শৈশব থেকেই পড়াশোনার পাশাপাশি সংগীত ও আবৃত্তির প্রতি গভীর অনুরাগ গীতাঞ্জলি ঘোষ স্নেহার। মায়ের হাত ধরে সংগীতের জগতে তার পথচলা শুরু। সময়ের সঙ্গে সেই শখ রূপ নিয়েছে সাধনায়। জাতীয় পর্যায়ে স্বর্ণপদক অর্জন, টেলিভিশনের সংগীতবিষয়ক রিয়েলিটি শোতে সাফল্যসহ নানা অর্জনে সমৃদ্ধ হয়েছে তার সাংস্কৃতিক জীবন। বর্তমানে পড়াশোনার পাশাপাশি সংগীতচর্চা চালিয়ে যাচ্ছেন দিনাজপুরের হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (হাবিপ্রবি) কৃষি অনুষদের ২০২৫ ব্যাচের এই শিক্ষার্থী।
২০০৫ সালের ২৩ ডিসেম্বর জন্ম নেওয়া স্নেহার সংগীতচর্চার শুরু পরিবার থেকেই। তার মা নমিতা ঘোষ একজন সংগীতশিল্পী ও শিক্ষক। রবীন্দ্র ভারতীতে পড়াশোনা করা মায়ের কাছেই সংগীতে হাতেখড়ি স্নেহার। মেয়ের সাংস্কৃতিক চর্চায় শুরু থেকেই উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন তিনি। অন্যদিকে, বাবা গৌতম কুমার ঘোষ পেশায় স্বর্ণ ব্যবসায়ী। মেয়ের সংগীতচর্চায় তারও ছিল আন্তরিক সহযোগিতা।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে শুরু করেন স্নেহা। সপ্তম শ্রেণিতে জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে ভর্তি হওয়ার মধ্য দিয়ে তার প্রাতিষ্ঠানিক সংগীতচর্চার সূচনা হয়। এরপর জেলা ও উপজেলা থেকে শুরু করে আঞ্চলিক ও বিভাগীয় পর্যায়ের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে অর্জন করেন একের পর এক সাফল্য।
স্নেহার সাংস্কৃতিক জীবনের উল্লেখযোগ্য অর্জন ২০১৮ সালে শুদ্ধস্বরে জাতীয় সংগীত প্রতিযোগিতায় জাতীয় পর্যায়ে প্রথম স্থান অর্জন ও স্বর্ণপদক লাভ। ২০১৯ সালে শিশু-কিশোর প্রতিযোগিতায় দেশাত্মবোধক সংগীতে জাতীয় পর্যায়ে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে রৌপ্যপদক পান তিনি। একই বছর জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহে বিভাগীয় পর্যায়ে উচ্চাঙ্গসংগীতে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন।
২০২০ সালে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় আয়োজিত প্রতিযোগিতায় বিভাগীয় পর্যায়ে দেশাত্মবোধক গানে প্রথম স্থান অর্জন করেন স্নেহা। এ ছাড়া ২০১৯ সালে একাডেমি অব ফাইন আর্টস আয়োজিত সংগীত প্রতিযোগিতায় এবং ২০২১ সালে গ্রিন ভয়েস আয়োজিত দেশাত্মবোধক সংগীত প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অর্জন করেন তিনি।
টেলিভিশনের পর্দাতেও নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন স্নেহা। ২০২২ সালে আরটিভির সংগীতবিষয়ক রিয়েলিটি শো ‘সুফিয়ানা’য় দ্বিতীয় রানারআপ হন তিনি। এর আগে ২০২০ সালে এটিএন মিডিয়া কমিউনিকেশন আয়োজিত আট দেশের প্রতিযোগীদের অংশগ্রহণে ‘আগামীর তারকা’ প্রতিযোগিতার ফাইনালিস্ট হওয়ার কৃতিত্ব অর্জন করেন।
সংগীতের পাশাপাশি অন্যান্য ক্ষেত্রেও রয়েছে তার সাফল্য। ২০২০ সালে ফিজিক্স অলিম্পিয়াডের আঞ্চলিক পর্বে বিজয়ী হয়ে জাতীয় পর্যায়ে অংশ নেন। ২০১৯ সালে ন্যাশনাল ইংলিশ অলিম্পিয়াডের আঞ্চলিক পর্বে উত্তীর্ণ হয়ে থিয়েটার রাউন্ডেও অংশগ্রহণ করেন তিনি।
