স্বল্পদৈর্ঘ্য বিরতির পর পরিচালক দেওয়ান নাজমুল অমর কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘স্বামী’ অবলম্বনে ‘শিশির ভেজা চোখ’ নামে একটি সিনেমা নির্মাণের কাজে হাত দিয়েছেন। ইতোমধ্যেই ঢাকা জেলার শ্রীনগরে সিনেমাটির কাজ শুরু হয়েছে। এর বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করছেন রাজ রিপা, শিপন মিত্র, সাব্বির আহমেদ, বড়দা মিঠু, শিবা শানু, শিরীন আলম, রেশমী, ববি, জ্যাকি, ফিরোজ আলম, নৈরিতা এবং অধরা চৌধুরীসহ অনেকে।
এর আগে দেওয়ান নাজমুল যৌথ প্রযোজনায় ‘সীমারেখা’ সিনেমাটি ছাড়াও নিজস্ব প্রযোজনায় ‘নাকফুল’ ও ‘তোরে কত ভালোবাসি’ সিনেমা নির্মাণ করেন। নির্মাণ করেছেন বেশ কিছু নাটকও। ‘শিশির ভেজা চোখ’ সিনেমাটি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এই সাহিত্যকর্ম অনেক পুরোনো হলেও মানুষের আবেগের কোনো পরিবর্তন হয়নি। আধুনিকতা ও ডিজিটাল প্রক্রিয়ার মধ্যে সমাজে বড় ধরনের একটা রূপান্তর ঘটলেও শেকড় কিন্তু বদলায়নি। স্বামী গল্পটি ১৯৪২ সালে গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় অ্যান্ড সন্স থেকে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। এরপর অতিবাহিত হয়ে গেছে প্রায় ৮৪ বছর। লেখক হিসেবে শরৎচন্দ্র হলেন নিপীড়িত-দরিদ্র অভাজনের ব্যথা-বেদনার কাব্যকার। তিনি তার সাহিত্যে অসহায় দুর্বল তথাকথিত সমাজে পতিতদের দুঃখ, দুর্গতি ও নানা সমস্যার ছবি এঁকেছেন সহানুভূতি ও গভীর মমতার সঙ্গে। তার লেখায় একদিকে যেমন আছে সমাজের নির্মম অত্যাচার ও নিপীড়নের ছবি, অপরদিকে তেমনি আছে অসহায় নারী জাতির প্রতি তার দরদি ও মরমি হৃদয়ের এক অপূর্ব প্রকাশ। তাই শরৎ সাহিত্যে দেখা যায় পুরুষ চরিত্র অপেক্ষা নারী চরিত্রের স্বাভাবিক প্রাধান্য। প্রকৃতপক্ষে শরৎচন্দ্র নারীর সতীত্বের চেয়ে তার নারীত্বকে দিয়েছেন অধিক মর্যাদা। বিধবাদের প্রতি ছিল তার সমবেদনা। সমাজের কুসংস্কার, অন্যায়-অবিচার, জাতিভেদ প্রথার বিরুদ্ধে তিনি মতপ্রকাশ করেছেন। শরৎসাহিত্য বাংলা উপন্যাসে নিয়ে এসেছে বিষয়বৈচিত্র্য, চরিত্রের নতুনত্ব, প্রত্যক্ষ সমাজ সমস্যা। সমাজের অধিকাংশ সমস্যার মূল উৎস মানুষ, তাই বঞ্চনাকারীর প্রতি তার এত ক্ষোভ। তিনি বাস্তব জিনিসের ওপরেই জমা থাকা ঘটনা ও চিত্র নিয়ে কথাসাহিত্য রচনা করে গেছেন। সমাজে যেসব মানুষ নিন্দিত, উপেক্ষিত, শরৎচন্দ্র তার দরদি মন নিয়ে তাদের পক্ষ অবলম্বন করে দেখিয়েছেন যে মনুষ্যচরিত্র, ধর্ম এবং মানব মনের সুপ্ত বাসনাগুলো কখনোই মারা যায় না।
দেওয়ান নাজমুল শরৎচন্দ্রের এই সাহিত্যকর্ম বেছে নিলেন কেনÑ জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, শরৎচন্দ্রের অন্য লেখার চেয়ে স্বামীতেই তাকে বেশি উপলব্ধি করেছি। এ সিনেমাটি বানাতে গিয়ে সিনেমাটিক পরিমার্জন ছাড়া শরুৎচন্দ্রকেই সমুন্নত রাখার চেষ্টা করেছি। তার চিন্তা-চেতনা, ধ্যান-ধারণার পরশ সিনেমাটির প্রতিটি দৃশ্যেই পাওয়া যাবে বলে জানান পরিচালক।
‘শিশির ভেজা চোখ’ সিনেমার আখ্যানভাগে রয়েছে ছোটবেলায় প্রেমের সম্পর্কে জড়ালেও মিনির বিয়ে হয় বয়সে বড় ও বিপতœীক ঘনশ্যামের সঙ্গে। যাকে সে মনেপ্রাণে চায়নি, তার সঙ্গে ঘর করতে গিয়ে প্রথমদিকে সে মানসিক দূরত্ব ও বিতৃষ্ণা অনুভব করে। ঘনশ্যামের শান্ত, সহ্যশীল ও কর্তব্যপরায়ণ রূপ এবং তার প্রতি ভালোবাসা মিনি সহজে বুঝতে পারে না। একসময় তার পুরোনো প্রেমের মানুষ নরেন উপস্থিত হয়। মিনি নরেনের হাত ধরে চলে যাওয়ার চেষ্টা করলেও, পরে সে তার প্রকৃত স্বামী ঘনশ্যামের নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ও মর্যাদা উপলব্ধি করতে পারে এবং অনুশোচনায় আচ্ছন্ন হয়। ফিরে আসে ঘনশ্যামের কাছে। এভাবেই নারীর মর্যাদা সমুন্নত রাখা হয়েছে।
সিনেমাটি পরিচালনা ছাড়াও চিত্রনাট্য, সংলাপ সংযোজন এবং গীত রচনা করেছেন পরিচালক নিজেই। চিত্রগ্রহণে রয়েছেন তপন আহমেদ এবং সংগীত পরিচালনা করছেন আলাউদ্দিন হক ও আলী আশরাফ। ‘শিশির ভেজা চোখ’ সম্পাদনা করছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাওয়া সম্পাদক মো. শহিদুল হক। এমপ্যাথী প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান থেকে নির্মিত এই সিনেমার সার্বিক ব্যবস্থাপনায় রয়েছেন মো. আলমগীর হোসেন।
