কক্সবাজারের উখিয়ার টুপটুপ রিসোর্টে আগুনে পুড়ে ১০ পর্যটকের মৃত্যুর ঘটনায় জেলা প্রশাসনের তদন্ত দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। এ সময় তারা প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলেন। এর মধ্যে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ২৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। রিসোর্ট মালিকদের একজন মো. তানভীরকে প্রধান আসামি করে উখিয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আশীষ সূত্রধর বাদি হয়ে মামলাটি করেন।

এদিকে রোববার (১৮ অক্টোবর) সকাল ১০টায় ঘটনাস্থলে যান তদন্ত কমিটির সদস্যরা।
দুপুর দুইটা পর্যন্ত ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন তদন্ত দলের সদস্যরা। পরে এ বিষয়ে তদন্ত কমিটির প্রধান ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) তাসনীম জাহানের জানান, ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে আমরা আগুন লাগার কারণ, পর্যটকদের মৃত্যুর ঘটনায় রিসোর্ট কর্তৃপক্ষের কোনো গাফিলতি ছিল কি-না খতিয়ে দেখছি। এছাড়া রিসোর্ট কর্তৃপক্ষের প্রয়োজনীয় নিবন্ধন ও নথিপত্র ছিল কি-না এবং অবকাঠামোগত কী কী সমস্যা ছিল সেসব বিষয়ও খতিয়ে দেখেছি। এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত তদন্তের প্রয়োজন।
শনিবার সকালে কাঠের তৈরি তিনতলা রিসোর্টটিতে আগুন লাগে। আগুনে ১০ পর্যটকের মৃত্যু হয়। আহত হন আরও ছয়জন। এ ঘটনায় পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে জেলা প্রশাসন। তদন্ত কমিটিতে উখিয়া উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এবং ফায়ার সার্ভিস ও পরিবেশ অধিদপ্তরের একজন করে প্রতিনিধিকে সদস্য করা হয়। আগামী পাঁচ দিনের মধ্যে কমিটিকে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
পরিচয় জানতে ডিএনএ পরীক্ষা
আগুনের ঘটনায় নিহত ১০ জনের মধ্যে ছয়জনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। তারা হলেন—ঢাকার বনশ্রীর ইসরাত জাহান (৩০) ও মিলিতা মেহেজাবিন (২৩), খিলগাঁওয়ের লায়লা জাহান (২৭) ও নাফিসতা মীম (২৭), চুয়াডাঙ্গার ফারিহা কবির (৩৩) এবং পাঁচ বছর বয়সী ফায়িজান আহম্মেদ।
তবে অপর চারজনের লাশ বিকৃত হয়ে যাওয়ায় পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। তাই তাদের ডিএনএ পরীক্ষা করা হবে বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) সুবক্তগীন মাহমুদ জানান, নিহতদের পরিচয় নিশ্চিত হলেও কোনোটি কার লাশ সেটি শনাক্ত করা সম্ভব নয়। আগুনে পুড়ে লাশগুলো বিকৃত হয়ে গেছে। ডিএনএ পরীক্ষার পর কোনটি কার লাশ সেটি নিশ্চিত হওয়া যাবে।
মামলায় আসামি ২৩ জন, ব্যবস্থাপক গ্রেপ্তার
টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় শনিবার রাতে চার জনের নাম উল্লেখসহ ২৩ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করা হয়েছে। এ ঘটনায় আটক ব্যবস্থাপককে মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। বিরুদ্ধে মামলা করেছে পুলিশ।
গ্রেপ্তার রিসোর্টের ব্যবস্থাপক হলেন—জাহিদুল ইসলাম ওরফে সুমন। এছাড়া মো. তানভীর ও নেওয়াজ মোর্শেদের নাম রয়েছে আসামির তালিকায়। এদের মধ্যে প্রধান আসামি করা হয়েছে তানভীরকে।
উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান জানান, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় শনিবার রাতে ২৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে পুলিশ। এর মধ্যে রিসোর্ট মালিকদের একজন মো. তানভীরকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। মামলায় চারজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে রিসোর্টের মালিক মো. তানভীর ও নেওয়াজ মোর্শেদের নাম রয়েছে। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় শনিবার আটক রিসোর্টের ব্যবস্থাপক জাহিদুল ইসলাম ওরফে সুমনকে মামলাটিতে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
অনুমোদন ছাড়াই চলছিল রিসোর্ট
সরকারি অনুমোদন ছাড়াই টুপটুপ রিসোর্টটি পরিচালনা হচ্ছিল বলে জানান জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান। কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কউক) অনুমোদন নেওয়া হয়নি।
মেরিন ড্রাইভের পূর্বদিকে ২০ শতক জমির ওপর তিন তলা রিসোর্টটি নির্মাণ করা হয়েছিল। ভবনের চারপাশের দেয়াল ইট-পাথরের হলেও প্রথম ও দ্বিতীয় তলার মেঝে কাঠের পাটাতন দিয়ে করা। রেস্তোরাঁটির খুঁটিতে ব্যবহার করা হয়েছিল ঝাউ ও আকাশমণি গাছ।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শনিবার সকাল সাড়ে সাতটার দিকে রিসোর্টের ভেতরে বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। এরপর দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে উঠে রিসোর্টটিতে। রিসোর্টের দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় থাকা নারী-পুরুষেরা চিৎকার-দৌড়ঝাঁপ শুরু করেন। কয়েকজনকে দ্বিতীয়তলা থেকে নিচে লাফ দেন। এরপর সকাল ৮টার দিকে ফায়ার সার্ভিসের লোকজন ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণ আনেন। মূলত কাঠ দিয়ে তৈরি হওয়ায় এবং বাতাসের গতি থাকায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
অনুমোদন না থাকার পাশাপাশি অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থাও ছিল না রিসোর্টটিতে।
ডিজে
