সিরিজের শেষ ম্যাচে অন্তত একটা জয় কিংবা লড়াই করার প্রত্যাশা ছিল বাংলাদেশের! কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে সেই আশার প্রতিফলন দেখা গেল না। ব্যাটিংয়ে শুরুতেই ধস, মাঝের দিকে শারমিন আক্তার ও স্বর্ণা আক্তারের প্রতিরোধ এবং শেষ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ার দুই ব্যাটারের অবিশ্বাস্য আগ্রাসন-সব মিলিয়ে ব্রিসবেনে বাংলাদেশের গল্পটা শেষ হলো বড় হারে।
১৭৩ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ১৬৪ বল হাতে রেখেই ৮ উইকেটের জয় তুলে নেয় অস্ট্রেলিয়া। তাতে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজে নিগার সুলতানার দলকে ৩-০ ব্যবধানে হোয়াইটওয়াশ করল স্বাগতিকরা!
অ্যালান বোর্ডার ফিল্ডে আজ টস হেরে ব্যাটিংয়ে নামার পর থেকেই বাংলাদেশের ব্যাটারদের পরীক্ষা নিতে শুরু করেন অস্ট্রেলীয় বোলাররা। সেই পরীক্ষায় শুরুতে কার্যত কেউই পাস করতে পারেননি। মাত্র ১৮ রানে তিন উইকেট হারিয়ে চরম বিপর্যয়ে পড়ে বাংলাদেশ। অধিনায়ক নিগার সুলতানা করেন মাত্র ৩ রান। আগের ম্যাচে সেঞ্চুরি করে আলোচনায় আসা সোবহানা মোস্তারিও এদিন নিজের ছায়া হয়ে থাকেন। ২৪ বল খেলে তার সংগ্রহ মাত্র ৯ রান।
বাংলাদেশের টপ অর্ডারকে ধসিয়ে দেওয়ার কাজটি একাই করেছেন মেগান শুট। প্রথম চার ব্যাটারকে ফিরিয়ে বাংলাদেশের ইনিংসের ভিতটাই নড়িয়ে দেন এই পেসার। ১০ ওভার বোলিং করে মাত্র ১৬ রান খরচ করেন তিনি। এর মধ্যে পাঁচ ওভারই ছিল মেডেন। এমন নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ের সামনে বাংলাদেশের ব্যাটারদের রান তোলার পথ ছিল প্রায় বন্ধ।
তবে একের পর এক উইকেট হারানোর মধ্যেও হাল ছাড়েননি শারমিন ও স্বর্ণা। দুজনের ব্যাটে আসে ইনিংসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জুটি। ৫৪ রান যোগ করে দলকে কিছুটা বিপর্যয় থেকে বের করে আনেন তারা। শারমিন ৯৩ বলে আটটি চারে ৫০ রান করে সাজঘরে ফেরেন। স্বর্ণা আরও কিছুক্ষণ লড়াই চালিয়ে যান। ৭১ বলে চারটি চারে ৫৪ রান করে ওয়ানডে ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ ইনিংসটি খেলেন তিনি।
তাদের বাইরে বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ে উল্লেখ করার মতো অবদান রাখতে পারেননি কেউ। রাবেয়া খান ও অভিষিক্ত দিশা বিশ্বাস করেন ১৩ রান করে। দিশা অপরাজিত থাকলেও অন্য প্রান্তে নিয়মিত বিরতিতে উইকেট পড়তে থাকে। ফলে ৫০ ওভার পূর্ণ করার আগেই ১৭২ রানে থেমে যায় বাংলাদেশের ইনিংস।
জবাবে অস্ট্রেলিয়ার শুরুটাও একেবারে নির্বিঘ্ন ছিল না। ১৩ রানে প্রথম উইকেট হারানোর পর ৩৮ রানে দ্বিতীয় উইকেট হারায় স্বাগতিকেরা। সুলতানা খাতুনের বলে জর্জিয়া ভল এবং দিশা বিশ্বাসের বলে বেথ মুনি সাজঘরে ফেরেন। কিন্তু এই দুই উইকেট পাওয়ার পর বাংলাদেশের বোলারদের জন্য ম্যাচে ফেরার আর কোনো সুযোগ তৈরি হয়নি।
কারণ ক্রিজে তখন ছিলেন এলিস পেরি ও অ্যানাবেল সাদারল্যান্ড। দুজন মিলে বাংলাদেশের বোলিং আক্রমণকে কার্যত নিষ্ক্রিয় করে দেন। তৃতীয় উইকেটে ১০৪ বলে ১৩৭ রানের অবিচ্ছিন্ন জুটি গড়ে জয় নিশ্চিত করেন তারা। পেরি ৬৪ বলে ৬৫ রান করে অপরাজিত থাকেন। তার ইনিংসে ছিল আটটি চার। অন্যদিকে সাদারল্যান্ডের ব্যাটিং ছিল আরও বেশি আক্রমণাত্মক। মাত্র ৫২ বলে ১২টি চার মেরে ৭৪ রান করেন তিনি। দুই ব্যাটারের এই ঝোড়ো জুটিতে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি চলে যায় অস্ট্রেলিয়ার হাতে।
১৬৪ বল বাকি থাকতেই ম্যাচ শেষ করে অস্ট্রেলিয়া বুঝিয়ে দিয়েছে, এই সিরিজে দুই দলের পারফরম্যান্সের ব্যবধান কতটা বড় ছিল। প্রথম দুই ওয়ানডে জিতে আগেই সিরিজ নিশ্চিত করেছিল স্বাগতিকেরা। শেষ ম্যাচে বাংলাদেশের সামনে ছিল অন্তত হোয়াইটওয়াশ এড়ানোর সুযোগ। কিন্তু ব্যাটিং ও বোলিং-দুই বিভাগেই পিছিয়ে থেকে সেই সুযোগও কাজে লাগাতে পারেনি দলটি।
ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সে অবশ্য সিরিজটি স্মরণীয় হয়ে থাকবে মেগান শুটের জন্য। শেষ ম্যাচে চার উইকেট নেওয়ার পাশাপাশি পুরো সিরিজে ১০ উইকেট শিকার করেছেন তিনি। মাত্র ২.৩৬ ইকোনমি রেটে বোলিং করে ম্যাচসেরা ও সিরিজসেরা-দুটি পুরস্কারই নিজের করে নিয়েছেন অস্ট্রেলীয় পেসার।
বাংলাদেশের জন্য এই সিরিজের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হয়তো স্বর্ণার ক্যারিয়ারসেরা ইনিংস এবং শারমিনের আরেকটি অর্ধশতক। কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে শুধু ব্যক্তিগত ঝলক দিয়ে ম্যাচ জেতা যায় না, প্রয়োজন সম্মিলিত পারফরম্যান্স। অস্ট্রেলিয়া সফরে সেই সম্মিলিত শক্তির অভাবই বারবার চোখে পড়েছে বাংলাদেশের খেলায়! তার পথ ধরেই অজিদের সঙ্গে প্রথম দ্বিপাক্ষিক সিরিজেই ধবলধোলাই হল টাইগ্রেসরা।
