প্রতি বছর ১৭ অক্টোবর বিশ্বব্যাপী পালিত হয় আন্তর্জাতিক দারিদ্র্য দূরীকরণ দিবস। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও নেতারা দারিদ্র্য দূর করার অঙ্গীকার করেন। সভা হয়, আলোচনা হয়, নতুন প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। কিন্তু বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের জীবন থেকে দারিদ্র্য, ক্ষুধা ও অসহায়ত্ব দূর হয়নি। তাই বিবেকের কাছে একটি কঠিন প্রশ্ন জাগে—দারিদ্র্য দূরীকরণের নামে প্রতিবছর এত আয়োজন, এত ঘোষণা ও এত প্রতিশ্রুতি কি মানব ইতিহাসের অন্যতম বড় নৈতিক বৈপরীত্যে পরিণত হয়নি?
আবেগ দিয়ে নয়, বাস্তব তথ্য ও মানবিক বিবেক দিয়ে এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা প্রয়োজন।
২০০০ সালে জাতিসংঘের সদস্যদেশগুলো সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা গ্রহণ করে। এর অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য ছিল চরম দারিদ্র্য কমিয়ে আনা। পরে ২০১৫ সালে বিশ্বনেতারা ২০৩০ সালের মধ্যে সর্বত্র সব ধরনের দারিদ্র্য দূর করার লক্ষ্য নিয়ে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজি গ্রহণ করেন। এর প্রথম লক্ষ্যই হলো দারিদ্র্যমুক্ত পৃথিবী গড়ে তোলা। এটি ছিল মানবজাতির একটি ঐতিহাসিক অঙ্গীকার—পৃথিবীর কোনো মানুষ যেন দারিদ্র্যের কারণে মানবিক মর্যাদা থেকে বঞ্চিত না হন।
কিন্তু দীর্ঘ এই পথচলায় আমরা কতটা এগিয়েছি?
বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, গত কয়েক দশকে পৃথিবীতে চরম দারিদ্র্যের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ১৯৯০ সালে বিশ্ব জনসংখ্যার প্রায় ৩৮ শতাংশ মানুষ চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করতেন। তখন তাঁদের সংখ্যা ছিল প্রায় ২০০ কোটি। এই দারিদ্র্য কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের উন্নয়ন কার্যক্রম, কর্মসংস্থান ও সামাজিক উদ্যোগের অবদান অস্বীকার করার উপায় নেই।
কিন্তু অগ্রগতির এই সাফল্যের পাশাপাশি বর্তমান বাস্তবতাও আমাদের গভীরভাবে ভাবিয়ে তোলে।
জাতিসংঘের সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোলস রিপোর্ট ২০২৫ অনুযায়ী, ২০২৫ সালে পৃথিবীর আনুমানিক ৮০ কোটি ৮ লাখ মানুষ চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করবেন বলে হিসাব করা হয়েছিল। অর্থাৎ পৃথিবীর প্রতি দশজন মানুষের প্রায় একজনের দৈনিক আয় চরম দারিদ্র্যের সীমার নিচে। বিশ্বব্যাংক ২০২৫ সালের জুন মাসে আন্তর্জাতিক চরম দারিদ্র্যের সীমা সংশোধন করে দৈনিক মাথাপিছু ৩ মার্কিন ডলার নির্ধারণ করে, যা ২০২১ সালের ক্রয়ক্ষমতার ভিত্তিতে হিসাব করা হয়েছে। নতুন হিসাবপদ্ধতির কারণে আগের বছরের সব পরিসংখ্যানের সঙ্গে এই সংখ্যার সরাসরি তুলনা করা যায় না। তবু কোটি কোটি মানুষের দারিদ্র্যের বাস্তবতা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়—আমাদের অঙ্গীকার ও অর্জনের মধ্যে এখনো কত বড় ব্যবধান রয়ে গেছে।
