ছবির ক্যাপশন: .
মো: মনজুর আলম (মঞ্জু) চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা প্রতিনিধি:
দক্ষিণ চট্টগ্রাম: ক্যালেন্ডারের পাতায় পৌষের মাঝামাঝি। হিমেল হাওয়ার সাথে ঘন কুয়াশার চাদরে ঢাকা পড়েছে দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ জনপদ। সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, পটিয়া, চন্দনাইশ ও বাঁশখালীসহ পুরো দক্ষিণ চট্টগ্রামে শুরু হয়েছে হাড়কাঁপানো শীতের মরণকামড়। তীব্র এই শৈত্যপ্রবাহে থমকে গেছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। একদিকে কনকনে ঠান্ডায় বাড়ছে রোগবালাই, অন্যদিকে মহাসড়কে কুয়াশার রাজত্বে ব্যাহত হচ্ছে যান চলাচল।
মহাসড়কে কুয়াশার দাপট: হেডলাইট জ্বালিয়ে চলছে যানবাহন: চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের পটিয়া থেকে লোহাগাড়া পর্যন্ত শনিবার ভোরে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য চোখে পড়ে। সকাল গড়িয়ে দুপুর হলেও সরছে না কুয়াশার পুরু পর্দা। দৃষ্টিসীমা ১০ থেকে ১৫ মিটারের নিচে নেমে আসায় দূরপাল্লার বাস ও ট্রাকগুলোকে হেডলাইট জ্বালিয়ে অত্যন্ত ধীরগতিতে চলাচল করতে দেখা গেছে। দোহাজারী মৌলভীর দোকান থেকে কেরানিহাট এবং লোহাগাড়ার পদুয়া ও চুনতী এলাকায় সকাল ৯টা পর্যন্ত এই অবস্থা বিরাজমান ছিল।
পটিয়া ও দোহাজারী হাইওয়ে পুলিশ জানিয়েছে, ঘন কুয়াশার কারণে বিভিন্ন স্থানে ছোটখাটো দুর্ঘটনা ঘটছে। দুর্ঘটনা এড়াতে চালকদের ফগ লাইট ব্যবহার ও গতি সীমিত রাখার কঠোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বিপর্যস্ত জনজীবন, বিপাকে খেটে খাওয়া মানুষ:
তীব্র শীতের কারণে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন খেটে খাওয়া দিনমজুর ও রিকশাচালকরা। কেরানিহাটের এক রিকশাচালক জানান, ভারী কুয়াশা আর ঠাণ্ডা বাতাসে হাত-পা জমে যাওয়ার উপক্রম হচ্ছে, ফলে রিকশা চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে। লোহাগাড়ার পদুয়া বাজারে কাজের সন্ধানে আসা এক দিনমজুর আক্ষেপ করে বলেন, "শীতের কারণে কেউ কাজে ডাকছে না। ভোরে কুয়াশার জন্য ঘর থেকে বের হওয়া কঠিন, কিন্তু কাজ না করলে পরিবার না খেয়ে থাকবে।"
বিশেষ করে সাতকানিয়ার শঙ্খ নদীর তীরবর্তী চর এলাকা এবং লোহাগাড়ার দুর্গম পাহাড়ি এলাকার মানুষগুলো শীতবস্ত্রের অভাবে চরম অসহায় অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন।
হাসপাতালে বাড়ছে রোগীর ভিড়:
শীতের তীব্রতা বাড়ার সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ঠান্ডাজনিত রোগ। সাতকানিয়া ও লোহাগাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের তথ্যমতে, গত ২৪ ঘণ্টায় শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। চিকিৎসকরা বলছেন, এই প্রবল ঠান্ডায় বিশেষ করে নবজাতক, শিশু ও বয়স্করা বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া তাদের বাড়ির বাইরে না নেওয়া এবং শিশুদের বাড়তি যত্ন নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
কৃষিতে কুয়াশার প্রভাব ও দুশ্চিন্তা:
নদী ও পাহাড়বেষ্টিত এলাকার কৃষকরা শীত ও কুয়াশা নিয়ে চরম উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন। ঘন কুয়াশার কারণে শীতকালীন সবজি, আলু ও টমেটোতে পচন ধরার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। কনকনে ঠান্ডায় মাঠে কাজ করা দুষ্কর হয়ে পড়ায় সার ও সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। কৃষি বিভাগ থেকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হলেও প্রকৃতির এই বিরূপ আচরণের সামনে কৃষকরা দিশেহারা।
নেই পর্যাপ্ত ত্রাণ সহায়তা:
উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন স্থানে শীতবস্ত্র বিতরণ শুরু হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। দুর্গম এলাকার শীতার্ত মানুষরা সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে আরও ব্যাপক ত্রাণ সহায়তার দাবি জানিয়েছেন।
আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী কয়েক দিন শীতের এই তীব্রতা আরও বাড়তে পারে এবং কুয়াশাচ্ছন্ন পরিস্থিতি অব্যাহত থাকতে পারে।
