একটি সরকারি চাকরির কথা দিয়ে শুরু করি। পদের নাম অফিস সহায়ক। শিক্ষাগত যোগ্যতা এসএসসি পাস, বেতন ২০তম গ্রেডে। অথচ পাবনা জেলা প্রশাসনের ওই পদে নিয়োগ পাওয়া ১৮ জনের ১৭ জনই উচ্চশিক্ষিত। কেউ বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রিধারী, কেউ এমবিএ, কেউ স্নাতকোত্তর। আবেদন করেছিলেন প্রায় ৮ হাজার মানুষ। চলতি বছরের জুনে সংবাদমাধ্যমের একটি প্রতিবেদনে উঠে আসে এই চিত্র।
এটি কি শুধু একটি ঘটনা, নাকি দেশের চাকরির বাজারের বড় সংকটের প্রতিচ্ছবি? আইএমএফের হিসাবে, বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের প্রায় ২৯ শতাংশ বেকার। ডিগ্রি বাড়লেও চাকরি মিলছে না কেন?
উচ্চশিক্ষিতদের বেকারত্ব: দুই হিসাবে দুই চিত্র
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৪ সালের শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়শিক্ষিতদের বেকারত্বের হার ছিল ১৩ দশমিক ৫৪ শতাংশ। বিশ্ববিদ্যালয়শিক্ষিত বেকার ছিলেন প্রায় ৮ লাখ ৮৫ হাজার। দেশে মোট বেকার ছিলেন ২৬ লাখ ২৪ হাজার।
তাহলে আইএমএফের হিসাবে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের বেকারত্ব প্রায় ২৯ শতাংশ কেন? কারণ, দুটি হিসাব একই গোষ্ঠীর নয়। বিবিএসের হিসাবটি সব বিশ্ববিদ্যালয়শিক্ষিত শ্রমশক্তিকে ধরে। আর আইএমএফের হিসাবটি শুধু উচ্চশিক্ষিত তরুণদের নিয়ে।
এই সংকট নতুন নয়। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বা বিআইডিএসের ২০২৪ সালের এক গবেষণায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়-অধিভুক্ত কলেজের ১ হাজার ৩৪০ জন স্নাতকের মধ্যে ২৮ দশমিক ২৪ শতাংশকে বেকার পাওয়া যায়। নারীদের ক্ষেত্রে এ হার ছিল ৩৪ দশমিক ৩১ শতাংশ। পুরুষদের ক্ষেত্রে ১৯ দশমিক ৯৬ শতাংশ।
ডিগ্রি বাড়ছে, মানসম্মত চাকরি কোথায়?
উচ্চশিক্ষিতদের বেকারত্বের পাশাপাশি আরেকটি সমস্যা হলো, চাকরি পেলেও অনেকেই নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কাজ পাচ্ছেন না। আইএমএফের ১৫ অক্টোবর প্রকাশিত রিজিওনাল ইকোনমিক আউটলুক: এশিয়া অ্যান্ড প্যাসিফিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উচ্চশিক্ষিত চাকরিজীবীদের প্রায় অর্ধেক এমন পেশায় আছেন, যেখানে তাঁদের শিক্ষার স্তরের পুরো প্রয়োজন পড়ে না।
অর্থাৎ একদিকে চাকরি না পাওয়ার সংকট, অন্যদিকে যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ না পাওয়ার সমস্যা। এই পরিস্থিতির পেছনে কারণ কী?
শুধু দক্ষতার ঘাটতি, নাকি চাকরিরও অভাব?
শুধু তরুণদের দক্ষতার ঘাটতি দিয়ে বেকারত্বের পুরো চিত্র ব্যাখ্যা করা যায় না। বিআইডিএসের গবেষণায় নিয়োগদাতারা আইসিটি, ইংরেজি, যোগাযোগ, সমস্যা সমাধান এবং দলগতভাবে কাজ করার দক্ষতার ওপর জোর দিয়েছেন। অর্থাৎ শিক্ষাব্যবস্থা থেকে তরুণেরা যে দক্ষতা নিয়ে বের হচ্ছেন, আর চাকরির বাজার যে দক্ষতা চাইছে—এই দুইয়ের মধ্যে ফাঁক রয়েছে।
তবে সমস্যা শুধু দক্ষতার নয়, চাকরির সংখ্যারও। আইএমএফের জানুয়ারিতে প্রকাশিত বাংলাদেশবিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, মানুষের শিক্ষাগত যোগ্যতা যে গতিতে বেড়েছে, সেই গতিতে উচ্চমানের চাকরি তৈরি হয়নি। আধুনিক ও দক্ষতানির্ভর শিল্পও যথেষ্ট বিস্তৃত হয়নি।
ফলে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের বড় একটি অংশকে অর্থনীতি ঠিকমতো কাজে লাগাতে পারছে না। এর বাস্তব উদাহরণ পাবনার সেই অফিস সহায়ক পদে নিয়োগ।
গত জুলাইয়ে তৎকালীন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী, বর্তমানে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছিলেন, একটি চাকরির পদের জন্য পাঁচ থেকে ছয় লাখ আবেদনও আসছে। অফিস সহায়ক পদেও হাজার হাজার আবেদন পড়ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা প্রায় চার কোটি বলেছিলেন। তবে এই সংখ্যা বিবিএসের সরকারি বেকারত্বের পরিসংখ্যানের সঙ্গে মেলে না। তাই এটিকে সরকারি হিসাব না ধরে তাঁর বক্তব্য হিসেবেই দেখা উচিত।
চাকরির বাজারে নতুন চাপ এআই
চাকরির বাজারে নতুন চাপ তৈরি করছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। আইএমএফ ১৯টি এশীয় অর্থনীতির প্রায় ৪ কোটি অনলাইন চাকরির বিজ্ঞাপন বিশ্লেষণ করেছে। তাতে দেখা গেছে, এআইয়ের প্রভাব বেশি এমন পেশায় নিয়োগচাহিদা কম প্রভাবিত পেশার তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ কমেছে। তবে এটি বাংলাদেশের একার হিসাব নয়।
একই সময়ে এআই-সম্পর্কিত দক্ষতা আছে, এমন কর্মীর চাহিদা বাড়ছে। অর্থাৎ শুধু নতুন চাকরি তৈরি করলেই হবে না, চাকরির ধরনেও পরিবর্তন আসছে। সেই পরিবর্তনের সঙ্গে দক্ষতাকেও মানিয়ে নিতে হবে।
সমাধান কী?
সমাধানও তাই একমুখী নয়। বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পের যোগাযোগ বাড়াতে হবে। দরকার ইন্টার্নশিপ, শিক্ষানবিশি, বাজারমুখী দক্ষতা ও ভালো প্রশিক্ষণ। পাশাপাশি এমন বিনিয়োগ ও শিল্প দরকার, যেখানে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের জন্য পর্যাপ্ত মানসম্মত চাকরি তৈরি হবে।
এর মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসও কমিয়েছে আইএমএফ। সংস্থাটির হিসাবে, ২০২৬ সালে প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৩ দশমিক ৬ শতাংশ এবং ২০২৭ সালে ৩ দশমিক ২ শতাংশ।
সব মিলিয়ে সংকটটা শুধু ‘চাকরি নেই’—এতটুকু নয়। বড় প্রশ্ন হলো, যে তরুণদের আমরা বছরের পর বছর পড়াশোনা করাচ্ছি, আমাদের অর্থনীতি কি তাদের জ্ঞান, শিক্ষা ও দক্ষতা কাজে লাগানোর মতো পর্যাপ্ত মানসম্মত চাকরি তৈরি করতে পারছে?
