জলকে সৃষ্টির আদিতত্ত্ব, জীবনের উৎস ও পরম শক্তির প্রতীক হিসেবে তুলে ধরে এবারের দুর্গাপূজায় ‘জলজ’থিম নিয়ে হাজির হচ্ছে গুলশান–বনানী সর্বজনীন পূজা ফাউন্ডেশনের পূজামণ্ডপ। জল, পদ্ম, প্রকৃতি ও আধ্যাত্মিকতার সমন্বয়ে সাজানো হয়েছে এবারের পূজামণ্ডপ। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন, নদী দখল ও জলদূষণের মতো পরিবেশগত সংকট সম্পর্কে সচেতনতার বার্তাও তুলে ধরা হয়েছে এই আয়োজনে।
সনাতন ধর্মীয় দর্শনে জলকে সৃষ্টির আদি উপাদান ও পবিত্রতার প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অন্যদিকে, আধুনিক বিজ্ঞানেও পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্ব ও বিকাশের সঙ্গে জলের নিবিড় সম্পর্ক স্বীকৃত। নদী, বৃষ্টি, পুকুর, বিল ও সমুদ্রকে ঘিরে গড়ে ওঠা বাংলার জীবন ও সংস্কৃতিতে জলের এই বহুমাত্রিক তাৎপর্যকে কেন্দ্র করেই ‘জলজ’ থিমের পরিকল্পনা।
সনাতন ধর্মে জল পূজার্চনা, ঘটস্থাপন, তর্পণ, হোম ও আত্মশুদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। মাতৃগর্ভ থেকে জীবনের শেষযাত্রা পর্যন্ত মানুষের জীবনচক্রেও জলের রয়েছে অবিচ্ছেদ্য ভূমিকা। জলের বুক চিরে পদ্মের প্রস্ফুটনকে প্রতীকী অর্থে জীবনের জাগরণ ও মহাশক্তি মা দুর্গার আবির্ভাবের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে এই থিমে।
আয়োজকদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, মণ্ডপসজ্জায় স্থাপত্য, প্রকৌশল, কুটিরশিল্প, আলোকনকশা ও বিভিন্ন অলংকরণের সমন্বয়ে গড়ে তোলা হয়েছে বৃহৎ জলজ জৈব-রূপকল্প। বাঁশ, বেত, প্রাকৃতিক তন্তু ও চটের মতো পরিবেশবান্ধব উপকরণ ব্যবহার করে তৈরি করা হয় ঢেউখেলানো বহুস্তরীয় দৃশ্যপট। প্রবেশপথ থেকে মণ্ডপের অভ্যন্তর পর্যন্ত দর্শনার্থীদের যাত্রায় প্রকৃতির উত্তাল তরঙ্গ থেকে প্রশান্তির দিকে এগিয়ে যাওয়ার আধ্যাত্মিক অনুভূতি সৃষ্টির এই পরিকল্পনা।
মণ্ডপে জলপ্রপাত, প্রতিফলন পুকুর ও আলোকসজ্জার সমন্বয়ে তৈরি করা হয়েছে পরিবর্তনশীল নান্দনিক পরিবেশ। এর কেন্দ্রে থাকবে বৃহৎ পদ্মাকৃতির স্থাপত্য। জলের গভীরতা থেকে পদ্মের প্রস্ফুটনের প্রতীকী রূপে সেখানে শঙ্খপটে উদ্ভাসিত হবেন আদ্যাশক্তি মা দুর্গা।
ধর্মীয় ভাবনার পাশাপাশি ‘জলজ’থিমে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে পরিবেশ সংরক্ষণেও। জলবায়ু পরিবর্তন, নদী দখল ও দূষণের কারণে বিশ্বজুড়ে জলসম্পদ ও প্রাকৃতিক জলচক্র নানা সংকটের মুখে পড়েছে। নদীমাতৃক বাংলাদেশের জন্য এ সংকট বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তাই জল সংরক্ষণ ও প্রকৃতির প্রতি দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানাবে এবারের আয়োজন।
জল, পদ্ম, তীর্থবারি, তৃষ্ণা ও জীবনের সমন্বয়ে দেবী দুর্গার কাছে বিশ্বসংসারের কল্যাণ, প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং সৃষ্টির শক্তি জাগ্রত হওয়ার প্রার্থনা জানানো হবে।
গুলশান–বনানী সার্বজনীন পূজা ফাউন্ডেশনের আয়োজনে বনানীর কামাল আতাতুর্ক পার্কে স্থপতি অমিতি কুন্ডু এবং শিল্পী-গবেষক পার্থপ্রতিম সাহার পরিকল্পনা, নকশা ও তত্ত্বাবধানে নির্মাণ করা হয়েছে মণ্ডপটি। আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষের জন্য উন্মুক্ত থাকবে এই সার্বজনীন পূজামণ্ডপ।
শুরু থেকে প্রতিবছরই নতুন থিম ও ভিন্ন ভাবনায় নির্মাণ করা এই পূজামণ্ডপ দেশের সবচেয়ে ব্যয়বহুল এবং নান্দনিক পূজামণ্ডপও বটে।
সংশ্লিষ্ট সংবাদ: সনাতন ধর্ম
০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৩
