বাঁকুড়া জেলার গঙ্গাজলঘাটি থানার জঙ্গল-লাগোয়া গ্রাম রামকানালী। গ্রামের প্রাচীন লক্ষ্মীমন্দিরে প্রবেশ করলে চোখে পড়ে এক ব্যতিক্রমী দৃশ্য। দেবী লক্ষ্মীর চিরপরিচিত বাহন পেঁচা নয়, এখানে দেবী উপবিষ্টা এক বিশালাকার হাতির পিঠে। বাংলার লোকায়ত ধর্মসংস্কৃতিতে এমন গজলক্ষ্মী মূর্তি বিরল। এই বিশেষ রূপের আরাধনাকে কেন্দ্র করেই প্রতি বছর কোজাগরী পূর্ণিমায় উৎসবে মেতে ওঠেন গ্রামের মানুষ।
রামকানালীর দেবী গজলক্ষ্মী পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে জঙ্গলমহলের মানুষের জীবনসংগ্রাম, কৃষিনির্ভর অর্থনীতি এবং প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের এক আশ্চর্য লোককথা।
প্রায় সোয়া একশো বছর আগের কথা। সে সময় রামকানালী ছিল গভীর জঙ্গল-সংলগ্ন একটি কৃষিপ্রধান গ্রাম। গ্রামের অধিকাংশ মানুষের জীবিকা নির্ভর করত চাষবাসের উপর। কিন্তু ফসল ঘরে তোলার মুখে প্রায়ই বিপর্যয় নেমে আসত। জঙ্গল থেকে বন্য হাতির পাল নেমে এসে পাকা ধানের জমি তছনছ করে দিত। সারা বছরের পরিশ্রমে ফলানো ফসল মুহূর্তে নষ্ট হয়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়তেন কৃষিজীবী মানুষ।
কৃষকের কাছে ধান কেবল খাদ্যশস্য নয়, তা সমৃদ্ধি ও সৌভাগ্যের প্রতীক ; সাক্ষাৎ দেবী লক্ষ্মী। সেই শস্যকে রক্ষা করার আকুলতা থেকেই জন্ম নেয় এক অভিনব ধর্মীয় ভাবনা। লোকবিশ্বাস অনুসারে, গ্রামের মানুষ উপলব্ধি করেছিলেন, জঙ্গলঘেরা এই জনপদে জীবনধারণের জন্য শস্যের দেবী লক্ষ্মীর পাশাপাশি বন্য হাতির প্রতিও শ্রদ্ধা ও সমীহের মনোভাব রাখা প্রয়োজন। সেই ভাবনারই প্রতীকী প্রকাশ ঘটে দেবী লক্ষ্মীকে হাতির পিঠে প্রতিষ্ঠা করার মধ্য দিয়ে। এভাবেই রামকানালীতে শুরু হয় গজলক্ষ্মী দেবীর আরাধনা।
গ্রামবাসীদের বিশ্বাস, এই পুজো শুরু হওয়ার পর থেকে বন্য হাতির পাল আর আগের মতো গ্রামের ফসলের মারাত্মক ক্ষতি করেনি। এই বিশ্বাসের ঐতিহাসিক সত্যতা আজ যাচাই করা কঠিন হলেও, এর মধ্যে ধরা পড়ে প্রকৃতির সঙ্গে সংঘাতের পরিবর্তে সহাবস্থানের আকাঙ্ক্ষা। যে হাতি একদিকে কৃষকের ফসল নষ্ট করার আশঙ্কা, অন্যদিকে সেই হাতিকেই দেবীর বাহন হিসেবে স্বীকার করে নেওয়া— এই রীতির মধ্যে রয়েছে লোকজীবনের এক গভীর তাৎপর্য।
কালক্রমে দেবী গজলক্ষ্মী পুজো রামকানালীর প্রধান উৎসবে পরিণত হয়েছে। প্রচলিত রীতি অনুযায়ী, গ্রামে আলাদা করে দুর্গাপুজোর আয়োজন হয় না। কোজাগরী পূর্ণিমায় লক্ষ্মীপুজোকে ঘিরেই দুর্গোৎসবের মতো আনন্দে মেতে ওঠেন গ্রামবাসীরা। বর্তমানে একটি স্থায়ী মন্দিরে দেবী পূজিতা হন। পুজোর সমাপ্তিতে বিসর্জন উপলক্ষে মহিলাদের সিঁদুরখেলার আয়োজনও উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ।
রামকানালীর দেবী গজলক্ষ্মী তাই নিছক একটি বিরল দেবীমূর্তি নয়। এই আরাধনার মধ্যে মিশে রয়েছে কৃষকের শস্যরক্ষার আকুতি, অরণ্যঘেরা জনপদের অভিজ্ঞতা এবং মানুষের সঙ্গে বন্যপ্রাণের সম্পর্ককে ধর্মীয় প্রতীকে প্রকাশ করার এক নিজস্ব লোকজ ঐতিহ্য। বাংলার গ্রামীণ ধর্মসংস্কৃতির বৈচিত্র্যের মধ্যে রামকানালীর এই পুজো আজও স্বতন্ত্র মর্যাদায় উজ্জ্বল।
এই প্রতিবেদনটি ‘আনন্দ উৎসব’ ফিচারের একটি অংশ।
