ইন্দোনেশিয়ায় দীর্ঘস্থায়ী খরার কারণে নদীর পানি কমে যাওয়ায় পাম তেল পরিবহনে বিঘ্ন ঘটছে। এতে কারখানাগুলো উৎপাদিত তেল সরবরাহ করতে পারছে না। মজুত ট্যাংক ভরে যাওয়ায় অনেক কারখানা পাম ফল কেনা কমিয়ে দিয়েছে। ফলে হাজারো ক্ষুদ্র চাষি তাদের উৎপাদিত ফল বিক্রি করতে না পেরে লোকসানে পড়েছেন।
পশ্চিম কালিমান্তান প্রদেশের ৩৩ বছর বয়সী চাষি সুপেন্দি অক্টোবরের শুরুতে সাত টন পাম ফল নিয়ে সাঙ্গাউ শহরের একটি কারখানায় যান। চার দিন অপেক্ষা করেও ফল বিক্রি করতে পারেননি তিনি। কারখানাটিতে জায়গা না থাকায় তাকে ফল নিয়ে ফিরে যেতে বলা হয়।
সুপেন্দি রয়টার্সকে বলেন, কারখানা তার ফল নেয়নি। এখন কীভাবে সেগুলো বিক্রি করবেন, তা বুঝতে পারছেন না তিনি। তার মতো হাজারো ক্ষুদ্র চাষি বিক্রি করতে না পারায় ফল পচে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছেন।
এল নিনোর প্রভাবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে তীব্র গরম ও খরা দেখা দিয়েছে। প্রশান্ত মহাসাগরের পানি উষ্ণ হয়ে ওঠার সঙ্গে সম্পর্কিত এই আবহাওয়াগত পরিস্থিতিতে ইন্দোনেশিয়ার নদী ও কূপের পানি কমে গেছে। বোর্নিও ও সুমাত্রা দ্বীপে বনাঞ্চলে আগুনও ছড়িয়ে পড়েছে। এর ধোঁয়ায় ইন্দোনেশিয়ার বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের কিছু অংশে দূষিত কুয়াশা ছড়িয়েছে।
ইন্দোনেশিয়া বিশ্বের সবচেয়ে বড় পাম তেল উৎপাদক দেশ। দেশটির মোট উৎপাদনের প্রায় ১১ শতাংশ আসে পশ্চিম কালিমান্তান থেকে। বিশ্লেষকদের ধারণা, এল নিনোর কারণে পরিবহনব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় ইন্দোনেশিয়ার বোর্নিও অঞ্চলে বছরের শেষ প্রান্তিকে পাম তেলের উৎপাদন ১২-১৫ শতাংশ কমতে পারে।
নদীর পানি কমে ব্যাহত পরিবহন
ইন্দোনেশিয়ার দীর্ঘতম নদী কাপুয়াসের দৈর্ঘ্য ১ হাজার ১৪৩ কিলোমিটার। পশ্চিম কালিমান্তানের উৎপাদিত পাম তেলের প্রায় ৪০ শতাংশ এই নদীপথে পরিবহন করা হয়। কিন্তু পানি কমে নদীতে বালুর চর জেগে উঠেছে। ফলে পণ্যবাহী বার্জ ও টাগবোট আটকে পড়ছে।
সড়কপথে পণ্য পরিবহনের বিকল্প থাকলেও ট্রাকে একবারে কম পণ্য নেওয়া যায়। তা ছাড়া পর্যাপ্ত ট্রাকও পাওয়া যাচ্ছে না। নদীপথের তুলনায় ট্রাকে পরিবহন খরচ প্রায় তিন গুণ বেশি।
স্থানীয় চাষিদের ভাষ্য, ২০১৫ ও ২০১৮ সালের এল নিনোর সময়ও প্রায় এক মাস ধরে একই ধরনের খরা হয়েছিল। কিন্তু এবার কাপুয়াস নদীর পানি আরও নিচে নেমেছে এবং এর প্রভাব টানা দুই মাস ধরে চলছে।
