মাসুদ পারভেজ রুবেল, ডিমলা (নীলফামারী)

নীলফামারীর জলঢাকায় পুরোনো বালু অপসারণের ইজারার আড়ালে চাড়ালকাটা নদীর তলদেশ কেটে বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। এ কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে নিষিদ্ধ বোমা মেশিন। বালু পরিবহনে দিনরাত চলছে ভারী ডাম্প ট্রাক। এতে নদীভাঙন, ফসলি জমির ক্ষতি ও পরিবেশদূষণের পাশাপাশি হুমকিতে পড়েছে গ্রামীণ সড়ক এবং তিস্তা সেচ প্রকল্পের ক্যানেল ও বাঁধ। স্থানীয়দের অভিযোগ, এভাবে প্রতিদিন ১০ লাখ টাকার বেশি বালুর বাণিজ্য হচ্ছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, গত জুনে জলঢাকা উপজেলার হরিশচন্দ্রপাঠ, পাইটকাপাড়া, বাশদহ ও বেরুবন্দ এলাকায় চাড়ালকাটা নদীর বাম তীরে খনন করা ৫১ লাখ ৪২ হাজার ঘনফুট বালু নিলামে বিক্রির জন্য ৩১ লাখ টাকায় ইজারা দেয় উপজেলা প্রশাসন। শর্ত অনুযায়ী, নদীর পাড়ে স্তূপ করে রাখা বালু ১২০ দিনের মধ্যে সরিয়ে নিতে হবে। নদী থেকে নতুন করে বালু উত্তোলন করা যাবে না। এ ছাড়া বালু পরিবহনে ভারী যানবাহন বা ডাম্প ট্রাক ব্যবহারেও নিষেধাজ্ঞা ছিল। তবে অভিযোগ রয়েছে, এসব শর্ত অমান্য করে ইজারার আড়ালে নদীর তলদেশ থেকে বালু তুলছেন একাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান।
সরেজমিনে হরিশচন্দ্রপাঠ ও পাইটকাপাড়া এলাকায় দেখা যায়, নদীর তীরে আগে থেকে স্তূপ করে রাখা বালু সরানোর পরিবর্তে চাড়ালকাটা নদী থেকে বালু তোলা হচ্ছে। এ কাজে ২৪ হর্সপাওয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন পাঁচটি মেশিনে ১০ ইঞ্চি ব্যাসের পাইপ যুক্ত করা হয়েছে। নদীর যেসব স্থান থেকে বালু তোলা হচ্ছে, তার ঠিক পাশেই প্রায় তিন কোটি টাকা ব্যয়ে ভাঙন রোধে প্রতিরক্ষাবাঁধ নির্মাণ করছে পাউবো। স্থানীয়দের আশঙ্কা, নদীর তলদেশ কেটে বালু তোলার কারণে বাঁধও ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এতে সরকারি অর্থে নির্মিত অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, গত ছয় মাস ধরে ইজারার নামে নদীতে মেশিন বসিয়ে বালু তোলা হচ্ছে। উত্তোলিত বালু প্রতিদিন রাতে ৫০ থেকে ৬০টি ভারী ডাম্প ট্রাকে করে দেশের বিভিন্ন এলাকায় নেওয়া হয়। তাঁদের অভিযোগ, বালু উত্তোলনের কারণে ইতিমধ্যে নদীর পাড়ে ভাঙন দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে তিন-চারটি মেশিন দিয়ে বালু তোলার সময় নির্গত তেলে নদীর পানি তৈলাক্ত হয়ে পড়ছে। এতে স্থানীয় কৃষি ও মৎস্যসম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে অন্তত ২০ জন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, নদীর পাড়ে জমে থাকা বালু অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। এখন ইজারার নাম ব্যবহার করে নদী কেটে বালু তোলা হচ্ছে। রাতে ডাম্প ট্রাক চলাচলের বিকট শব্দে ঘুমানো যায় না। প্রশাসনকে বারবার জানিয়েও প্রতিকার মেলেনি বলে তাঁদের অভিযোগ। প্রতিবাদ করতে গেলে মামলা ও পুলিশি হয়রানির ভয় দেখানো হয় বলেও দাবি করেন তাঁরা।
অতিরিক্ত ওজনের ডাম্প ট্রাক চলাচলে স্থানীয় গ্রামীণ ও আঞ্চলিক সড়কের পিচ-পাথর উঠে গিয়ে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সেতু ও কালভার্ট। কয়েকটি সেতু ও কালভার্ট ভেঙে পড়ার ঝুঁকিতেও রয়েছে। একই সঙ্গে তিস্তা সেচ প্রকল্পের সেতুর গার্ডার ও সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
ডিমলা, জলঢাকা, কিশোরগঞ্জ ও নীলফামারী সদর সেচ প্রকল্প এলাকার বাসিন্দা লিটন সরকার, জিয়াউর রহমান, মাসুদ রানা, আবুল কালাম, জমির আলী ও হামিদুর রহমানসহ অন্তত ৩০ জন কৃষক এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁরা বলেন, প্রায়ই সেচ ক্যানেলের সড়ক ভেঙে হাজার হাজার একর জমির ফসল নষ্ট হয়। ভারী যানবাহন চলাচলের কারণে তিস্তা সেচ প্রকল্পের পরিদর্শন সড়ক আবারও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ সড়ক ধসে পড়লে পুরো সেচব্যবস্থা অচল হয়ে পড়তে পারে। এতে এ অঞ্চলের হাজার হাজার কৃষককে চরম ক্ষতির মুখে পড়তে হবে।
পাউবো নীলফামারী কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী রেজা মাহমুদ বলেন, নদীর তলদেশ অপরিকল্পিতভাবে কাটা হলে এবং সেচ খালের বাঁধের ওপর দিয়ে নিয়মিত ভারী যান চলাচল করলে নদী প্রতিরক্ষা ও সেচ প্রকল্প—দুটিই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। দ্রুত ডাম্প ট্রাক চলাচল ও অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করা না গেলে কোটি কোটি টাকার সরকারি সম্পদ রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে।
ইজারার শর্ত ভঙ্গ করলে আইন অনুযায়ী ইজারা বাতিল ও জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, জলঢাকা উপজেলা প্রশাসনের পদক্ষেপ এখন পর্যন্ত সতর্কবার্তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।
ইজারার শর্ত লঙ্ঘনের বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জান্নাতুল ফেরদৌস হ্যাপি ইজারাদারকে মৌখিকভাবে সতর্ক করার কথা স্বীকার করেন। তবে নদী থেকে মোট কত বালু তোলা হয়েছে এবং রাতে ডাম্প ট্রাক চলাচলের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি সুনির্দিষ্ট তথ্য দেননি।
ইউএনও জানান, দ্রুত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার পাশাপাশি কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

