রাজধানীর বাড্ডায় ভাড়া বাসা থেকে মেহেরিন আক্তার মীম (২৫) নামে এক গৃহবধূর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধারের ঘটনায় রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) রাত ১০টা ১৫ মিনিটের দিকে পুলিশ ওই বাসা থেকে তার লাশ উদ্ধার করে। পরে আইনি প্রক্রিয়া শেষে বুধবার দুপুরে ময়নাতদন্তের জন্য লাশটি ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।
নিহতের পরিবারের অভিযোগ, মেহেরিনকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। অন্যদিকে, নিহতের স্বামী আব্দুল্লাহ আল রাব্বির বরাত দিয়ে পুলিশ জানিয়েছে, দুই পরিবারের বিরোধের জেরে মেহেরিন আত্মহত্যা করেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। ঘটনার তদন্তের স্বার্থে তার স্বামীকে আটক রাখা হয়েছে।
তবে নিহতের মা ও মামার দাবি, মেয়ের মৃত্যুর খবর দেওয়ার পর থেকে স্বামীর সঙ্গে আর যোগাযোগ করতে পারেননি তারা। এ ছাড়া স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির অন্য কাউকে ঘটনাস্থলে কিংবা লাশের কাছে না পাওয়ায় তাদের সন্দেহ আরও বেড়েছে। তারা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত রহস্য উদঘাটন ও জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন। বর্তমানে মেহেরিনের লাশ ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
নিহত মেহেরিন বাড্ডা থানা এলাকার ডিআইটি প্রজেক্টের ১৫ নম্বর রোডের একটি বাসায় স্বামীর সঙ্গে ভাড়া থাকতেন। তার গ্রামের বাড়ি ঢাকা জেলার নবাবগঞ্জ উপজেলার পালবাড়ি ঘাট এলাকায়। তিনি ওই এলাকার মৃত আমিনুল ভূঁইয়ার মেয়ে।
নিহতের মা লিমা ভূঁইয়া বলেন, মেহেরিনের জন্মের পরপরই তার স্বামী মারা যান। এরপর চাকরি করে অনেক কষ্টে ছেলে-মেয়েকে বড় করেছেন তিনি। তার এক ছেলে ও এক মেয়ে। পরে মেয়েকে বিয়ে দেন। লিমা আগে মিটফোর্ড মেডিলাইফ হাসপাতালে চাকরি করতেন। বর্তমানে তিনি গৃহিণী।
লিমা ভূঁইয়া বলেন, মঙ্গলবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে মেয়ের স্বামী তাকে ফোন করেন। সালাম দিয়ে তিনি জানান, মেহেরিন মারা গেছেন। এরপর থেকে মেয়ের জামাইয়ের সঙ্গে আর যোগাযোগ করতে পারেননি তিনি। মেয়ের মৃত্যুর খবর পেয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। পরে থানা থেকে ফোন করে তাকে জানানো হয়, তার মেয়ে হয়তো আত্মহত্যা করেছেন।
লিমা ভূঁইয়ার অভিযোগ, মেয়ের মৃত্যুর পর তার স্বামী, শাশুড়ি কিংবা শ্বশুরবাড়ির অন্য কোনো আত্মীয়-স্বজনকে সেখানে দেখতে পাননি। মৃত্যুর খবর দেওয়ার পর মেয়ের জামাইয়ের আর যোগাযোগ না করা এবং শ্বশুরবাড়ির কারও উপস্থিতি না থাকায় তার মনে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, আমার মনে হয়, এটি আত্মহত্যা নয়, হত্যা করা হয়েছে পরিকল্পিতভাবে।
নিহতের মা প্রশ্ন তুলে বলেন, মেয়ের মৃত্যুর পরও জামাইসহ শ্বশুরবাড়ির লোকজন কেন আসেননি? তারা কেন মরদেহ দেখতে আসেননি? তার সন্দেহ, মেয়ের স্বামীই মেহেরিনকে হত্যা করে থাকতে পারেন। এ ঘটনায় প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনে সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তিনি।
পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মেহেরিন যমুনা ফিউচার পার্কের ট্রাভেলস এজেন্সিতে চাকরি করতেন। তিন বছর আগে তাদের বিয়ে হয়। বিয়ের পর এক বছর সংসার করার পর মেহেরিনের গর্ভে থাকা সন্তান নষ্ট হয়ে যায়। এরপর তার স্বামী জাপানে চলে যান। স্বামী বিদেশে চলে যাওয়ার পর থেকে মেহেরিন মায়ের কাছে থাকতেন। প্রায় তিন মাস আগে তার স্বামী দেশে ফেরেন। পরে রংপুরে গ্রামের বাড়িতে হেলিকপ্টার ভাড়া করে স্ত্রীকে নিয়ে যান এবং সেখানে রিসিপশনের আয়োজন করেন। এরপর প্রায় এক মাস আগে বাড্ডার ওই বাসা ভাড়া নিয়ে স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে থাকতে শুরু করেন।
নিহতের মামা আনোয়ার হোসেন জানান, বুধবার সকালে ফজরের নামাজের পর তার বোন ফোন করে মেহেরিনের আত্মহত্যার খবর দেন। খবর পেয়ে তিনি সেখানে যান। এরপর থেকেই তার মনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
আনোয়ার হোসেন বলেন, মামা হিসেবে তার প্রশ্ন, মেহেরিনের মৃত্যুর পরও তার স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়-স্বজন কেন তাদের সঙ্গে দেখা করেননি? কেন তারা লাশ দেখতে আসেননি? বিষয়টি তার কাছে অত্যন্ত সন্দেহজনক মনে হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, তারা থানা-পুলিশের কাছে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। মেহেরিনের মৃত্যু আত্মহত্যা হয়ে থাকলেও এর প্রকৃত কারণ উদঘাটন করতে হবে। আর তাকে হত্যা করা হয়ে থাকলে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনতে হবে।
এ বিষয়ে বাড্ডা থানার এসআই আনোয়ারা আক্তার যুগান্তরকে বলেন, মঙ্গলবার রাতে ৯৯৯-এ ফোন পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশ উদ্ধার করে। নিহতের স্বামী আব্দুল্লাহ আল রাব্বির বরাত দিয়ে তিনি জানান, মাত্র তিন মাস আগে তাদের বিয়ে হয়েছিল। বিয়েটি নিহতের নিজের পরিবার ও শ্বশুরবাড়ির লোকজন প্রথম থেকেই মেনে নিতে পারেননি। এ নিয়ে দুই পরিবারের মধ্যে বিরোধ চলছিল। সেই বিরোধের জেরেই মেহেরিন আত্মহত্যা করেছেন বলে তার স্বামী জানিয়েছেন।
এসআই আনোয়ারা আক্তার আরও বলেন, মৃত্যুর কিছুক্ষণ আগেও মেহেরিন তার মায়ের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা বলেছিলেন বলে তার স্বামী জানিয়েছেন। তবে ঘটনার তদন্তের স্বার্থে নিহতের স্বামীকে আটক রাখা হয়েছে। দুই পক্ষের বক্তব্য নেওয়া এবং তদন্ত শেষে এটি আত্মহত্যা নাকি হত্যা, তা স্পষ্টভাবে জানা যাবে।
পুলিশের এই কর্মকর্তা জানান, মেহেরিনের লাশ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্তের শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর মৃত্যুর সঠিক কারণ জানা যাবে। এ ঘটনায় প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।