সড়ক যেন বাংলাদেশে মৃত্যুর আরেক নাম হয়ে উঠেছে। প্রতিদিনই দেশের কোনো না কোনো প্রান্ত থেকে আসছে সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষের প্রাণহানির খবর। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, সড়ক দুর্ঘটনাগুলোকে আমরা এখন প্রায় স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে মেনে নিতে শুরু করেছি। দুর্ঘটনা ঘটে, মানুষ মারা যায়, তদন্ত কমিটি হয়, কিছুদিন আলোচনা চলে—তারপর সবকিছু আগের মতোই চলতে থাকে। এভাবে একটি দুর্ঘটনার পর আরেকটি দুর্ঘটনা ঘটতে থাকে। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, গত মঙ্গল ও বুধবার দু’দিনে একাধিক ভয়াবহ দুর্ঘটনায় অন্তত ২০ জনের মৃত্যু হয়েছে। নাটোরের বড়াইগ্রামে বাস ও ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে ১২ জন নিহত এবং প্রায় ৩০ জন আহত হয়েছেন। খুলনার ডুমুরিয়ায় পৃথক দুটি দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে ছয়জনের, আর চাঁদপুরের মতলব উত্তরে ও কিশোরগঞ্জের নিকলীতে আরো ২ জন নিহত হয়েছে। ২২ অক্টোবর জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস পালিত হলো এমন একটা প্রেক্ষাপটে।
এসব ঘটনা আবারও প্রমাণ করে, সড়ক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে আমাদের অর্জন খুবই সামান্য। জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস পালিত হলেও এর তাৎপর্য অধরাই থেকে গেছে। অথচ অধিকাংশ দুর্ঘটনাই অনিবার্য নয়; যথাযথ ব্যবস্থা নিলে এসব প্রাণহানি অনেকাংশে রোধ করা সম্ভব। দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তির শাস্তির বিধান থাকলেও তা কার্যকর হতে দেখা যাচ্ছে না।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাবে, ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত দেশে ৭২ হাজার ৭৩৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১ লাখ ২৫ হাজার ৪০৫ জন নিহত এবং ১ লাখ ৭৬ হাজার ২৪৯ জন আহত হয়েছেন। বাস্তবে হতাহতের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলেও সংগঠনটি মনে করে। এ পরিসংখ্যান নিছক সংখ্যা নয়; প্রতিটি মৃত্যুর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি পরিবার, একটি স্বপ্ন এবং অসংখ্য মানুষের ভবিষ্যৎ। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের হিসাবে, ২০২০ থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ হাজার ৯৬৩ শিশু নিহত হয়েছে। এর মধ্যে ২ হাজার ৫১৩ জন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াতের পথে প্রাণ হারিয়েছে।
সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণগুলোও আমাদের অজানা নয়। বেপরোয়া গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং, অদক্ষ ও লাইসেন্সবিহীন চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, চালকের অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা ও বিশ্রামের অভাব, ট্রাফিক আইন অমান্য করা— এসব কারণ বহুদিন ধরেই চিহ্নিত। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে উল্টোপথে গাড়ি চালানো, সড়কের ত্রুটি, অপর্যাপ্ত সড়কচিহ্ন, পথচারীদের নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা না থাকা এবং দুর্বল নজরদারি।
নাটোরের সাম্প্রতিক দুর্ঘটনার ক্ষেত্রেও চালকের দায়িত্ব ও দীর্ঘপথে গাড়ি চালানোর নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। যাত্রীদের অভিযোগ, চালকের পরিবর্তে বাসের সহকারী গাড়ি চালাচ্ছিলেন এবং চালক তখন ঘুমাচ্ছিলেন। অভিযোগটি তদন্তে প্রমাণিত হলে এটি হবে পরিবহন ব্যবস্থার ভয়াবহ অনিয়মের আরেকটি দৃষ্টান্ত।
আমরা মনে করি দুর্ঘটনা কমাতে প্রথমেই প্রয়োজন আইনের কঠোর প্রয়োগ। শুধু আইন প্রণয়ন করলেই হবে না, তা কার্যকর করতে হবে। ফিটনেসবিহীন যানবাহন সড়ক থেকে সরিয়ে দিতে হবে। অদক্ষ বা অনুমোদনহীন চালকের হাতে যাত্রীবাহী যান তুলে দেওয়ার সুযোগ বন্ধ করতে হবে। চালকদের নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা ও পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে মহাসড়কে গতি নিয়ন্ত্রণ, নজরদারি ক্যামেরা এবং প্রযুক্তিনির্ভর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বাড়াতে হবে। সড়ক নির্মাণ ও সংস্কারের ক্ষেত্রেও নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। নিয়মিত রোড সেফটি অডিটের মাধ্যমে দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থান চিহ্নিত করে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, দুর্ঘটনার পর শুধু তদন্ত কমিটি গঠন নয়— তদন্তের সুপারিশ বাস্তবায়ন এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ বিচারহীনতা ও শাস্তির অনিশ্চয়তা চালক, মালিক কিংবা সংশ্লিষ্টদের মধ্যে নিয়ম মানার বাধ্যবাধকতা তৈরি করে না।
সড়কে মানুষের নিরাপদ চলাচল কোনো বিলাসিতা নয়; এটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার। আমরা মনে করি , জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস পালনের আনুষ্ঠানিকতার বাইরে গিয়ে সরকারকে এখন বাস্তব ও কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। মানুষের জীবন রক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েই সড়ক ব্যবস্থাপনায় আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। সড়কে মৃত্যুর এই মিছিল থামাতেই হবে।
