সিলেট নগরের ফুটপাত ও সড়কের পাশে গড়ে ওঠা খাবারের দোকানগুলো এবার আসছে নিবন্ধনের আওতায়। পিঠা-পুলি, পুরি-পেঁয়াজু, ফাস্টফুডসহ সরাসরি খাওয়ার উপযোগী খাবার প্রস্তুত ও পরিবেশনকারী নির্ধারিত শ্রেণির ব্যবসার জন্য নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করেছে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। আগামী ১ নভেম্বর থেকে এ নিবন্ধনের আবেদন করা যাবে।
তবে নতুন এই নিয়ম সম্পর্কে সিলেটের ফুটপাতের খাবার বিক্রেতাদের অধিকাংশই জানেন না। নিবন্ধনের আওতায় কারা পড়বেন, কোথায় আবেদন করতে হবে এবং কী কী শর্ত পূরণ করতে হবে সেসব বিষয়ে তেমন কোন কিছুর সম্পর্কে অবগত নয় ক্ষুদ্র আয়ের ব্যবসায়ীরা।
তবে বিষয়টি ব্যবসায়ীদের মাঝে কার্যকর হতে আরও বছরখানেক সময় লাগবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরটি।
সিলেট নগরের বিভিন্ন এলাকায় ফুটপাত ও সড়কের পাশে খাবারের দোকান ঘিরে গড়ে উঠেছে ক্ষুদ্র ব্যবসা। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত এসব দোকানে পিঠা-পুলি, পুরি-পেঁয়াজু, সিঙ্গারা, সমুচা ফাস্টফুডসহ নানা ধরনের খাবার বিক্রি হয়। কর্মস্থলে যাওয়া কিংবা ফেরার পথে অনেকে এসব দোকান থেকে খাবার কেনেন।
কোনো কোনো দোকান স্থায়ীভাবে বসানো হলেও অনেক ব্যবসায়ী অস্থায়ী কাঠামো তৈরি করে অথবা ভ্রাম্যমাণভাবে খাবার বিক্রি করেন। নতুন প্রবিধানমালায় সরাসরি খাওয়ার উপযোগী খাবার প্রস্তুত ও পরিবেশনকারী নির্ধারিত ব্যবসাকে নিবন্ধনের আওতায় আনার ফলে এসব দোকানের ক্ষেত্রেও বিধানটি গুরুত্বপূর্ণ।
নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩ এবং নিরাপদ খাদ্য (রেজিস্ট্রেশন ও লাইসেন্স) প্রবিধানমালা, ২০২৬ অনুযায়ী, নির্ধারিত ১৬ শ্রেণির খাদ্য ব্যবসা ও খাদ্যস্থাপনার জন্য নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত প্রেস বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, আগামী ১ নভেম্বর থেকে প্রবিধানমালার তফসিল-১০ অনুযায়ী নির্ধারিত ফি পরিশোধ করে ফরম ৫.১ অনুসারে নিবন্ধনের আবেদন করতে হবে।
নিবন্ধনের আওতাভুক্ত ব্যবসার মধ্যে রয়েছে সরাসরি খাওয়ার উপযোগী খাবার প্রস্তুত ও পরিবেশনকারী প্রতিষ্ঠান, রেস্তোরাঁ, বেকারি, জুস ও পানীয় বিক্রির প্রতিষ্ঠান, পিঠা-পুলির দোকান, পুরি-পেঁয়াজু ও ফাস্টফুডের দোকান এবং ক্যাটারিং ব্যবসা।
এ ছাড়া প্যাকেটজাত খাদ্য উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ, আইসক্রিম ও দুগ্ধজাত পণ্য, মিষ্টির দোকান ও কারখানা, পাইকারি মুদি ব্যবসা, নির্ধারিত খাদ্য আমদানি এবং বেসরকারি খাদ্যগুদাম ও হিমাগারও নিবন্ধনের তালিকায় রয়েছে।
ভোজ্যতেল ও লবণের বাণিজ্যিক উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ, আমদানি ও বিপণনের মতো কার্যক্রমও এ বিধানের আওতায় পড়বে। শিশু, প্রবীণ কিংবা নির্দিষ্ট রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য তৈরি বিশেষ খাদ্য, পুষ্টি সমৃদ্ধ খাবার এবং বিভিন্ন ধরনের বিশেষ খাদ্যপণ্যের ব্যবসার ক্ষেত্রেও আলাদা বিধান রয়েছে।
তবে তালিকায় কোনো ধরনের খাবারের দোকানের নাম থাকলেই সব ক্ষেত্রে একই নিয়ম প্রযোজ্য হবে, এমন নয়। ব্যবসার ধরন ও কার্যক্রম অনুযায়ী নিবন্ধন বা লাইসেন্সের শর্ত নির্ধারিত হয়েছে। তাই ফুটপাতের খাবার বিক্রেতাদের ক্ষেত্রে কোন বিধান প্রযোজ্য, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা থেকে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, নিবন্ধন বাধ্যতামূলক এমন খাদ্য ব্যবসা নিবন্ধন ছাড়া পরিচালনা করা নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩-এর ৩৯ ধারা অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধ। ফলে নির্ধারিত শ্রেণির ব্যবসায়ীদের নিয়ম মেনে নিবন্ধন নিতে হবে।
