এত দিনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে টেসলার উড়ন্ত গাড়ির ভিডিও দেখা হয়ে গেছে নিশ্চয়। ভিডিওতে দেখা যায়, একটি গাড়ি বাঁকা ইউ আকৃতির রাস্তায় চলছে। শূন্যে ডিগবাজি দিয়ে আবার মাটিতে নেমে আসছে। প্রথমে অনেকেই এআই ভিডিও ভেবে ভুল করেছে সেটাকে। তবে ভিডিওটি সত্যি। এটি বিশ্বের প্রথম ট্রিলিয়নিয়ার প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইলন মাস্কের নতুন গাড়ি।
১৫ অক্টোবর টেসলা তাদের ‘রোডস্টার’ নামের নতুন নকশার বৈদ্যুতিক স্পোর্টস কারটি সবার সামনে নিয়ে আসে। রকেটের থ্রাস্টারের সাহায্যে চালিত এই গাড়িটির উৎপাদন ২০২৮ সালে শুরু হবে বলে জানিয়েছে কোম্পানিটি।
তবে মজার ঘটনাটি ঘটেছে তিন দিন আগে। বিখ্যাত খেলনা গাড়ি প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ‘হট হুইলস’ তাদের ফেসবুকে একটি পোস্ট করে। সেখানে তারা টেসলার রোডস্টার যে ধরনের রাস্তায় স্টান্ট দেখিয়েছিল, ঠিক তেমনই একটি ট্র্যাকে সবুজ রঙের খেলনা গাড়ির ছবি শেয়ার করে। ছবির ক্যাপশনে তারা লেখে, ‘আমরা ১৯৬৮ সাল থেকে এটি করে আসছি।’ পাশাপাশি লেখে, ‘চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করা হলো।’ অর্থাৎ টেসলার প্রধান ইলন মাস্কের নতুন গাড়ি সম্প্রতি যা করে দেখাল, খেলনা গাড়ির মাধ্যমে হট হুইলস তা ৫৮ বছর আগেই করে দেখিয়েছে।
হট হুইলস কিন্তু এমনি এমনি এ পোস্টটি করেনি। এর পেছনে একটি ঐতিহাসিক কারণ রয়েছে। ১৯৬৮ সালে যাত্রা শুরুর পর থেকেই তারা কিছু কমলা রঙের বিশেষ ট্র্যাক বানিয়ে আসছে। এসব ট্র্যাকে তাদের তৈরি ছোট খেলনা গাড়িগুলো খাড়া ঢাল বেয়ে নেমে এসে পুরো ৩৬০ ডিগ্রি বৃত্তাকারে ঘুরতে পারে এবং উল্টো হয়ে ডিগবাজি খেতে পারে।

মূল অনুষ্ঠানের আগে ইলন মাস্ক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানিয়েছিলেন, টেসলার টেক্সাস সদর দপ্তরে তারা একটি বিশাল ও জটিল ডিগবাজি খাওয়ার ট্র্যাক তৈরি করেছেন। যেটা হট হুইলসের ট্র্যাকের চেয়েও অনেক বেশি রোমাঞ্চকর হবে। এই নতুন ট্র্যাকে রোডস্টার গাড়ির মালিকেরা গাড়ি চালিয়ে পরীক্ষা করে দেখার সুযোগ পাবেন।’
সেই আমলে খেলনা গাড়িতে এমন বিপজ্জনক ও রোমাঞ্চকর স্টান্ট দেখানো ছিল এক নতুন চিন্তা। তাই টেসলা যখন রকেটের থ্রাস্টার দিয়ে গাড়ি বাতাসে ওড়ানো কিংবা উল্টো চালানোর মতো স্টান্ট দেখাল, তখন হট হুইলস রসিকতা করে সবাইকে বিষয়টি মনে করিয়ে দিল। বাস্তবে একটি পুরো সত্যিকারের গাড়ি দিয়ে এই কাজ করা কঠিন হলেও খেলনা গাড়ি নিয়ে এই রোমাঞ্চের শুরুটা তারা প্রায় ছয় দশক আগেই করে ফেলেছিল।