বিশ্বব্যাংকের ২০২৪ সালের দারিদ্র্য, সমৃদ্ধি ও পৃথিবী শীর্ষক প্রতিবেদনেও দারিদ্র্য দূরীকরণের অগ্রগতি প্রায় থমকে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছিল। সে সময়কার দৈনিক ২.১৫ ডলারের আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যসীমা অনুযায়ী প্রায় ৭০ কোটি মানুষ চরম দারিদ্র্যে ছিলেন। আর দৈনিক ৬.৮৫ ডলারের উচ্চতর দারিদ্র্যসীমা অনুযায়ী প্রায় ৩৫০ কোটি মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে জীবন কাটাচ্ছিলেন। প্রতিবেদনটি সতর্ক করে দিয়েছিল, বর্তমান গতিতে চললে উচ্চতর এই দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী মানুষদের দারিদ্র্য দূর করতে এক শতাব্দীরও বেশি সময় লাগতে পারে।
এই পরিসংখ্যানের পেছনে রয়েছে অসংখ্য মানুষের নীরব কান্না, অপূর্ণ স্বপ্ন ও প্রতিদিনের সংগ্রাম।
একবার ভাবুন সেই মায়ের কথা, যিনি নিজের ক্ষুধা লুকিয়ে সন্তানের মুখে শেষ খাবারটুকু তুলে দেন। ভাবুন সেই বাবার কথা, যিনি সারাদিন পরিশ্রম করেও পরিবারের জন্য পর্যাপ্ত খাবার কিনতে পারেন না। ভাবুন সেই শিশুটির কথা, যে বই হাতে বিদ্যালয়ে যাওয়ার পরিবর্তে ক্ষুধার তাড়নায় কাজে যেতে বাধ্য হয়। ভাবুন সেই অসুস্থ বৃদ্ধের কথা, যিনি অর্থের অভাবে চিকিৎসা না করিয়ে নীরবে যন্ত্রণা সহ্য করেন। তাঁদের কাছে দারিদ্র্য কোনো পরিসংখ্যান নয়। দারিদ্র্য তাঁদের প্রতিদিনের বাস্তবতা, তাঁদের অপমান, তাঁদের অসহায়ত্ব এবং অনেক সময় তাঁদের বেঁচে থাকার অনিশ্চয়তা।
দারিদ্র্য শুধু অর্থের অভাব নয়। এটি মানুষের সম্ভাবনা বিকাশের সুযোগ হারানো, শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হওয়া, চিকিৎসা না পাওয়া এবং সমাজে নিজের প্রাপ্য সম্মানটুকু নিয়ে বেঁচে থাকতে না পারার নাম। একজন দরিদ্র মানুষও স্বপ্ন দেখেন, ভালোবাসেন, সন্তানকে ঘিরে আশা করেন এবং সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে চান। তাঁর দারিদ্র্য তাঁর মানবিক মর্যাদা কমিয়ে দিতে পারে না।
জাতিসংঘের ২০২৫ সালের মূল্যায়নে আরও দেখা যায়, পৃথিবীর প্রায় ৩৮০ কোটি মানুষ কোনো ধরনের সামাজিক সুরক্ষা সুবিধার আওতায় নেই। এর অর্থ, অসুস্থতা, বেকারত্ব, বার্ধক্য কিংবা জীবনের আকস্মিক বিপর্যয়ে বিপুলসংখ্যক মানুষকে নিজেদের সীমিত সামর্থ্যের ওপর নির্ভর করেই টিকে থাকতে হয়।
ক্ষুধার চিত্রও আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থাসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার বিশ্বের খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টির অবস্থা ২০২৫ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে প্রায় ৬৭ কোটি ৩০ লাখ মানুষ ক্ষুধার শিকার হয়েছেন। আগের দুই বছরের তুলনায় বিশ্বব্যাপী ক্ষুধার হার কিছুটা কমলেও আফ্রিকা ও পশ্চিম এশিয়ার বহু অঞ্চলে পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে।
এই বাস্তবতা আমাদের সামনে এক বেদনাদায়ক বৈপরীত্য তুলে ধরে। একদিকে মানুষ মহাকাশে অভিযান চালাচ্ছে, চিকিৎসাবিজ্ঞানে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে জ্ঞানের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে এবং বিপুল সম্পদ সৃষ্টি করছে। অন্যদিকে, পৃথিবীর এত মানুষের কাছে এখনো পর্যাপ্ত খাবার, নিরাপদ বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
তাহলে প্রশ্ন জাগে—আমাদের সভ্যতার প্রকৃত অগ্রগতি কোথায়?
