ইলন মাস্কEi Samay
Published on
:
3 min read
এই সময়: টেলিকম পরিষেবা নিয়ে ভারতের নীতি নিয়ে প্রশ্ন তোলা থেকে শুরু করে রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ়-এর কর্ণধার মুকেশ আম্বানিকে ভারতের ‘প্রধানমন্ত্রী’ এবং ‘রিয়েল বস’ বলে সম্বোধন করা—গত তিন-চার দিন ধরে অনেক কিছুই করেছেন মার্কিন ধনকুবের তথা টেসলা-কর্তা ইলন মাস্ক।
সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁর করা পোস্টের উত্তরে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন সিংহভাগ ভারতীয়। তাঁর এ হেন মন্তব্যের নিন্দা করেছেন দেশ-বিদেশের বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিও। এই পরিস্থিতিতে ভারতের টেলিকম বাজারে মুকেশের রিলায়েন্স জিয়োকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানিয়ে এ বার সস্তায় স্যাটেলাইট ইন্টারনেট পরিষেবা দেওয়ার বার্তা দিলেন ইলন মাস্ক। তাঁর দাবি, ভারতে স্টারলিঙ্ক-এর পরিষেবা দাম সাধারণ মানুষের সাধ্যের মধ্যে রাখতে হবে। না হলে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ইন্টারনেট বাজারে গ্রাহক পাওয়া সম্ভব হবে না।
মাস্ক-এর এই মন্তব্য ঘিরে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিশেষ করে, জিয়ো-র মূল সংস্থা জিয়ো প্ল্যাটফর্মস যখন দেশের বৃহত্তম ইনিশিয়াল পাবলিক অফারিং (আইপিও) আনার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন মাস্ক-এর এই বার্তা দুই ধনকুবেরের সংস্থার মধ্যে প্রতিযোগিতার সম্ভাবনাকে আরও উস্কে দিয়েছে। অন্য দিকে, স্টারলিঙ্ক-এর ভারতের প্রবেশের অনুমোদন নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে পক্ষপাতের অভিযোগ তুললেও সরকার সেই দাবি খারিজ করেছে।
সম্প্রতি নিজের সমাজমাধ্যম এক্স-এ একটি পোস্টে মাস্ক বলেন, ‘ভারতে স্টারলিঙ্ক-এর পরিষেবার দাম অত্যাধিক হলে কেউ তা কিনবেন না। তাই স্পেসএক্সকে পরিষেবার মূল্য সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখতে হবে।’ তাঁর বক্তব্য, বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়লে ভারতের সাধারণ নাগরিকেরই লাভ হবে, কারণ তাঁরা ইন্টারনেট পরিষেবা বেছে নেওয়ার আরও সুযোগ পাবেন। প্রতিযোগিতার ফলে মুকেশের মুনাফা কমতে পারে, কিন্তু তাতে তাঁর ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবে না বলেও মন্তব্য করেছেন মাস্ক।
যদিও ভারতে স্টারলিঙ্ক-এর পরিষেবার জন্য ঠিক কত টাকা খরচ করতে হবে, সে বিষয়ে কোনও নির্দিষ্ট অঙ্ক জানাননি তিনি। বর্তমানে ভারতে প্রতি জিবি মোবাইল ডেটার খরচ প্রায় আট সেন্ট, যা আন্তর্জাতিক বাজারের নিরিখে অন্যতম কম। বিশ্বের অন্য দেশে স্টারলিঙ্ক–এর পরিষেবার অঙ্ক তুলনামূলক ভাবে অনেক বেশি। ফলে এই বাজারে জায়গা করে নিতে হলে স্টারলিঙ্ককে শুধু প্রযুক্তিগত সুবিধে নয়, দাম নিয়েও জিয়ো-র সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামতে হবে।
