ঢাকা–সিলেট মহাসড়ক ছয় লেনে উন্নীত করার দীর্ঘ প্রতীক্ষিত প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নিতে নতুন করে তৎপরতা শুরু করেছে সরকার। তবে প্রকল্পের বিভিন্ন অংশে কাজের গতি এক রকম নয়। কোথাও নির্মাণকাজ এগোলেও কোথাও ভূমি অধিগ্রহণ, ইউটিলিটি লাইন স্থানান্তর ও অন্যান্য জটিলতায় প্রত্যাশিত অগ্রগতি অর্জন করা সম্ভব হয়নি। ফলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা নিয়ে আগের অনিশ্চয়তার পাশাপাশি এখন নতুন সময়সীমা বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ সামনে এসেছে।
সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম গত ১৯ সেপ্টেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর উপজেলার শশই এলাকায় প্রকল্পের নির্মাণকাজ পরিদর্শন শেষে জানান, ২০২৯ সালের জুনের মধ্যে ঢাকা–সিলেট মহাসড়ক ছয় লেনে উন্নীত করে যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করার লক্ষ্য নিয়ে সরকার কাজ করছে। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণের অগ্রগতি তখন প্রায় ৫৬ শতাংশে পৌঁছেছিল। আগামী দুই মাসের মধ্যে শতভাগ ভূমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন করার আশাও প্রকাশ করেন তিনি।
কতটুকু কাজ এগিয়েছে?
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের অধীনে বাস্তবায়নাধীন ‘সাসেক ঢাকা–সিলেট করিডোর সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প’ ২০২১ সালে শুরু হয়। প্রকল্পের মূল আওতায় নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুর থেকে সিলেট পর্যন্ত প্রায় ২০৯ দশমিক ৩২৮ কিলোমিটার মহাসড়ক উন্নয়ন, চার লেনের মূল সড়কের পাশাপাশি সার্ভিস লেন, সেতু, কালভার্ট ও ফ্লাইওভার নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) সমীক্ষার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত প্রকল্পটির সামগ্রিক ভৌত অগ্রগতি ছিল ২১ শতাংশ। ওই সময় মূল সড়কের কাজের অগ্রগতি ছিল ১১ দশমিক ৫০ শতাংশ, সার্ভিস লেনের ১৬ দশমিক ৩৩ শতাংশ, সেতুর ৩১ দশমিক ১৪ শতাংশ এবং কালভার্টের ৫৮ দশমিক ৭৯ শতাংশ।
অন্যদিকে, গত ৯ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে দেওয়া বক্তব্যে সড়কমন্ত্রী জানান, আগের ছয় মাসে প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি প্রায় ১৩ শতাংশ থেকে ৩৮ শতাংশের বেশি হয়েছে। এ ছাড়া ১৯ সেপ্টেম্বর তিনি জানান, প্রকল্পের ১৩টি প্যাকেজের মধ্যে আটটির কাজ সন্তোষজনকভাবে এগোলেও পাঁচটি প্যাকেজের অগ্রগতি এখনো প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
তবে এপ্রিলের ২১ শতাংশ এবং সেপ্টেম্বরে মন্ত্রীর উল্লেখ করা ৩৮ শতাংশের বেশি অগ্রগতির হিসাব দুটি ভিন্ন সময়ের। ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত প্রকল্পের সর্বশেষ সমন্বিত সরকারি অগ্রগতি প্রতিবেদন স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তাই এই মুহূর্তে মোট কাজের সুনির্দিষ্ট হালনাগাদ শতাংশ নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
কেন পিছিয়ে পড়েছে প্রকল্প?
প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতির পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। এর মধ্যে ভূমি অধিগ্রহণ, গ্যাস-বিদ্যুৎ ও অন্যান্য ইউটিলিটি লাইন স্থানান্তর, নকশা সংশোধন, মাটির অবস্থা এবং ঠিকাদারি কাজের ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত জটিলতা উল্লেখযোগ্য।
আইএমইডির সমীক্ষায় ভূমি অধিগ্রহণ ও ইউটিলিটি লাইন স্থানান্তরকে বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে এসব জটিলতা থাকায় অনেক স্থানে নির্মাণকাজ প্রত্যাশিত গতিতে এগোয়নি। পাশাপাশি প্রকল্পের বিভিন্ন প্যাকেজে কাজের অগ্রগতির পার্থক্য সামগ্রিক বাস্তবায়নেও প্রভাব ফেলছে।
সড়কজুড়ে জনদুর্ভোগ, বাড়ছে প্রত্যাশা
ঢাকা–সিলেট মহাসড়ক দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীর যোগাযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। প্রতিদিন যাত্রীবাহী বাস, পণ্যবাহী ট্রাক, ব্যক্তিগত গাড়ি ও বিভিন্ন ধরনের যানবাহন এই পথে চলাচল করে। সিলেটের পর্যটন, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প এবং প্রবাসী আয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যাতায়াতের ক্ষেত্রেও সড়কটির গুরুত্ব অপরিসীম।
নির্মাণকাজ চলমান থাকায় মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে সাময়িক ভোগান্তি ও যান চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে যেসব স্থানে নির্মাণকাজ, সড়ক মেরামত কিংবা যান চলাচলের সংকীর্ণতা রয়েছে, সেখানে যাত্রীদের দুর্ভোগ কমাতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
প্রকল্পটি সম্পন্ন হলে উন্নত সড়ক যোগাযোগ, নিরাপদ যাতায়াত এবং আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের সুযোগ বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে এসব সুফল পেতে হলে শুধু নির্মাণকাজ এগিয়ে নিলেই হবে না; সড়কের গুণগত মান, সঠিক নকশা, নিরাপত্তা এবং কার্যকর তদারকিও নিশ্চিত করতে হবে।
২০২৯ সালের লক্ষ্য কতটা বাস্তবসম্মত?
সরকারের নতুন লক্ষ্য অনুযায়ী, ২০২৯ সালের জুনের মধ্যে মহাসড়কটি ছয় লেনে উন্নীত করে যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করার কথা। কিন্তু প্রকল্পের অবশিষ্ট কাজ, ভূমি অধিগ্রহণ, ইউটিলিটি স্থানান্তর এবং পিছিয়ে থাকা পাঁচটি প্যাকেজের অগ্রগতি বিবেচনায় এই সময়সীমা বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত বা প্রকল্প কর্মকর্তাদের নতুন সময়ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা যাচাই করা না থাকায় নির্ধারিত সময়সীমা নিশ্চিতভাবে বাস্তবায়নযোগ্য কি না, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া যাচ্ছে না। তবে কাজের গতি বাড়ানো, নিয়মিত অগ্রগতি প্রকাশ, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং জনদুর্ভোগ কমানোর উদ্যোগ এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে ঢাকা–সিলেট মহাসড়কের ছয় লেন প্রকল্পে অগ্রগতির নতুন আশার কথা শোনা গেলেও কাজের বড় অংশ এখনো সম্পন্ন করা বাকি। ২০২৯ সালের জুনের লক্ষ্য বাস্তবায়িত হবে কি না, তা নির্ভর করছে ভূমি অধিগ্রহণ দ্রুত শেষ করা, পিছিয়ে থাকা প্যাকেজগুলোর কাজ ত্বরান্বিত করা এবং নির্মাণকাজের মান বজায় রেখে কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করার ওপর। এখন সিলেটবাসীসহ সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের মানুষের প্রত্যাশা—প্রতিশ্রুতি যেন কাগজে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং দৃশ্যমান উন্নয়নের মাধ্যমে বাস্তবে রূপ নেয়।
