অনিয়মের অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ দপ্তর
ঢাকায় জেলা রেজিস্ট্রার নেই
ফরিদপুর থেকে এসে দুই দিন অফিস করেন শফিকুল ইসলাম, অধীনস্থ সাব-রেজিস্ট্রারদের বিরুদ্ধেও অর্থ আদায়ের অভিযোগ; সরকারি ওয়েবসাইটেও নেই পর্যাপ্ত
তথ্য
------------->
ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে নিয়মিত দায়িত্ব পালন, দাপ্তরিক স্বচ্ছতা ও দলিল নিবন্ধন ব্যবস্থাপনা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, ঢাকায় বর্তমানে জেলা রেজিস্ট্রার নেই; ফরিদপুরের জেলা রেজিস্ট্রার শফিকুল ইসলাম ঢাকা এসে সপ্তাহে দুই দিন অফিস করেন। এদিকে তাঁর বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ, দলিল নিবন্ধনে অনিয়ম ও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে তাঁর অধীনস্থ একাধিক সাব-রেজিস্ট্রারের বিরুদ্ধেও অর্থ আদায় ও দুর্নীতির অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
অন্যদিকে ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের সরকারি ওয়েবসাইটে প্রয়োজনীয় দাপ্তরিক তথ্যের ঘাটতি, কর্মকর্তাদের পরিচিতি ও যোগাযোগের তথ্য না থাকা এবং তথ্য হালনাগাদ না করার বিষয়টিও সামনে এসেছে। গুরুত্বপূর্ণ এই দপ্তরে অভিযোগগুলোর বিষয়ে কার্যকর তদারকি ও জবাবদিহি কতটা রয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
দায়িত্ব পালনে ঘাটতি, তদারকি নিয়ে প্রশ্ন>
নিবন্ধন অধিদপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (এস্টেট, উন্নয়ন, তথ্য ও জনসংযোগ এবং আইন, তদন্ত ও মতামত) মো. আব্দুল বারীর কাছে ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রারের দায়িত্ব পালন সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ঢাকায় কোনো রেজিস্ট্রার নেই; ফরিদপুর থেকে শফিকুল ইসলাম এসে সপ্তাহে দুই দিন অফিস করেন।
শফিকুল ইসলাম ও তাঁর অধীনস্থ সাব-রেজিস্ট্রারদের বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে আব্দুল বারী এসব বিষয়ে কিছু জানেন না বলে দাবি করেন। সরকারি ওয়েবসাইটে প্রয়োজনীয় তথ্য না থাকার বিষয়টি তুলে ধরলে তিনি জানান, তাঁরা ব্যস্ত সময় পার করছেন, সব ঠিক হয়ে যাবে।
তবে গুরুত্বপূর্ণ একটি সরকারি দপ্তরে নিয়মিত দায়িত্ব পালন, অভিযোগের অনুসন্ধান এবং নাগরিকদের তথ্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কী ব্যবস্থা রয়েছে, সে বিষয়ে তাঁর বক্তব্যে বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
দলিল নিবন্ধন ঘিরে অর্থ আদায়ের অভিযোগ>
অভিযোগকারীদের দাবি, ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রারের অধীনে জেলা সদরসহ প্রায় ২৩টি সাব-রেজিস্ট্রি অফিস রয়েছে। এসব কার্যালয়ে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক দলিল নিবন্ধন হয়। অভিযোগ রয়েছে, দলিলপ্রতি ২ হাজার ৫০০ টাকা করে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হয়। এ ছাড়া প্রতিটি সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে মাসে ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়া হয় বলে একটি সূত্র দাবি করেছে।
আগের কর্মস্থলেও অনিয়মের অভিযোগ>
প্রাপ্ত তথ্য ও অভিযোগ অনুযায়ী, শফিকুল ইসলাম এর আগে মেহেরপুর ও ঝিনাইদহের মহেশপুরে সাব-রেজিস্ট্রার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ওই সময় তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ ওঠার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কর্মস্থলে তাঁর অনুপস্থিতি এবং পরবর্তী সময়ে ফরিদপুরে যোগদানের বিষয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তাঁদের দাবি, ২০২৪ সালের ১০ অক্টোবর ফরিদপুরের জেলা রেজিস্ট্রার হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তাঁর অধীনস্থ কয়েকটি সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসে। এসব অভিযোগের কিছু বিষয় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) পর্যন্ত গড়িয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন>
শফিকুল ইসলামের সম্পদ নিয়েও অভিযোগ তুলেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁদের দাবি, রাজধানীর কল্যাণপুরের ১২ নম্বর বাড়ি, ২ নম্বর সড়ক, ১১ নম্বর ওয়ার্ডের ড্রিম হেভেন ভবনে তাঁর একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট রয়েছে। তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া ইসলামের নামে ঢাকা মেট্রো-গ-২৫-৬১৬৬ নম্বরের একটি গাড়ি থাকার কথাও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া তাঁর ভাই ও শ্বশুরবাড়ির স্বজনদের নামে দেশে-বিদেশে সম্পদ থাকার অভিযোগ উঠেছে। নিজের চলাচলে বিলাসবহুল গাড়ি ব্যবহার এবং একাধিক গোপন ব্যাংক হিসাব থাকার দাবিও করেছেন অভিযোগকারীরা।
সরকারি ওয়েবসাইটেও তথ্যের ঘাটতি>
ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের নামে পরিচালিত সরকারি ওয়েবসাইটে প্রয়োজনীয় দাপ্তরিক তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। ওয়েবসাইটে যোগদানের তারিখ হিসেবে ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৪ উল্লেখ থাকলেও কর্মকর্তাদের নাম, পদবি, দাপ্তরিক পরিচিতি ও মোবাইল নম্বরের মতো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দৃশ্যমান নয়। সেখানে একটি ই-মেইল ঠিকানা ও একটি টিঅ্যান্ডটি ফোন নম্বর দেওয়া রয়েছে।
সরকারি দপ্তরের ওয়েবসাইটে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের পরিচিতি, যোগাযোগের মাধ্যম, সেবার বিবরণ এবং অভিযোগ জানানোর পদ্ধতি প্রকাশ করা নাগরিকদের তথ্যপ্রাপ্তি ও জবাবদিহির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এসব তথ্যের ঘাটতি থাকলে সেবাগ্রহীতারা প্রয়োজনীয় দাপ্তরিক যোগাযোগ ও অভিযোগ দাখিলের ক্ষেত্রে সমস্যায় পড়তে পারেন।
ওয়েবসাইটের তথ্য হালনাগাদ না থাকার কারণ এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
বক্তব্য পাওয়া যায়নি>
শফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর বিষয়ে তাঁর বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। পাশাপাশি হোয়াটসঅ্যাপেও বার্তা পাঠানো হয়। তবে প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