ভারতে কম দামে ডেটা পরিষেবা দিয়ে বিপুল গ্রাহকভিত্তি তৈরি করেছে জিয়ো। সেই একই কৌশল কাজে লাগিয়ে কেনিয়ার মতো বাজারে স্থানীয় টেলিকম সংস্থাগুলিকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে মাস্ক-এর সংস্থা। এ বার সরাসরি ভারতের বাজারে প্রবেশের সম্ভাবনা ঘিরে মাস্ক-এর অভিযোগ সেই প্রতিযোগিতাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। স্পেসএক্স-এর মালিকানাধীন স্টারলিঙ্ক-এর পাশাপাশি জিয়ো-র নিজস্ব স্যাটেলাইট ইন্টারনেট পরিষেবা চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে। কিন্তু, দুই সংস্থারই পরিষেবা শুরু করার জন্য প্রয়োজনীয় চূড়ান্ত নিরাপত্তাজনিত ছাড়পত্র এখনও পাওয়া যায়নি।
ভারতে স্টারলিঙ্ক-এর প্রবেশের পথে বাধা তৈরি করা হচ্ছে বলে এর আগেও একাধিক বার অভিযোগ তুলেছেন মাস্ক। তাঁর দাবি, মুকেশের সংস্থা জিয়োকে সুবিধে করে দিতেই অনুমোদনের প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সরকার। শুক্রবার রাতে মুকেশকে সরাসরি নিশানা করে তাঁকে ‘প্রধানমন্ত্রী আম্বানি’ বলে কটাক্ষ করেন মাস্ক। একই সঙ্গে তিনি প্রশ্ন তোলেন, আম্বানি কি স্টারলিঙ্ককে ভারতে প্রতিযোগাতি করার সুযোগ দেওয়ার কথা বিবেচনা করবেন? মাস্ক-এর এই মন্তব্যে ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতার পাশাপাশি দেশের টেলিকম নীতি ও নিয়ামক সংস্থার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
যদিও স্টারলিঙ্কের আনা পক্ষপাতের অভিযোগ মানতে নারাজ কেন্দ্র। সরকারের বক্তব্য, ভারতে স্যাটেলাইট ইন্টারনেট পরিষেবা চালুর অপেক্ষায় থাকা তিনটি সংস্থারই চূড়ান্ত নিরাপত্তাজনিত ছাড়পত্র বাকি রয়েছে। অর্থাৎ, শুধু স্টারলিঙ্ক নয়, জিয়ো-র স্যাটেলাইট টেলিকম পরিষেবাও এখনও অনুমোদনের শেষ ধাপ অতিক্রম করতে পারেনি। ফলে মাস্কের অভিযোগের বিপরীতে সরকারের অবস্থান, অনুমোদনের ক্ষেত্রে কোনও সংস্থাকে বিশেষ সুবিধে দেওয়া হচ্ছে না। মুকেশের সংস্থা অবশ্য মাস্কের সাম্প্রতিক মন্তব্য নিয়ে কোনও প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
এ দিকে জিয়ো প্ল্যাটফর্মস-এর সম্ভাব্য আইপিও ঘিরে বাজারের নজর এখন রিলায়েন্স গোষ্ঠীর দিকে। সংস্থাটির মূল্যায়ন ১০ হাজার ৬০০ কোটি ডলার বা ১০৬ বিলিয়ন ডলার করার লক্ষ্যে এগোচ্ছে তারা—যা ভারতের ইতিহাসে বৃহত্তম আইপিও হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে স্টারলিঙ্কের সম্ভাব্য প্রবেশ জিয়ো-র জন্য ভবিষ্যতে নতুন প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে। তবে স্যাটেলাইট ইন্টারনেট এবং প্রচলিত মোবাইল ডেটা পরিষেবার প্রযুক্তি, পরিকাঠামো ও খরচের ধরন আলাদা হওয়ায় দুই সংস্থার পরিষেবার মধ্যে প্রতিযোগিতা ঠিক কোন পথে এগোবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। শেষ পর্যন্ত পরিষেবার দাম, নেটওয়ার্ক এবং গ্রাহকদের প্রয়োজনের উপরেই নির্ভর করবে ভারতের বাজারে স্টারলিঙ্ক কতটা জায়গা করে নিতে পারবে।