অস্ট্রেলিয়ায় ভিসা প্রত্যাখ্যানের বিরুদ্ধে আপিল করে দীর্ঘ অপেক্ষায় পড়েছেন বাংলাদেশিসহ হাজার হাজার বিদেশি নাগরিক। শিক্ষার্থী ভিসা থেকে শুরু করে অভিবাসন ও সুরক্ষা ভিসার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আবেদন জমছে দেশটির প্রশাসনিক পর্যালোচনা ট্রাইব্যুনালে। নতুন আবেদন আসার তুলনায় নিষ্পত্তি কম হওয়ায় মামলার জট আরও বাড়ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি চাপ তৈরি করেছে শিক্ষার্থী ভিসাসংক্রান্ত আপিলে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) প্রকাশিত অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ রিভিউ ট্রাইব্যুনালের (এআরটি) ২০২৫–২৬ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে,চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত ট্রাইব্যুনালে সব ধরনের মিলিয়ে ১ লাখ ৩৩ হাজার ৭৪৯টি মামলা নিষ্পত্তির অপেক্ষায় ছিল। আগের বছরের তুলনায় এই সংখ্যা প্রায় ২০ শতাংশ বেশি।
বিদায়ী অর্থবছরে ট্রাইব্যুনালে নতুন করে ৮৬ হাজার ৯৮০টি আবেদন জমা পড়ে। একই সময়ে নিষ্পত্তি হয় ৬৫ হাজার ৯০০টি। অর্থাৎ, এক বছরে যত আবেদন জমা হয়েছে, তার তুলনায় নিষ্পত্তি হয়েছে প্রায় ২১ হাজার কম। ফলে আগের মামলাগুলোর সঙ্গে নতুন আবেদন যুক্ত হয়ে জট আরও বেড়েছে।
সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে শিক্ষার্থী ভিসা নিয়ে। এক বছরের ব্যবধানে এ ধরনের আপিল আবেদন বেড়েছে ৪২ শতাংশ। ২০২২–২৩ অর্থবছরের তুলনায় বর্তমানে শিক্ষার্থী ভিসার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আবেদন প্রায় ১৪ গুণ বেশি। বিদেশি শিক্ষার্থীদের ভিসা নিয়ে সরকারের কঠোর অবস্থানের মধ্যেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ায় পড়াশোনা করতে আসা অনেক শিক্ষার্থী ভিসা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার জন্য ট্রাইব্যুনালের দ্বারস্থ হন। কিন্তু আপিলের সংখ্যা দ্রুত বাড়ায় সিদ্ধান্ত পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে তাঁদের।
ট্রাইব্যুনালের প্রকাশিত নিষ্পত্তির সময়সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত নিষ্পত্তি হওয়া শিক্ষার্থী ভিসা প্রত্যাখ্যানের আপিলগুলোর অর্ধেক শেষ করতে আবেদন জমার দিন থেকে সর্বোচ্চ এক বছর পাঁচ মাস লেগেছে। আর ৯৫ শতাংশ মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে দুই বছর দুই মাসের মধ্যে।
অভিবাসনসংক্রান্ত অন্যান্য মামলার ক্ষেত্রেও অপেক্ষা কম নয়। একই সময়ের হিসাবে অভিবাসনসংক্রান্ত নিষ্পত্তি হওয়া মামলার অর্ধেক শেষ হয়েছে এক বছর পাঁচ মাসের মধ্যে। সুরক্ষা বা শরণার্থী ভিসার আপিলের ক্ষেত্রে এই সময় ছিল দুই বছর এক মাস। বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী,ট্রাইব্যুনালে জমা পড়া নতুন আবেদনগুলোর বড় অংশই অভিবাসনসংক্রান্ত। মোট আবেদনের প্রায় ৫৫ শতাংশ এই খাতের। অন্যদিকে প্রায় ২০ শতাংশ আবেদন এসেছে সুরক্ষা বা আশ্রয়সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে। ৩০ জুন পর্যন্ত ট্রাইব্যুনালে অভিবাসনসংক্রান্ত ৮০ হাজার ৮৫৫টি এবং সুরক্ষাসংক্রান্ত ৩৭ হাজার ৫০৩টি মামলা বিচারাধীন ছিল। এই দুই খাতেই জমে থাকা মামলার সংখ্যা অস্ট্রেলিয়ার অভিবাসন ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে।
বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে অস্ট্রেলিয়ায় আসা শিক্ষার্থী ও অভিবাসীরাও ভিসা প্রত্যাখ্যানের বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ পান। বিশেষ করে যাঁদের পড়াশোনা, চাকরি কিংবা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ভিসার সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে, তাঁদের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।
তবে কোন দেশের কতজন আবেদনকারী বর্তমানে ট্রাইব্যুনালে আপিল করে অপেক্ষায় রয়েছেন, সে বিষয়ে এই বার্ষিক প্রতিবেদনের আলোচিত পরিসংখ্যানে আলাদা তথ্য দেওয়া হয়নি।
মামলার চাপ বাড়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন ট্রাইব্যুনালের সভাপতি বিচারপতি এমিলিওস কাইরু। তাঁর মতে, বিপুলসংখ্যক আবেদন সামাল দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় জনবল ও সম্পদ পর্যাপ্ত নয়। ফলে আবেদন নিষ্পত্তিতে সময় বাড়ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ট্রাইব্যুনালে কর্মী ও সদস্যসংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। গত অর্থবছরে সদস্যসংখ্যা ১১ শতাংশের বেশি বেড়ে ৪১৩ জনে পৌঁছেছে। কর্মীসংখ্যা ২৫ শতাংশের বেশি বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ২৯০ জন। তারপরও নতুন আবেদন আসার চাপ কমেনি।
এদিকে শিক্ষার্থী ভিসার আপিল দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য চলতি বছরের ১ জুন থেকে নতুন ব্যবস্থা কার্যকর হয়েছে। অধিকাংশ শিক্ষার্থী ভিসা প্রত্যাখ্যানের আপিল এখন সরাসরি মৌখিক শুনানি ছাড়াই লিখিত নথি ও বক্তব্যের ভিত্তিতে নিষ্পত্তি করার বিধান চালু হয়েছে। তবে নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম রয়েছে।
নতুন ব্যবস্থায় যেসব শিক্ষার্থীর আপিল এখনো ট্রাইব্যুনালের কোনো সদস্যের কাছে বিচারের জন্য বরাদ্দ হয়নি, তাঁদের মামলাও এই নিয়মের আওতায় আসতে পারে। অন্যদিকে যাঁদের শুনানির তারিখ ইতিমধ্যে নির্ধারিত হয়েছে, তাঁদের শুনানি আগের নিয়মেই চলবে।
অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়ায় ভিসা আপিলের খরচও কম নয়। চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে সাধারণ অভিবাসন ভিসার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আবেদন ফি বেড়ে হয়েছে ৩ হাজার ৭২৭ অস্ট্রেলীয় ডলার। আর সুরক্ষা ভিসার আপিলের জন্য নির্ধারিত ফি ২ হাজার ২৯৩ ডলার, যা সাধারণত আবেদন ব্যর্থ হলে দিতে হয়। তবে আর্থিক অসচ্ছলতার ভিত্তিতে কিছু ক্ষেত্রে ফি কমানোর সুযোগ রয়েছে।
২০২৪ সালের ১৪ অক্টোবর পুরোনো অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ আপিলস ট্রাইব্যুনালের পরিবর্তে নতুন অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ রিভিউ ট্রাইব্যুনাল কার্যক্রম শুরু করে। উদ্দেশ্য ছিল সরকারি সিদ্ধান্তের পুনর্বিবেচনা আরও কার্যকর ও সহজলভ্য করা। কিন্তু কার্যক্রম শুরুর দুই বছরের মধ্যেই বিপুলসংখ্যক আবেদন সামলানো প্রতিষ্ঠানটির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ট্রাইব্যুনালের সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন বলছে, জনবল বাড়ানো এবং মামলা নিষ্পত্তির নিয়ম পরিবর্তনের পরও নতুন আবেদনের চাপ অব্যাহত রয়েছে। ফলে ভিসার সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় থাকা হাজারো মানুষের অনিশ্চয়তা কাটাতে মামলার জট কমানোই এখন প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
