ইসলাম ডেস্ক

ইস্তিগফার মানে আল্লাহর কাছে নিজের অপরাধ স্বীকার করে কায়মনোবাক্যে ক্ষমা প্রার্থনা করা। দিনরাত ২৪ ঘণ্টা ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় ছোট-বড় নানা ভুল ও পাপে জড়িয়ে পড়ে মানুষ। এই ভুলত্রুটি থেকে ক্ষমা পাওয়ার একমাত্র মাধ্যম হলো আল্লাহর দরবারে ইস্তিগফার করা। এটি আল্লাহর কাছে অত্যন্ত প্রিয় ও মর্যাদাপূর্ণ স্বতন্ত্র ইবাদত।
নবীগণের জীবনে ইস্তিগফার
কোরআন মাজিদে বিভিন্ন নবীর ইস্তিগফারের সুন্দর সুন্দর ঘটনা ও দোয়া বর্ণিত হয়েছে। সব নবীই আল্লাহর দরবারে নিয়মিত ইস্তিগফার করতেন। যেমন—হজরত সুলায়মান (আ.) দোয়া করেছিলেন—
‘হে আমার পালনকর্তা, আমাকে মাফ করুন এবং আমাকে এমন সাম্রাজ্য দান করুন, যা আমার পরে আর কেউ পেতে পারবে না। নিশ্চয়ই আপনি মহাদাতা।’ (সুরা সোয়াদ: ৩৫)
রাসুলুল্লাহ (সা.) নিষ্পাপ হওয়া সত্ত্বেও প্রতিদিন নিয়মিত ৭০ থেকে ১০০ বার তাওবা ও ইস্তিগফার করতেন। এমনকি প্রতিটি ফরজ নামাজ শেষ করে তিনি তিনবার ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ পাঠ করতেন। (মিশকাতুল মাসাবিহ: ৯৬১)
ইস্তিগফার কী?
কোনো গুনাহ বা ভুল করে ফেললে আমরা সাধারণত أَسْتَغْفِرُالله বা ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ পাঠ করি। এটি ইস্তিগফারেরই একটি সুন্দর রূপ, যার অর্থ হলো—‘আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি’।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ইস্তিগফারের নির্দেশ দিয়ে ইরশাদ করেছেন,
‘আর আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাও। নিশ্চয়ই আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা বাকারা: ১৯৯)
ইস্তিগফারের ১৫ ফজিলত ও উপকারিতা
ইস্তিগফারের রয়েছে অফুরন্ত বরকত। এটি আখিরাতে মুক্তি নিশ্চিত করে এবং দুনিয়াবি জীবনে নানা কল্যাণ বয়ে আনে। হাদিস ও কোরআনের আলোকে ইস্তিগফারের প্রধান ১৫টি ফজিলত নিচে তুলে ধরা হলো:
- ১. গুনাহ মাফ হয়: বান্দা লজ্জিত হয়ে ক্ষমা চাইলে আল্লাহ তার সব পাপ ক্ষমা করে দেন।
- ২. বালা-মুসিবত দূর হয়: আসমানি ও জমিনি বিপদ-আপদ থেকে সুরক্ষা পাওয়া যায়।
- ৩. রিজিক প্রশস্ত হয়: নিয়মিত ইস্তিগফারের মাধ্যমে বান্দার রিজিকে অভাবনীয় বরকত ও প্রশস্ততা আসে।
- ৪. পরিবারে শান্তি আসে: ঘরের অশান্তি দূর হয়ে পারস্পরিক ভালোবাসা ও সুখ-শান্তি বজায় থাকে।
- ৫. ইমানি শক্তি বৃদ্ধি পায়: শরীরের ও মনের ভেতর নতুন শক্তি ও কর্মস্পৃহা তৈরি হয়।
- ৬. হৃদয় স্বচ্ছ ও নির্মল হয়: অন্তরের সব জং বা কালিমা দূর হয়ে মন পবিত্র হয়।
- ৭. আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জিত হয়: দয়াময় আল্লাহ ইস্তিগফারকারী বান্দার ওপর অত্যন্ত খুশি হন।