আমরা কি শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বড় বড় স্থাপনা, প্রযুক্তির বিস্ময় কিংবা ধনীদের সম্পদের পরিমাণ দিয়ে উন্নয়ন বিচার করব? নাকি দেখব, এই উন্নয়নের সুফল একজন দরিদ্র শ্রমিক, একজন অসহায় মা, একজন বঞ্চিত শিশু কিংবা একজন নিঃসঙ্গ বৃদ্ধের জীবনেও কতটা পৌঁছেছে?
অবশ্যই দারিদ্র্য দূর করা সহজ কাজ নয়। যুদ্ধ, দুর্নীতি, জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বেকারত্ব, অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং সুযোগের অসম বণ্টন এই সমস্যাকে আরও জটিল করে তোলে। দারিদ্র্য কমাতে বিভিন্ন দেশের সরকার, আন্তর্জাতিক সংস্থা, মানবিক সংগঠন ও অসংখ্য সাধারণ মানুষ আন্তরিকভাবে কাজ করছেন। তাঁদের অবদানকে অস্বীকার করা অন্যায় হবে।
তাহলে মানব ইতিহাসের এই নৈতিক বৈপরীত্য কোথায়?
বৈপরীত্যটি দারিদ্র্য দূরীকরণ দিবস পালনের মধ্যে নয়; বরং বছরের পর বছর প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পরও সেই প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী যথেষ্ট কার্যকর পদক্ষেপ নিতে না পারার মধ্যে।
যখন রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্য বাস্তব পরিবর্তনে রূপ নেয় না, যখন অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুফল সমাজের সবচেয়ে দরিদ্র মানুষের কাছে পৌঁছায় না, যখন দুর্নীতি মানুষের প্রাপ্য সুযোগ কেড়ে নেয় এবং যখন অসহায় মানুষের দুর্দশা নিয়ে এক দিনের আলোচনা বাকি বছরের দায়িত্ববোধকে আড়াল করে দেয়—তখনই আমাদের অঙ্গীকার প্রশ্নের মুখে পড়ে।
দারিদ্র্য দূরীকরণ শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়; এটি সমগ্র মানবসমাজের নৈতিক দায়িত্ব। সরকারকে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মানসম্মত শিক্ষা, সাশ্রয়ী চিকিৎসা ও কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। ব্যবসায়ী ও সম্পদশালী মানুষকে সমাজের প্রতি দায়িত্বশীল হতে হবে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে সবচেয়ে অসহায় দেশ ও জনগোষ্ঠীর পাশে দাঁড়াতে হবে। আর আমাদের প্রত্যেককে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী অন্য মানুষের দুঃখ লাঘবে এগিয়ে আসতে হবে।
বিশেষ করে আমাদের মনে রাখতে হবে, দারিদ্র্য দূর করার অর্থ শুধু কাউকে কিছু অর্থ বা খাবার দিয়ে সাময়িকভাবে সাহায্য করা নয়। এর অর্থ এমন একটি সমাজ গড়ে তোলা, যেখানে মানুষ নিজের শ্রম, মেধা ও যোগ্যতা দিয়ে সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার সুযোগ পায়। যেখানে একটি শিশুর ভবিষ্যৎ তার বাবা-মায়ের দারিদ্র্যের কারণে অন্ধকার হয়ে যায় না। যেখানে একজন বৃদ্ধকে জীবনের শেষ প্রান্তে এসে অন্যের করুণার ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকতে হয় না।
