আপনার কাছে একটি মজবুত গাড়ি আছে, আপনি ভালো গাড়ি চালাতেও পারেন। আপনাকে একটি নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছাতে হবে। সেখানে যাওয়ার জন্য চারটি রাস্তা আছে। আপনার কাছে চারটি রাস্তা সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য আছে। তথ্যগুলো হচ্ছে—যদি ‘ক’ রাস্তা দিয়ে যাত্রা করেন, তাহলে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবেন না, কারণ মাঝপথে একটি ভাঙা ব্রিজ আছে। আপনার যাত্রা অর্ধেক পথেই থেমে যাবে। যদি ‘খ’ রাস্তা দিয়ে যান, তাহলে একদল দুর্ধর্ষ ডাকাতের কবলে পড়বেন। ডাকাতেরা বড় বড় গাছ ফেলে পথ রোধ করে আপনার টাকাপয়সা সব কেড়ে নেবে এবং আপনার প্রাণনাশেরও হুমকি আছে। ‘গ’ রাস্তাটি খুব অরণ্যসংকুল, খানাখন্দ ও পাহাড়-টিলায় ভরা। এই রাস্তা দিয়েও আপনি কিছুতেই আপনার কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবেন না। শুধু ‘ঘ’ রাস্তাটি নির্বিঘ্ন। খুব অল্প সময়ে এবং নিরাপদে এই রাস্তা দিয়ে আপনি আপনার কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছে যেতে পারবেন। এখন আপনি কী করবেন? নিশ্চয়ই এই সিদ্ধান্তে উপনীত হবেন যে ‘ঘ’ রাস্তাটিই সঠিক এবং আপনি এই রাস্তা ধরেই যাত্রা শুরু করবেন।
বিজ্ঞাপন
‘ঘ’ রাস্তায় যাত্রা করার পর দেখলেন আপনার পেছনে আরো একদল মানুষ যাত্রা করেছে, যাদের আপনি পছন্দ করেন না। তারা আপনার সঙ্গে সারা জীবন শত্রুতা করেছে, আপনাকে গালমন্দ করেছে—বংশপরম্পরায় তারা আপনার চিরশত্রু। ঠিক এই মুহূর্তে আপনি কী করবেন? আপনি কি অপছন্দের মানুষের সঙ্গে এক রাস্তায় যেতে হবে বলে রাস্তা বদল করে বিপদসংকুল এবং অনিশ্চিত পথে পা বাড়াবেন?
কেন আপনার অপছন্দের লোকেরা বা আপনার শত্রুরা আপনার পেছনে যাত্রা করল? এর পরিণাম কী হতে পারে? এই প্রশ্নের দুটি উত্তর আছে। প্রথমটি ইতিবাচক, তারা হয়তো আপনার বিচক্ষণতার ওপর আস্থা রেখে আপনার পেছনে যাত্রা করেছে। সে ক্ষেত্রে তাদের সঙ্গে আপনার শত্রুতা দূর হয়ে যেতে পারে। তারা আপনার অনুসারী হয়ে যেতে পারে। আপনি যে নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছাতে চান, তারাও হয়তো সেই একই জায়গায় যেতে চায়। অর্থাৎ তারাও আপনার পথেরই অনুসারী হয়ে গেছে। এটি হচ্ছে ইতিবাচক দিক। এর একটি নেতিবাচক দিকও আছে। হয়তো তারা তাদের মন্দ চিন্তা থেকে বের হয়ে আসেনি। শুধু যাত্রাপথের সুবিধা পাওয়ার জন্য মন্দ চিন্তাগুলো লুকিয়ে রেখে আপনার পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে। আপনার দেখানো পথে গন্তব্যে পৌঁছে তারা আপনার ক্ষতি করবে, অর্থাৎ নতুন গন্তব্যে গিয়ে আপনি যা করতে চান, তারা আপনাকে তা করতে দেবে না।
এই নেতিবাচক সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও কি আপনি আপনার যাত্রাপথ বদল করে ‘ক’, ‘খ’ কিংবা ‘গ’ পথে যাত্রা করবেন? না, কোনো সচেতন মানুষই তা করবে না; কারণ ওই তিন পথে গন্তব্যে পৌঁছানো যাবে না, এটা আপনি নিশ্চিত জানেন।
যদিও বিখ্যাত মার্কিন কবি রবার্ট ফ্রস্ট লিখেছেন :
‘Two roads diverged in a wood, and I—
I took the one less traveled by…’
বনের ভেতর দিয়ে ছুটে যাওয়া রাস্তাটি যখন কিছুদূর গিয়ে দুভাগ হয়ে গেল, তখন কবি দুটি রাস্তার মধ্যে সেই রাস্তাটি নিলেন, যে রাস্তায় খুব কম মানুষের পা পড়েছে। কেন তিনি এই কাজ করলেন বা কেন এবং কখন আমরা এই কাজ করব? শুধু যখন বুঝতে পারব, এটিই সঠিক রাস্তা। সফল নেতৃত্বের বৈশিষ্ট্যগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখবেন, একজন সফল নেতা সবসময় নতুন দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেন, জাতিকে নতুন রাস্তা দেখান। দরকার হলে তিনি জাতিকে সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে ঝুঁকিপূর্ণ অজনপ্রিয় সিদ্ধান্তও নেন। আপনি যখন বুঝতে পারলেন, গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য জেনে-বুঝেই ‘কম মানুষ পা ফেলেছে’ এমন রাস্তায় আপনি পা রেখেছেন এবং পরে দেখলেন আপনার পেছনে আরো বহু মানুষ, তখন আপনি নিশ্চয়ই পথ বদলাবেন না। কারণ আপনি তো নির্জনতা খোঁজার জন্য পথে বের হননি, আপনি বের হয়েছেন একটি সুনির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য।