- ৮. চিন্তা-পেরেশানি দূর হয়: মনের সব ধরনের দুশ্চিন্তা ও মানসিক অস্থিরতা কেটে যায়।
- ৯. রহমতের বৃষ্টি বর্ষিত হয়: খরা বা পানির সংকট থেকে মুক্তি মিলে এবং রহমতের বৃষ্টি নামে।
- ১০. সুসন্তান লাভ হয়: নেককার ও অনুগত সন্তান লাভের মাধ্যম হলো ইস্তিগফার।
- ১১. নদী-নালা ও উর্বরতা বৃদ্ধি পায়: প্রকৃতির স্বাভাবিক পরিবেশ ও ফসলের ফলন ভালো হয়।
- ১২. সম্মানিতদের সম্মান বৃদ্ধি পায়: সমাজে মান-মর্যাদা ও গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পায়।
- ১৩. আজাব-গজব থেকে রক্ষা: আল্লাহর বিশেষ নিরাপত্তায় বড় কোনো গজব থেকে বেঁচে থাকা যায়।
- ১৪. দোয়া কবুলের গুণ অর্জন: বান্দা ‘মুস্তাজাবুদ দাওয়াহ’-এর গুণ অর্জন করতে পারে। ‘মুস্তাজাবুদ দাওয়াহ’ বলা হয়—যাঁদের দোয়া কবুল হয়।
- ১৫. পরকালে জান্নাত লাভ: শেষ বিচারের দিনে সফল হয়ে চিরশান্তির জান্নাত লাভ করা যায়।
ইস্তিগফার করার সঠিক নিয়ম
ইস্তিগফার করার কিছু নির্দিষ্ট ধাপ বা নিয়ম রয়েছে:
- অতীতের ভুলের স্বীকারোক্তি: অতীতে যেসব গুনাহ বা ভুলত্রুটি হয়ে গেছে, সেগুলোর কথা স্মরণ করে আল্লাহর কাছে মনেপ্রাণে লজ্জিত হতে হবে।
- প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হওয়া: ভবিষ্যতে আর কখনোই ওই গুনাহের কাজে ফিরে না যাওয়ার দৃঢ় সংকল্প করতে হবে।
- ক্ষমা প্রার্থনা: কায়মনোবাক্যে ও বিনীতভাবে আল্লাহর দরবারে গুনাহের মাফ চাইতে হবে।
- পাপকর্মকে ঘৃণা করা: অন্তরের ভেতর থেকে ওই পাপ কাজটির প্রতি ঘৃণা ও বিরূপ মনোভাব পোষণ করতে হবে।
বান্দার হক আদায় করা: কৃত অপরাধের সঙ্গে যদি অন্য কোনো মানুষের হক বা অধিকার জড়িত থাকে, তবে তা ফিরিয়ে দেওয়া বা তাদের কাছ থেকে ক্ষমা চেয়ে নিতে হবে।
ইস্তিগফার করার উপযুক্ত সময় ও ক্ষেত্র
যেকোনো সময়, যেকোনো মুহূর্তে আল্লাহর কাছে ইস্তিগফার করা যায়। তবে কিছু বিশেষ সময় ও পরিস্থিতিতে ইস্তিগফার করা অধিক ফলপ্রসূ:
- গুনাহ হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে: ভুলবশত কোনো পাপ বা অপরাধ হয়ে গেলে তাৎক্ষণিকভাবে অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা চাওয়া।
- নেক আমলের পর: নামাজ, রোজা বা যেকোনো ভালো কাজ সম্পন্ন করার পরও ইস্তিগফার করা উচিত। কারণ বান্দা মনে করে, যেভাবে হক আদায় করে ইবাদত করার কথা ছিল, হয়তো সেভাবে করতে পারেনি।
- শেষ রাতে ও ফজরের সময়: তাহাজ্জুদের শেষ সময়ে এবং ফজর ও সাহরির ওয়াক্তে ইস্তিগফারের বিশেষ ফজিলত রয়েছে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে বেশি বেশি ইস্তিগফার করার মাধ্যমে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন এবং দুনিয়া ও আখিরাতের সফলতা লাভ করার তাওফিক দান করুন।