২০৩০ সালের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার সময়সীমা যত এগিয়ে আসছে, ততই আমাদের নিজেদের অঙ্গীকার নতুন করে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। মানবসভ্যতার সাফল্য শুধু কত সম্পদ সৃষ্টি হলো, কত প্রযুক্তি আবিষ্কৃত হলো কিংবা কত দেশ অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হলো, তা দিয়ে বিচার করা যায় না। প্রকৃত সাফল্য হলো—এই পৃথিবীতে একজন সাধারণ মানুষও যেন ক্ষুধা, অবহেলা ও অপমানের শিকার না হয়ে মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার সুযোগ পান।
আসুন, আমরা একবার নিজেদের বিবেকের সামনে দাঁড়াই।
পৃথিবীতে যখন এত জ্ঞান, সম্পদ ও প্রযুক্তিগত সামর্থ্য রয়েছে, তখন কেন এত মানুষ এখনো মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে পারেন না? কেন একটি শিশু ক্ষুধা নিয়ে ঘুমাতে যায়, অথচ অন্য কোথাও বিপুল পরিমাণ খাবার অপচয় হয়? কেন একজন মানুষ অর্থের অভাবে চিকিৎসা পান না, অথচ মানবসভ্যতা চিকিৎসাবিজ্ঞানে এত উন্নতি করেছে? কেন দারিদ্র্য দূরীকরণের প্রতিশ্রুতি বারবার উচ্চারিত হয়, অথচ কোটি কোটি মানুষের জীবনে সেই প্রতিশ্রুতির আলো পৌঁছায় না?
হয়তো ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের বিচার করবে না আমরা কতগুলো আন্তর্জাতিক দিবস পালন করেছি, কতগুলো ঘোষণা দিয়েছি কিংবা কত সুন্দর বক্তৃতা করেছি তা দিয়ে। তারা বিচার করবে, পৃথিবীর মানুষের দুঃখ-কষ্ট কমাতে আমরা আসলে কী করেছি।
দারিদ্র্য দূরীকরণ যেন কেবল একটি দিনের আনুষ্ঠানিকতা না হয়; এটি হোক প্রতিদিনের মানবিক অঙ্গীকার।
কারণ, যে সভ্যতা বিপুল সম্পদ সৃষ্টি করতে পারে, কিন্তু ক্ষুধার্ত মানুষের মুখে খাবার তুলে দিতে ব্যর্থ হয়; যে পৃথিবী উন্নতির শিখরে পৌঁছানোর স্বপ্ন দেখে, কিন্তু তার অসহায় সন্তানদের পেছনে ফেলে রাখে—সেই সভ্যতার অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন তোলা আমাদের নৈতিক অধিকার।
মানবতার প্রকৃত বিজয় তখনই আসবে, যখন পৃথিবীর কোনো মানুষ দারিদ্র্যের কারণে নিজের মর্যাদা, স্বপ্ন কিংবা বেঁচে থাকার ন্যূনতম অধিকার হারাবেন না।
সেই দিনই দারিদ্র্য দূরীকরণ দিবসের প্রকৃত সার্থকতা অর্জিত হবে। তার আগে পর্যন্ত এই দিবস আমাদের কাছে শুধু উদ্যাপনের উপলক্ষ নয়—এটি হবে আমাদের বিবেকের কাছে একটি অসমাপ্ত প্রতিশ্রুতির স্মারক।
##. তথ্যসূত্র: বিশ্বব্যাংকের ২০২৪ সালের Poverty, Prosperity, and Planet প্রতিবেদন; জাতিসংঘের Sustainable Development Goals Report 2025; এবং জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থাসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর State of Food Security and Nutrition in the World 2025 প্রতিবেদন।
লেখক: প্রকৌশলী ও কলামিস্ট