নজরুলসংগীত, রবীন্দ্রসংগীত, হামদ-নাত, আধুনিক ও দেশাত্মবোধক গানসহ বিভিন্ন ধারার সংগীতে একাধিকবার প্রথম স্থান অর্জন করেছেন স্নেহা। আরটিভির ‘মিউজিক স্টেশন’, ‘আর-স্টুডিও’ এবং মাছরাঙা টেলিভিশনের ‘রাঙাসকাল’ অনুষ্ঠানেও সংগীত পরিবেশন করেছেন তিনি। এ ছাড়া ছায়ানটে নজরুলসংগীত রেকর্ডিংসহ বিভিন্ন রেকর্ডিংয়ের অভিজ্ঞতা রয়েছে তার।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পরও সংগীতচর্চা অব্যাহত রেখেছেন স্নেহা। পড়াশোনার পাশাপাশি হাবিপ্রবির বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় সমাবর্তন উপলক্ষে কৃষি অনুষদের ‘কৃষি-কথন’, কৃষি অনুষদের নববর্ষ উদ্যাপন এবং সেজুতি সাংস্কৃতিক ঐক্যের ‘প্রলয়-উল্লাস’ অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করেছেন।
স্নেহার কাছে সংগীত কেবল শখ নয়, এটি তাঁর ব্যক্তিসত্তা ও আত্মপরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সংগীতের প্রতি ভালোবাসা তাঁকে প্রতিনিয়ত অনুপ্রাণিত করলেও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন তিনি।
নিজের অনুভূতি জানাতে গিয়ে স্নেহা বলেন, মা রবীন্দ্র ভারতীতে পড়াশোনা করে এখানে গানের স্কুল দিয়েছেন। মায়ের উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা আর বাবাকে নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় ছুটে চলা কিছুটা হলেও কাজে লাগাতে পেরেছি। সংগীতের প্রতি ভালোবাসা সবসময় থাকবে। তবে সংগীত দিয়ে জীবন চলবে না, এ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে পড়াশোনার প্রতি আমার আস্থা বেশি।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে তিনি বলেন, পড়াশোনার পাশাপাশি সবসময় গান নিয়ে এগিয়ে চলতে চাই। গান আমার কাছে অন্য রকম সম্মান ও শ্রদ্ধার জায়গা, যা আমার নিজস্ব পরিচয়। সংগীত ছাড়া নিজেকে কখনো ভাবতে পারি না। তবে সবসময়ই আমার প্রথম অগ্রাধিকার পড়াশোনা। এ জন্য সবার আশীর্বাদ ও দোয়া চাই।
মেয়ে স্নেহার অর্জনে গর্বিত বাবা গৌতম কুমার ঘোষ। তিনি বলেন, “ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার পাশাপাশি সংগীত, আবৃত্তি ও নাচের প্রতি স্নেহার আগ্রহ ছিল। তার মায়েরও ইচ্ছা ছিল, মেয়ে নাচে-গানে ভালো করবে। আজ সেই ইচ্ছা অনেকাংশে পূরণ হয়েছে। তবে সংগীতকে পেশা হিসেবে নিয়ে কর্মজীবন গড়বে না, এ বিষয়ে আমরা নিশ্চিত ছিলাম।”
অন্যদিকে, মেয়ে সংগীতের প্রতি নিষ্ঠা ধরে রেখে ধারাবাহিকভাবে সাফল্য অর্জন করায় সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন মা নমিতা ঘোষ। বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে স্নেহা অসংখ্য সনদপত্র, ক্রেস্ট ও পুরস্কার অর্জন করেছেন, যা পরিবারের কাছে আনন্দ ও গর্বের স্মারক।
স্নেহার পথচলা দেখায়, প্রতিভার বিকাশে পরিবারের উৎসাহের পাশাপাশি প্রয়োজন নিয়মিত চর্চা, অধ্যবসায় ও লক্ষ্য সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা। সংগীতের মঞ্চে অর্জিত সাফল্য আর শিক্ষার প্রতি অঙ্গীকারকে সঙ্গে নিয়ে ভবিষ্যতে এগিয়ে যেতে চান তিনি। পড়াশোনায় ভালো করার পাশাপাশি সংগীতচর্চা অব্যাহত রেখে একজন শিক্ষার্থী ও সংগীতশিল্পী হিসেবে নিজের পরিচয় আরও সমৃদ্ধ করাই তার লক্ষ্য।