ইন্দোনেশিয়ার আবহাওয়া সংস্থা জানিয়েছে, সাধারণত অক্টোবরে বর্ষা শুরু হলেও এবার তা পিছিয়ে নভেম্বরে শুরু হতে পারে। এতে নদীর পানির স্তর বাড়তে আরও সময় লাগবে। একই সঙ্গে গত ১১ বছরের মধ্যে দেশটির সবচেয়ে তীব্র দাবানলগুলোর প্রভাব থেকেও দ্রুত মুক্তি পাওয়ার সম্ভাবনা কমেছে।
উৎপাদন ও আয় কমছে
পশ্চিম কালিমান্তানের ৫০টি পাম তেল কারখানার মধ্যে ১৩টি পরিবহন সমস্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব কারখানার সম্মিলিত প্রক্রিয়াজাতকরণ সক্ষমতা প্রদেশটির মোট সক্ষমতার প্রায় অর্ধেক। ইন্দোনেশিয়ার পাম তেলবিষয়ক সংগঠন গাপকির পশ্চিম কালিমান্তান শাখার প্রধান আরিস সুপ্রাতমান জানান, পরিবহন সমস্যার কারণে সেপ্টেম্বরে প্রদেশটির পাম তেলের সরবরাহ আগস্টের তুলনায় প্রায় ১১ শতাংশ কমেছে।
গাপকির পূর্বাভাস অনুযায়ী, শুষ্ক আবহাওয়ায় ফল পরিপক্ব হতে দেরি হওয়ায় ২০২৬ সালে ইন্দোনেশিয়ার পাম তেলের মোট উৎপাদনের পূর্বাভাস ২ দশমিক ৯ শতাংশ কমানো হয়েছে।
সুপেন্দিকে ফিরিয়ে দেওয়া কারখানাটির ব্যবস্থাপক দিয়ান কুর্নিয়াওয়ান জানান, জুলাইয়ে তাদের কারখানায় ৩০ হাজার টন পাম ফল প্রক্রিয়াজাত করা হলেও সেপ্টেম্বরে তা কমে ১০ হাজার টনে দাঁড়ায়। ১ অক্টোবর কারখানাটিতে অপরিশোধিত পাম তেলের মজুত ছিল ৮ হাজার ২০০ টন। ট্যাংকের ধারণক্ষমতা ৮ হাজার ৫০০ টন হওয়ায় নতুন তেল রাখার জায়গাও প্রায় শেষ হয়ে এসেছে।
দিয়ান বলেন, সাধারণত চার দিনে ট্রাকে দুই হাজার টন তেল পাঠানো সম্ভব হলেও এখন কখনো কখনো দিনে মাত্র ১০০ টন পাঠানো যাচ্ছে। ট্রাকে পরিবহন শুধু ধীরগতিরই নয়, বার্জের তুলনায় প্রায় তিন গুণ ব্যয়বহুল।
ফল বিক্রি করতে না পারায় চাষিরা পামগাছের পরিচর্যার খরচও কমাতে বাধ্য হচ্ছেন। ক্ষুদ্র চাষিদের সংগঠন আপকাসিন্দোর পশ্চিম কালিমান্তান শাখার প্রধান ইন্দ্রা রুস্তান্দি জানান, আয় কমে যাওয়ায় কেউ কেউ খরচ বাঁচাতে সারের ব্যবহার ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দিয়েছেন।
সাঙ্গাউয়ের ৬৩ বছর বয়সী আরেক চাষি রহমত উইয়োনো বলেন, গত দুই মাস ধরে ফল বিক্রি করতে সমস্যায় পড়ছেন তিনি। কখনো ছয় ঘণ্টা গাড়ি চালিয়ে গিয়ে প্রতি কেজি ফলের দাম পেয়েছেন মাত্র ২ হাজার ৬৫০ রুপিয়া, যেখানে তার নিয়মিত কারখানাটি তিন ঘণ্টার দূরত্বে এবং সেখানে প্রতি কেজির দাম ছিল ৩ হাজার ৪০০ রুপিয়া।
তিনি জানান, কয়েকজন চাষি গত দুই মাসে কোনো ফলই বিক্রি করতে পারেননি। সংসারের খরচ চালাতে তাদের কেউ কেউ ঘরে তৈরি কেক ও ডোনাট বিক্রির মতো বিকল্প আয়ের পথ খুঁজছেন।
