বিশ্বজুড়ে ডানপন্থার উত্থান ঘটেছে। বাংলাদেশে আমরাও তা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের পরাজয়ের পর এখন তার পুনরুজ্জীবন ঘটছে। তবে ফ্যাসিবাদ ও নাৎসিবাদের এমন আশ্চর্য বিবর্তন ঘটেছে, যা দেখতে পেলে হিটলারের চমকে ওঠার কথা। বিভিন্ন ধর্মের উগ্রপন্থিরা জেনে বা না জেনে ফ্যাসিবাদকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করছে। ফ্যাসিবাদকে আক্ষরিক সংজ্ঞায় সীমাবদ্ধ রাখলে এই বিবর্তন বোঝা যেমন কঠিন, তেমনি আমেরিকা সত্যি ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের দিকে যাত্রারম্ভ করেছে কিনা তা বোঝা সম্ভব নয়।
সত্য হচ্ছে, পুঁজিবাদের স্বাভাবিক ধর্ম হচ্ছে, তা একসময় ফ্যাসিবাদে রূপান্তরিত হয়। সাংবাদিক ক্রিস হেজেসের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে অর্থনীতিবিদ ইয়ানিস ভারাউফাকিস বলেন, পুঁজিবাদ তার সংকট মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হলে ফ্যাসিবাদে আশ্রয় নেয়। এ হচ্ছে বিপদগ্রস্ত বিমানের চালক যেমন নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে লিভারে টান দিতে থাকেন, কিন্তু তা কাজ করে না—পুঁজিবাদের চালকদেরও এই অবস্থা হয়। পুঁজিবাদকে রক্ষার শেষ চেষ্টা হিসেবে তখন তাদের ফ্যাসিবাদী হওয়া ছাড়া পথ খোলা থাকে না। পুঁজিবাদের সংকট যেমন অনিবার্য, একসময়ে না একসময় তার ফ্যাসিবাদে রূপান্তরও তেমনি সুনিশ্চিত।
হিটলারের পরাজয়ে সমাজতান্ত্রিক রাশিয়ার আত্মত্যাগ ছিল অতুলনীয়। কিন্তু জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকি শহরে পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে যুক্তরাষ্ট্র যে হাততালি জোগাড়ের চেষ্টা করেছিল, সেখানে ছিল বিশ্বে নিজের ফ্যাসিবাদী আধিপত্য অর্জনের সুপ্ত আকাঙ্ক্ষা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ যে দুনিয়াকে তৎকালীন প্রধান পুঁজিবাদী দেশসমূহের মাঝে ভাগাভাগির লড়াই ছিল, এ কথা ভুললে চলবে না। কিছুকাল সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের অস্তিত্ব তাদের সেই কামড়াকামড়িকে প্রশমিত করেছিল মাত্র। গত শতকের শেষভাগে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার পতনের পর পুঁজিবাদী বিশ্বের নগ্নরূপ আবার উন্মোচিত হচ্ছে। ফ্যাসিবাদের এই নতুন বিকাশে নেতৃত্ব দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা। তাকে অনুসরণ করছে সাম্রাজ্যবাদী, পুঁজিবাদী ও ক্লেপ্টোক্রেটরাও।
ফ্যাসিবাদের এই নতুন বিকাশ আমেরিকার নেতৃত্বে ঘটছে, সেটা হিটলারের জন্য অতটা বিস্ময়ের নাও হতে পারে। তবে তার জন্যও যা বিস্ময়ের, তা হলো এই নতুন ফ্যাসিবাদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ইসরায়েল—যে রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে হিটলারের ইহুদি নিধনের অপরাধ থেকে পশ্চিমা সভ্যতাকে মুক্তি দেওয়ার বাসনায়। আরেকটা আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই ফ্যাসিবাদ এখন বৈশ্বিক, বিভিন্ন ধর্মের উগ্রপন্থিদের আদর্শে রূপান্তরিত। ধর্ম নিয়ে বিভিন্ন বিশ্বাসীদের আপাত বিরোধ সত্ত্বেও তাদের আশ্চর্য মিল আধিপত্যবাদে, শ্রেষ্ঠত্বের অহমিকায়, ধর্ম-বর্ণ-জাতীয়তার নিরিখে মানুষের বিচারে, মুনাফার লোভে, সংখ্যালঘু নির্যাতনে ও ধর্মের অপব্যবহার।
