এক মাসের ব্যবধানে বরিশাল নগরীতে অপরাধের সংখ্যা কমেছে। বিপরীতে উপজেলা পর্যায়ে খুন, ডাকাতি, চুরি ও মাদকদ্রব্য-সংক্রান্ত অপরাধ বেড়েছে। বিশেষ করে মাদক-সংক্রান্ত অপরাধের সংখ্যা এক মাসে দ্বিগুণ হয়েছে। এতে জেলাপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী গত সেপ্টেম্বরে বরিশাল জেলা ও মহানগর এলাকায় মোট ৪৭১টি অপরাধের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে চারটি খুন, সাতটি ধর্ষণ এবং নারী ও শিশু নির্যাতনের ৫৬টি ঘটনা রয়েছে। আগস্টের তুলনায় সেপ্টেম্বরে জেলায় অপরাধ বেড়েছে ৮০টি, শতকরা হিসেবে ৩২ দশমিক ১৩ শতাংশ। অন্যদিকে মহানগরে অপরাধ কমেছে ৩৫টি বা ১৯ দশমিক ৭৭ শতাংশ। জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভায় জেলা ও মহানগর পুলিশের দেওয়া পরিসংখ্যান থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল আলম ফরিদ বলেন, ‘পুলিশের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে, এমনটি বলা যাচ্ছে না। ঘরের ভেতরে সংঘটিত কিছু অপরাধ প্রতিরোধ করা পুলিশের পক্ষে কঠিন। তবে কোনো এলাকায় চুরি-ডাকাতি বেড়ে গেলে তা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির ইঙ্গিত দেয়।’
আরও পড়ুন
তিনি বলেন, ‘মাদকসংক্রান্ত মামলা ও আটকের সংখ্যা বাড়লেও মাদক নিয়ন্ত্রণে এসেছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। মাদকের বিস্তার ও সার্বিক অপরাধ পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। এমন পরিস্থিতি মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।’
পুলিশের হিসাব বলছে, আগস্টে বরিশাল জেলা ও মহানগর এলাকায় মোট অপরাধের সংখ্যা ছিল ৪২৬টি। সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৭১-এ। আগস্টে বরিশাল মেট্রোপলিটন এলাকার বাইরে জেলাপর্যায়ে ২৪৯টি অপরাধের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছিল। সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩২৯টিতে। এ সময়ে খুনের ঘটনা শূন্য থেকে বেড়ে হয়েছে দুটি। ডাকাতির কোনো ঘটনা না থাকলেও সেপ্টেম্বরে একটি ডাকাতির ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। দস্যুতার ঘটনা একটি বেড়ে হয়েছে দুটি। চুরির ঘটনা সাতটি থেকে বেড়ে হয়েছে ১২টি। সড়ক দুর্ঘটনা তিনটি থেকে বেড়ে হয়েছে পাঁচটি।
সবচেয়ে বেশি বেড়েছে মাদকদ্রব্য-সংক্রান্ত অপরাধ। আগস্টে এ ধরনের অপরাধের সংখ্যা ছিল ৭১। সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৬৩টিতে। এক মাসে বেড়েছে ৯২টি। এ ছাড়া সেপ্টেম্বরে পুলিশ আক্রান্ত হওয়ার একটি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।
তবে জেলায় সব ধরনের অপরাধের সংখ্যা বাড়েনি। আগস্টে নারী নির্যাতনের ৩১টি ঘটনার বিপরীতে সেপ্টেম্বরে হয়েছে ২৭টি। অপহরণের ঘটনা দুটি থেকে কমে শূন্যে নেমেছে। শিশু নির্যাতনের ঘটনাও ১৪টি থেকে কমে সাতটি হয়েছে। অন্যান্য অপরাধের সংখ্যা কমেছে ১১টি।
বরিশালের পুলিশ সুপার এ জেড এম মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘মাদকের মামলা বেড়ে যাওয়ার অর্থ এই নয় যে অপরাধ বেড়েছে। মাদকসংক্রান্ত পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মাদক নিয়ন্ত্রণে যথাযথ ভূমিকা পালন করছে। অভিযানের কারণে আটক ও মামলার সংখ্যা বেড়েছে। সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জেলা পুলিশ নিরলসভাবে কাজ করছে।’
অন্যদিকে বরিশাল মহানগরে আগস্টে ১৭৭টি অপরাধের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছিল। সেপ্টেম্বরে তা কমে হয়েছে ১৪২টি। তবে অপরাধ কমলেও খুনের ঘটনা শূন্য থেকে বেড়ে হয়েছে দুটি।
সেপ্টেম্বরে মহানগরে একটি দস্যুতা, তিনটি সিঁধেল চুরি, ছয়টি চুরি, ১৬টি নারী নির্যাতন ও ছয়টি শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া অস্ত্র আইনে একটি এবং মাদকদ্রব্য-সংক্রান্ত ৫১টি অপরাধের তথ্য রয়েছে। অন্যান্য অপরাধের সংখ্যা ৫৫। আগস্টের তুলনায় সেপ্টেম্বরে শিশু নির্যাতনের ঘটনা একটি বেড়েছে। তবে দস্যুতা, সিঁধেল চুরি, চুরি, নারী নির্যাতন, অস্ত্র আইন, অপহরণ, দ্রুত বিচার আইন ও মাদকদ্রব্য-সংক্রান্ত অপরাধসহ বিভিন্ন শ্রেণিতে অপরাধ কমেছে। দুই মাসে মহানগরে ধর্ষণের কোনো ঘটনা নথিভুক্ত হয়নি।
বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার রায়হান কায়সার বলেন, ‘মাদকের মামলা বেশি হওয়ার অর্থ পুলিশ মাদক নিয়ন্ত্রণে তৎপর রয়েছে। সার্বিকভাবে মহানগর পুলিশের চার থানা এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো রয়েছে। তবে কিছু গৃহস্থালি অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। এসব অপরাধ প্রতিরোধে পুলিশের পাশাপাশি পরিবার ও সমাজের প্রতিনিধিদেরও এগিয়ে আসতে হবে।
