যুক্তরাষ্ট্রে স্বাস্থ্যবীমা ও মেডিকেইড কর্মসূচিতে ভুয়া বিল জমা দিয়ে ছয়শ কোটি ডলারের বেশি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে দেশজুড়ে পাঁচ শতাধিক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গ্রেফতার ব্যক্তিদের মধ্যে ৯০ জন চিকিৎসক রয়েছেন। নিউ ইয়র্কে গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে কয়েকজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত চিকিৎসক ও রোগী পরিবহন প্রতিষ্ঠানের মালিকও রয়েছেন বলে জানিয়েছে দেশটির কর্তৃপক্ষ।
চিকিৎসাসেবা না দিয়েও ভুয়া বিল তৈরি এবং রোগী পরিবহনের মিথ্যা ভাউচার জমা দিয়ে এই বিপুল অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। নিউ ইয়র্ক স্টেটের অ্যাটর্নি জেনারেল লেটিশিয়া জেমস এবং যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাটর্নি কার্যালয় সম্প্রতি এসব তথ্য জানিয়েছে।
সর্বশেষ গত ২৮ সেপ্টেম্বর কুইন্সের দন্তচিকিৎসক সুলেমান নাসিমীকে (৪৬) মেডিকেইড কর্মসূচি থেকে তিন লাখ ডলার জালিয়াতির অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়। লং আইল্যান্ডের হিক্সভিলের বাসিন্দা নাসিমী কুইন্স ভিলেজের ইউটোপিয়া পার্কওয়েতে ‘টুথ ফ্রেশ মেডোজ’ নামে একটি দন্তচিকিৎসা কেন্দ্র পরিচালনা করতেন।
তদন্তে বলা হয়েছে, ২০২০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ৩১ আগস্ট পর্যন্ত দন্তচিকিৎসার নামে ভুয়া বিল জমা দিয়ে তিনি মেডিকেইড থেকে অর্থ নিয়েছেন। যেসব রোগীর নামে বিল জমা দেওয়া হয়েছিল, তাঁদের অনেকে ওই চিকিৎসা সম্পর্কে কিছুই জানতেন না বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর আগে রোগী পরিবহনের জন্য ১৬ লাখ ডলারের ভুয়া বিল জমা দেওয়ার অভিযোগে নিউ ইয়র্কের ক্লিফটন এলাকা থেকে দুই ভাই জাবেদ চৌধুরী (৪৪) ও জুনায়েদ চৌধুরীকে (৪৫) গ্রেফতার করে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআই।
নিউ ইয়র্ক স্টেটের কম্পট্রোলার থমাস পি ডিনাপোলি জানান, ‘এওয়ান রাইডস ইনকরপোরেটেড’, ‘এনওয়াই জেট ট্রান্সপোর্ট ইনকরপোরেটেড’ এবং ‘রাইড টু রিকভারি করপোরেশন’ নামের তিনটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে চলাচলে অক্ষম রোগীদের পরিবহনের ভুয়া বিল জমা দেওয়া হতো।
গ্রেফতারের পর ওই দুই ভাই দোষ স্বীকার করেছেন এবং আত্মসাৎ করা পুরো অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আগামী ৪ ডিসেম্বর তাঁদের বিরুদ্ধে রায় ঘোষণার কথা রয়েছে।
নিউ ইয়র্ক সিটির জ্যাকসন হাইটস, জ্যামাইকা ও ব্রুকলিন এলাকার অন্তত তিনজন বাংলাদেশি চিকিৎসকের লাইসেন্স এর আগে জালিয়াতির দায়ে বাতিল করা হয়েছে। তাঁদের মোটা অঙ্কের জরিমানাও করা হয়েছে। কোভিড-১৯ মহামারীর সময় রোগী না দেখেই বিমা কোম্পানির কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার অভিযোগেও অনেক চিকিৎসকের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে।
কীভাবে প্রতারণার শিকার হচ্ছেন রোগীরা: যুক্তরাষ্ট্রে স্বল্প ও মাঝারি আয়ের অনেক বাংলাদেশি অঙ্গরাজ্যের স্বাস্থ্য দপ্তরের মাধ্যমে স্বাস্থ্যবীমা বা মেডিকেইড সুবিধা পেয়ে থাকেন। বিমা কোম্পানিগুলো কয়েক সপ্তাহ পরপর গ্রাহকদের কাছে ‘ইওবি’ বা সুবিধার বিবরণী পাঠায়। এতে কোন চিকিৎসকের কাছে কবে চিকিৎসা নেওয়া হয়েছে এবং সেই চিকিৎসার জন্য কত অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে, তার বিস্তারিত উল্লেখ থাকে।
অনেক রোগী এই বিবরণী মনোযোগ দিয়ে পড়েন না। অসাধু চিকিৎসকেরা সেই সুযোগে রোগীর অজান্তেই চিকিৎসাসেবার বিল জমা দিয়ে অর্থ হাতিয়ে নিতে পারেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ ধরনের প্রতারণা ঠেকাতে রোগীদের বিমা কোম্পানির পাঠানো সুবিধার বিবরণী মনোযোগ দিয়ে পড়ার পরামর্শ দিয়েছে নিউ ইয়র্কের অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়। বিবরণীতে উল্লেখ করা কোনো চিকিৎসাসেবা না নিয়ে থাকলে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে জালিয়াতির অভিযোগ: যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাটর্নি কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির ৪৫টি অঙ্গরাজ্যে সংঘবদ্ধভাবে শত শত রোগীর নামে ভুয়া বিল জমা দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। মূলত কোভিড-১৯ মহামারী-পরবর্তী সময়ে মার্কিন করদাতাদের অর্থ আত্মসাতের এসব ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
তদন্তকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, স্বাস্থ্যবীমা থেকে আত্মসাৎ করা অর্থ দিয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা বিলাসবহুল বাড়ি ও দামি গাড়ি কিনেছেন।
নিউ ইয়র্ক স্টেটের অ্যাটর্নি জেনারেল লেটিশিয়া জেমস এবং স্টেট কম্পট্রোলার থমাস পি ডিনাপোলি সতর্ক করে বলেছেন, স্বাস্থ্যসেবা খাতকে ব্যবহার করে জালিয়াতি করলে কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। স্বাস্থ্যবীমা নিয়ে প্রতারণায় জড়িত চিকিৎসক বা ফার্মেসি সম্পর্কে তথ্য জানাতে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় ৮০০-৭৭১-৭৭৫৫ নম্বরে যোগাযোগ করার অনুরোধ জানিয়েছে। জরুরি প্রয়োজনে ৯১১ নম্বরে ফোন করেও অভিযোগ জানানো যাবে।
সানা/আপ্র/১১/১০/২০২৬
