও মেকানিক্যাল উপবিভাগীয় প্রকৌশলী রাকিব হোসেন বলেন, ‘মূল ভবনের কাজ শেষ পর্যায়ে। তবে বিদ্যুৎ সরবরাহের সাবস্টেশনের সরঞ্জাম, পয়োনিষ্কাশন শোধনাগার, মেডিকেল গ্যাস সরবরাহ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ব্যবস্থা স্থাপন বাকি রয়েছে। ইতালি থেকে মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্ল্যান্টটি চলতি মাসে জাহাজীকরণের কথা রয়েছে। লিফট ও এস্কেলেটরের জন্য নতুন করে দরপত্র আহ্বান করতে হবে।’
বরিশাল গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সল আলম জানান, হাসপাতালটির সংশোধিত প্রকল্প প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। লিফট ও দুই জোড়া এস্কেলেটরের দরপত্র দ্রুত আহ্বানের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি নেওয়ার উদ্যোগ চলছে। সংশোধিত ডিপিপি অনুমোদন হলে কার্যাদেশ দেওয়া সম্ভব হবে। সরঞ্জামগুলো বিদেশ থেকে আনতে হবে বলে সময় লাগবে।
নির্মাণকাজের পাশাপাশি হাসপাতাল চালুর জন্য প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের বিষয়টিও ঝুলে আছে। চিকিৎসক, নার্স, টেকনোলজিস্ট ও কারিগরি কর্মীসহ জনবলকাঠামো এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. মাজহারুল রেজওয়ান বলেন, ‘হাসপাতালটি চালুর জন্য ২ হাজার ৫০ জন জনবলের একটি কাঠামো তৈরি করে প্রকল্প পরিচালকের কাছে পাঠানো হয়েছে। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামের তালিকাও দেওয়া হয়েছে। তবে জনবলকাঠামো অনুমোদন ও নিয়োগের বিষয়ে এখনো নির্দিষ্ট সময়সীমা জানানো হয়নি।’
এদিকে শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ক্যানসার ইউনিটে রোগীর সংখ্যা বাড়লেও শয্যা ও চিকিৎসাসুবিধা সীমিত। ইউনিটের বিভাগীয় প্রধান ডা. আ ন ম মঈনুল ইসলাম বলেন, ‘বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চল থেকে প্রতিবছর প্রায় ১৫ হাজার ক্যানসার, কিডনি ও হৃদরোগী চিকিৎসার জন্য এ হাসপাতালে আসেন। শয্যাসংকটের কারণে সবাইকে চাহিদামতো সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।’