ফ্যাসিবাদের বিবর্তনে এই নতুন দুটি বিষয়ের মধ্যে প্রথমটি অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব কম দৃশ্যমান। আমাদের আজকের আলোচনা এ বিষয়ে। যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প শাসনামল একে স্পষ্টতর করে তুলছে। সাম্প্রতিক ঘটনাসমূহ এক্ষেত্রে বিশেষ উদ্বেগজনক। যুক্তরাষ্ট্রের আইস (ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট) যেভাবে অশ্বেতাঙ্গ অখ্রিস্টান নাগরিকদের দেশ থেকে বিতাড়নের জন্য উঠেপড়ে লেগেছে, তাতে দেশটির গণতান্ত্রিক চর্চা ভীষণভাবে প্রশ্নবিদ্ধ ও শঙ্কার মুখে। কিন্তু এ অবস্থা আকস্মিক নয় এবং এটি এখানেই থেমে থাকবে না। দেশটির বর্তমান রাজনৈতিক বন্দোবস্তের পরিবর্তন না ঘটলে এটি অনিবার্যভাবে নতুন ফ্যাসিবাদে পরিণত হবে।
নোবেল পুরস্কার বিজয়ী ড্যারন আসেমোগলু ২০২০ সালের ১৫ জানুয়ারি ‘ইজ আমেরিকা গোয়িং ফ্যাসিস্ট?’ (আমেরিকা কি ফ্যাসিবাদী হতে চলেছে?) শীর্ষক প্রজেক্ট সিন্ডিকেটে প্রকাশিত একটি লেখায় এর ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। লিখেছিলেন, “সন্ত্রাস উসকে দেওয়া ও সত্যকে বিকৃত করার প্রবণতার জন্য অনেকেই সিদ্ধান্ত টানেন, ট্রাম্প এক ফ্যাসিবাদী। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর হলো, ট্রাম্প গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ও নিরপেক্ষ আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়াসমূহকে নস্যাৎ করতে চান, কেবল তার ও তার পরিবারের কপট ব্যবসাপাতিকে আড়াল করার জন্যই নয়, তার ব্যক্তিগত ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্যও। ১৯২০-এর পর থেকে ইতালির ফ্যাসিস্ট ও নাৎসিরাও একই পথে অগ্রসর হয়েছিল।”
এরপর তিনি লিখেছেন, “সবশেষে, ট্রাম্পকে রিপাবলিকান দলের নিঃশর্ত সমর্থন প্রদানের ঘটনা, যা মুসোলিনি ও হিটলারকে সমর্থন করা দক্ষিণপন্থি রাজনীতিকদের অনুরূপ। তবু অনৈতিক রাজনীতিকদের অসৎ কর্মকাণ্ডকে সহসা ফ্যাসিবাদী বলা যাবে না। এটা গুরুত্বপূর্ণ, কেননা ট্রাম্পকে ফ্যাসিবাদী না অন্য কিছু বলা হবে তা ঠিক করতে হবে। নিশ্চিতভাবে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ মার্কিন প্রতিষ্ঠানসমূহকে অস্তিত্বের হুমকির মুখে ফেলবে। যে শক্তিসমূহ এবার তার এজেন্ডা বাস্তবায়নে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে—বিশেষ করে সংঘবদ্ধ জনতা, তারা শক্তি হারাবে তার ক্ষমতা দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের তুলনায় রাজনৈতিক রীতিনীতি বেশি করে ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে। আমলাতন্ত্রের নিরপেক্ষ দক্ষতা ধ্বংস করার প্রশাসনিক প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে। বিচার ব্যবস্থাসহ পুরো রাজনৈতিক বন্দোবস্তের এমন মেরুকরণ ঘটবে যা পুনরুদ্ধার সম্ভব হবে না।”
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ সম্পর্কে আসেমোগলুর এই ভবিষ্যদ্বাণী এখন চোখের সামনে ফলতে দেখা যাচ্ছে। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ মূলত যুক্তরাষ্ট্রকে একটি শ্বেতাঙ্গ খ্রিস্টান ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রে পরিণত করার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। আর এই কাজে তার অন্যতম মিত্র ইভানজেলিক্যাল খ্রিস্টানরা। এদের ৮০ শতাংশ ট্রাম্পকে ভোট দিয়ে ক্ষমতায় এনেছে। তিনি ক্ষমতায় বসেই তার চারপাশে উগ্র খ্রিস্টান, জায়নবাদী, বর্ণবাদী, শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদীদের অধিষ্ঠিত করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ইসরায়েলি দূত মাইক হাকাবি ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রী পিট হেগসেথ উগ্র জায়নবাদী। ইভানজেলিক্যাল, জায়নবাদী ও হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তাগণ ট্রাম্পকে উপস্থাপন করছেন ঈশ্বরের প্রতিনিধি হিসেবে—যেন তিনি যা কিছু করছেন, সব ঈশ্বর ও যিশুর ইচ্ছা পূরণের জন্য। ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক যৌথ হামলায় ধর্মকে নির্লজ্জভাবে ব্যবহার করতে দেখা যাচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসনকে, ইরানের ধর্মীয় নেতাদের নয়। ২০১৬ সালে ক্ষমতায় আসার পর ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের ইসরায়েলি দূতাবাস তেল আবিব থেকে সরিয়ে জেরুজালেমে নিয়ে আসেন, যা ছিল রোনাল্ড রিগ্যানের প্রচেষ্টা ও ইভানজেলিক্যাল জায়নবাদীদের স্বপ্ন। জেরুজালেমে দূতাবাস সরিয়ে ও ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন নস্যাৎ করে ট্রাম্প বলেন, “ইভানজেলিক্যালদের জন্য আমি এটা করেছি।”
পিট হেগসেথ মনে করেন, “খ্রিস্টান জাতীয়তা আমাদের ডিএনএ-র ভেতর।” খ্রিস্টান জাতীয়তাবাদীদের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের আইন কেবল খ্রিস্টান ধর্মমতের প্রতিফলন ঘটাবে, বাইবেলের আইনকে অধিষ্ঠিত করবে, চার্চ ও রাষ্ট্রের পৃথক সত্তা মুছে দিবে এবং বহুত্ববাদ ও গণতন্ত্রকে বিলীন করবে। দ্য গার্ডিয়ানে (৩ মে ২০২৬) অ্যাড্রিয়েন ম্যাতেই তার “ক্রিস্টোফ্যাসিজম ইজ হিয়ার: ইনসাইড দ্য স্লো ডিমোলিশন অব ইউএস পাবলিক হেলথ” শীর্ষক লেখায় গ্যারি গুনডারসনের বরাত দিয়ে বলেছেন, “আমরা যুক্তরাষ্ট্রে আজ যা দেখছি তা হলো ধর্ম ও খ্রিস্টান জাতীয়তাকে ব্যবহার করে জনগণ ও সরকারের মধ্যেকার সামাজিক চুক্তির বৈজ্ঞানিক ভিত্তিকে বিনষ্ট করা ও তার জায়গায় এক কর্তৃত্বপরায়ণ সম্পর্ককে স্থাপন করা।”
সম্প্রতি আইস বাহিনী দ্বারা কংগ্রেসওম্যান ইলহান ওমরের বাড়িতে হামলা ও তল্লাশি যুক্তরাষ্ট্রে সহিংস শ্বেতাঙ্গ খ্রিস্টান জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে। সোমালিয়ায় জন্মগ্রহণ করা ওমর মিনেসোটা রাজ্য থেকে নির্বাচিত কংগ্রেস প্রতিনিধি। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদ থেকেই তিনি তার আক্রমণের শিকার। এতদিন যা ছিল ট্রাম্পের মৌখিক গালাগালিতে সীমাবদ্ধ, এখন তা রাষ্ট্রীয় সহিংসতায় রূপ নিয়েছে। মিথ্যা অভিযোগ তুলে তার নাগরিকত্ব বাতিলের ও তাকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিতাড়নের ভয়ঙ্কর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। অভিবাসীদের দেশ যুক্তরাষ্ট্রের এ এক নতুন দানবীয় রূপ। মাগা (মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন) প্রকল্পের সামনে যত রকম প্রতিবন্ধকতা আছে, সেসব নির্মূল করে দেশটিকে একটি ধর্মীয় ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রে পরিণত করার সকল আয়োজন চলমান।
যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক প্রভাব অনস্বীকার্য। ফলে তার প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রভাবও বিরাট। এই প্রভাবের ফলে এখন দুনিয়া জুড়ে খুদে ট্রাম্প তৈরি হয়েছে অসংখ্য। ফ্যাসিবাদী আচরণ বিশ্বের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ছে। এর প্রতিষেধক একটাই—আসেমোগলুর মতে রাস্তার মানুষ, দরিদ্র জনগণ। সব দেশেই তাই।
আলমগীর খান: কবি ও সমাজকর্মী। ই-মেইল: alamgirhkhan@gmail.com