নিবন্ধন ও লাইসেন্সের বিধান এক নয়। কর্তৃপক্ষের পৃথক বিজ্ঞপ্তিতে চার শ্রেণির খাদ্য ব্যবসার জন্য লাইসেন্স, প্রিমিসেস লাইসেন্স এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে উৎপাদিত ও আমদানিকৃত পণ্যের লাইসেন্স ও নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করার কথা বলা হয়েছে।
এসব শ্রেণির মধ্যে রয়েছে স্বাস্থ্য সহায়ক ও সম্পূরক খাদ্য, বিশেষ পথ্য, চিকিৎসাজনিত বিশেষ পথ্য, প্রিবায়োটিক ও প্রোবায়োটিক খাদ্য এবং এ ধরনের আরও কিছু পণ্য। এ ছাড়া জৈব খাদ্য, জিনগতভাবে পরিবর্তিত খাদ্য, পুষ্টি সমৃদ্ধ খাবার এবং স্বাস্থ্যগত উপকার বা রোগের ঝুঁকি কমানোর দাবি করা হয় এমন নির্ধারিত খাদ্যপণ্যের ব্যবসাও সংশ্লিষ্ট বিধানের আওতায় রয়েছে।
এসব ব্যবসার ক্ষেত্রে প্রবিধানমালায় নির্ধারিত শর্ত পূরণ করে ফরম ৬.১, ৭.১, ৮.১ ও ৯.১ অনুযায়ী প্রযোজ্য লাইসেন্স ও নিবন্ধনের আবেদন করতে হবে। লাইসেন্স বাধ্যতামূলক এমন ব্যবসা লাইসেন্স ছাড়া পরিচালনা করলে নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩-এর ৩১ ও ৩৯ ধারা অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধ হবে বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
সিলেট নগরের বন্দরবাজার এলাকার চটপটি বিক্রেতা আরজান আহমদ বলেন, ‘নিবন্ধনের বিষয়ে কিছুই জানি না। আমাদের এখানে প্রতিদিন অনেক মানুষ চটপটি খেতে আসেন। খাবার তৈরি করে বিক্রি করাই আমাদের কাজ। নতুন করে কোনো নিয়ম হয়েছে, সে বিষয়ে কেউ আমাদের কিছু জানায়নি।’
নগরির আখালিয়া এলাকার ফাস্টফুড বিক্রেতা ইমন আহমদ বলেন, ‘ব্যবসা করে যা আয় হয়, তা দিয়ে দোকানের খরচ ও সংসার চালাতে হয়। নিবন্ধন করতে কত টাকা লাগবে, কী কী কাগজপত্র দিতে হবে, তা না জেনে কিছু বলা যাচ্ছে না। খরচ বেশি হলে ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য সমস্যা হবে।’
সুবিদবাজার এলাকার পুরি-পেঁয়াজু বিক্রেতা মারজান আলী বলেন, ‘আমরা রাস্তার পাশে অস্থায়ীভাবে দোকান বসিয়ে খাবার বিক্রি করি। স্থায়ী দোকানের মতো আমাদের সব কাগজপত্র নেই। নিবন্ধনের নিয়ম হলে আমাদের মতো ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ীরা কীভাবে আবেদন করব, তা পরিষ্কার করে জানানো প্রয়োজন।’
নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সিলেট জেলার খাদ্য অফিসার সৈয়দ সারফরাজ হোসেন বলেন, আপনার কথাটি ঠিক আছে সেটি এখনো সেভাবে প্রচার প্রচারণায় আসেনি। তবে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি প্রান্তিক থেকে শুরু করে শহরের প্রতিটি ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের মধ্যে পৌঁছে দিতে। সেজন্য আমরা ১ নভেম্বর থেকে বেশি কড়াকড়ি করব না ধরেন ১ বছরের মতো আমরা তাদের সুযোগ দিব তারপর কড়াকড়ি আরোপ করব কিংবা নতুন নিয়ম অনুযায়ী শাস্তির আওতায় নিয়ে আসা হবে।
তিনি আরও বলেন, খাদ্য ব্যবসা নিবন্ধনের আওতায় এলে কোন এলাকায় কী ধরনের খাবার বিক্রি হচ্ছে, তা কর্তৃপক্ষের নজরদারিতে আনা সহজ হবে। এতে খাবারের মান ও পরিচ্ছন্নতা তদারকি এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সুযোগ বাড়বে। বিশেষ করে ফুটপাতের খাবারের ক্ষেত্রে খাবার তৈরি ও সংরক্ষণের পরিবেশ, নিরাপদ পানি ব্যবহার এবং স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করা জরুরি। তবে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের নতুন নিয়ম সম্পর্কে জানানো এবং নিবন্ধনপ্রক্রিয়া সহজভাবে বুঝিয়ে দেওয়া প্রয়োজন, যাতে তারা নিয়ম মেনে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারেন।’
গুগলে আমাদের খবর পেতে