এই মুহূর্তে বাংলাদেশের এলিট সোসাইটির একদল মানুষ বলতে শুরু করেছেন—বুঝলাম, আওয়ামী লীগ খারাপ ছিল, বিএনপিও আওয়ামী লীগের মতো খারাপ হয়ে গেছে বা হয়ে যাচ্ছে। এখন এই দুই দল বাদ দিয়ে আমরা একটি ভালো রাষ্ট্র নির্মাণ করতে গেলে তো জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় এসে যাবে। আমরা তো জামায়াতের হাতে ক্ষমতা তুলে দিতে পারি না। তাহলে তো আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের রবীন্দ্রনাথ, আমাদের গানবাজনা সব বাতিল হয়ে যাবে। এটি একটি সম্ভাবনা বটে।
চব্বিশের বিপ্লবের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের মানুষের মনে বৈষম্যমুক্ত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ বিনির্মাণের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে—যেখানে চাঁদাবাজ ও সিন্ডিকেটের কাছে নগরবাসী জিম্মি হয়ে থাকবে না, এক বা দুই পরিবারের কাছে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতা কুক্ষিগত থাকবে না, দুর্নীতিগ্রস্ত প্রশাসন থাকবে না, প্রশাসনের এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের সব ক্ষেত্রে মেধার মূল্যায়ন ও বিকাশ হবে। এসব আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের জন্য রাষ্ট্রসংস্কারের যে রাস্তা, সেটিই বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সঠিক রাস্তা, এটি সবাই মানেন। কিন্তু সেই রাস্তায় জামায়াত এবং এনসিপি আমাদের সঙ্গে হাঁটছে বলে আমরা কি কাঙ্ক্ষিত রাস্তা বদল করে যে রাস্তায় গেলে রাষ্ট্রটি পুরোপুরি ব্যর্থ হবে, সেই রাস্তায় হাঁটব?
নিশ্চয়ই না। আমরা সঠিক পথেই থাকব, সেই রাস্তায় জামায়াত এলে স্বাগত জানাব, বিএনপি এলে স্বাগত জানাব। কে এলো, তা দেখে তো আমরা যাত্রাপথ বদল করব না। বাংলাদেশের মানুষ চব্বিশের গণভোটের মধ্য দিয়ে তাদের রাস্তা নির্দিষ্ট করে ফেলেছে এবং এটিই সঠিক রাস্তা। অতি সুস্পষ্টভাবে এটি হচ্ছে একটি জনবান্ধব রাষ্ট্র বিনির্মাণের জন্য কার্যকর সংস্কারের রাস্তা। এই রাস্তায় যারা আসবে, আমরা তাদের অবশ্যই সঙ্গে নেব।
যদি গন্তব্যে পৌঁছে দেখি, তারা কাঙ্ক্ষিত সংস্কারকাজে আমাদের সঙ্গে থাকছে না, তারাও চাঁদাবাজি করছে, অনৈতিক প্রশাসন পরিচালনা করছে, মেধার বদলে দলীয় আনুগত্যের মূল্যায়ন করছে, এমনকি আমাদের যে আউল-বাউল গান, কবিতা, জারি, সারি, কাওয়ালি ও ভাটিয়ালি গানের সংস্কৃতি আছে, বহু ধর্ম ও জাতিগোষ্ঠীর মানুষের মিলেমিশে বসবাসের ঐতিহ্য আছে, সেটি অস্বীকার করছে—তখন আমরা বুঝব, আমাদের জার্নি এখনো শেষ হয়নি, আমাদের আরো আন্দোলন, আরো সংগ্রাম, আরো যুদ্ধ করতে হবে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য। তখন আমরা পৌঁছে যাওয়া নতুন গন্তব্যকে একটি বিভ্রম হিসেবে গ্রহণ করব এবং প্রকৃত গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য আবারও পথে নামব।
ছাব্বিশের নির্বাচনও আমাদের গন্তব্য হতে পারত, কিন্তু তা হয়নি। এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আমরা যে গন্তব্যে পৌঁছেছি, তা খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বিভ্রমে পরিণত হয়েছে, যার ফলে আমাদের যাত্রাপথ দীর্ঘায়িত হয়েছে। কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে না পৌঁছানো পর্যন্ত আমাদের যাত্রাপথ কত দীর্ঘ হবে, আমরা তা জানি না; আরো কতবার গন্তব্যে পৌঁছে গেছি ভেবে আমরা বিভ্রান্ত হব, তাও জানি না। শুধু এটুকু জানি, চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জন না হওয়া পর্যন্ত আমাদের যাত্রাপথ ক্রমেই দীর্ঘ থেকে দীর্ঘায়িত হতে থাকবে। এ কথা নিশ্চিতভাবে জানি, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে আমাদের সবসময় সঠিক রাস্তায় থাকতে হবে এবং যাত্রা অব্যাহত রাখতে হবে।
লেখক: কবি ও রাষ্ট্রচিন্তক