তবে এর পেছনে হট হুইলসের মার্কেটিংয়ের এক চমৎকার বুদ্ধিও কাজ করেছে। বর্তমানে ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সবাই যখন টেসলার এই নতুন গাড়ি নিয়ে আলোচনা করছে, তখন হট হুইলসও নিজেদের প্রচার বাড়াতে ও এই ট্রেন্ডে অংশ হতে পোস্টটি করেছে।
পোস্টে দেখা যাওয়া গাড়িটি হট হুইলসের খুব জনপ্রিয় একটি মডেল, যার নাম ‘টুইন মিল’। উজ্জ্বল সবুজ রঙের এই মডেলটির বিশেষত্ব হলো, এর সামনের দিকে দুটি বড় ভি-এইট ইঞ্জিন খোলামেলা অবস্থায় বসানো থাকে। ছবিতে দেখা যায়, এই গাড়িটি হট হুইলসের চেনা সেই কমলা রঙের বৃত্তাকার ট্র্যাক বেয়ে সোজা ওপরের দিকে উঠে যাচ্ছে।

টেসলাকে হট হুইলসের এই খোঁচা দেওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই মজার মজার কমেন্ট করছেন। অনেক কার কালেক্টররা বলছেন, যাঁরা কমেন্টে অন্য কোনো খেলনা গাড়ির নাম বলছেন, তাঁরা আসল সংগ্রাহক না। আবার কেউ কেউ ‘ওয়েভ রিপার্স দেওরা টু’ বা ‘তেকু রিভার্ট’ গাড়ি ব্যবহার করলে আরও ভালো হতো বলে মত দিয়েছেন।
কমেন্টে অনেকেই হট হুইলসের ট্র্যাক নিয়ে নিজেদের শৈশবের স্মৃতিচারণা করেছেন। একজন মজা করে লিখেছেন, হট হুইলসের গাড়িগুলো কখনো লুপ বা বৃত্তের ওপর থেমে থাকে না। আরেকজন লিখেছেন, ছোটবেলায় কেউ হয়তো ইলন মাস্কের একটা হট হুইলস গাড়ি চুরি করেছিল, যার বদলা তিনি এখন টেসলা দিয়ে নিচ্ছেন।
অনুষ্ঠানে ইলন মাস্ক দাবি করেন, তাদের এই গাড়িটি হতে যাচ্ছে বিশ্বের প্রথম ‘উড়ন্ত গাড়ি’। আর এটি নিয়ে আরও একটি গাড়ি প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানও ভিডিও প্রকাশ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার গাড়ি নির্মাতা সংস্থা ‘আলেফ অ্যারোনটিকস’ দাবি করেছে, তারাই বিশ্বের প্রথম বৈদ্যুতিক উড়ন্ত গাড়ি তৈরি করেছে। ভিডিওতে তারা দেখিয়েছে, টেসলার সব গাড়ির ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে তাদের গাড়িটা। নির্মাতা সংস্থাটি তাদের এই নতুন মডেলের নাম দিয়েছে ‘আলেফ মডেল এ’। বিশেষ এই গাড়িটি সাধারণ রাস্তার পাশাপাশি আকাশে বিমান বা উড়োজাহাজের মতোও চলতে সক্ষম।
টেসলার প্রকৌশল বিভাগের সহসভাপতি লার্স মোরাভি জানান, রোডস্টারের নিচের অংশে একটি বাতাস টেনে নেওয়ার ব্যবস্থা (ফ্যান সাকশন সিস্টেম) রয়েছে। গাড়িটিকে উল্টো অবস্থায় ধরে রাখতে এটি শক্তি তৈরি করে। বাকি কাজের জন্য আমরা স্পেসএক্স থেকে কিছু প্রযুক্তি নিয়েছি। মূলত রোডস্টারে উচ্চতা নিয়ন্ত্রণের জন্য থ্রাস্টার এবং পেছনের দিকে মূল থ্রাস্টার রয়েছে। এর ফলে এটি অনেকটা রকেটের মতোই উড়তে পারে।
ইলনের গাড়িতে যেসব প্রযুক্তি আছে তা একসঙ্গে একটি গাড়িতে এই প্রথম। স্পেসএক্সের প্রযুক্তি ব্যবহার করার ফলে গাড়িটি মূলত রকেটের মতোই আকাশে উড়তে পারবে।