দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: পুঁজিবাজারে নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্তির পথ সহজ করতে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) নীতিমালায় বড় পরিবর্তন আনছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। নতুন নীতিমালায় দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো প্রকল্পের কোম্পানিগুলোর সঞ্চিত লোকসান থাকার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হবে। পাশাপাশি নিরীক্ষা প্রক্রিয়া আরও বিস্তৃত করা, ঋণ পরিশোধের শর্ত পরিবর্তন এবং শেয়ারের মূল্য নির্ধারণে আন্তর্জাতিক পদ্ধতি অনুসরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নীতিমালাটি চূড়ান্ত করে জনমত যাচাইয়ের জন্য শিগগিরই কমিশনের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে।
আজ সোমবার ‘ওয়ার্ল্ড ইনভেস্টর উইক ২০২৬’ উপলক্ষে আয়োজিত এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএসইসির চেয়ারম্যান মাসুদ খান এসব তথ্য জানান। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন (ডিবিএ) যৌথভাবে এ সেমিনারের আয়োজন করে।
সেমিনারে মাসুদ খান বলেছেন, পুঁজিবাজারে নতুন কোম্পানি আনার ক্ষেত্রে বিদ্যমান নীতিমালার কয়েকটি জায়গায় পরিবর্তন আনা হচ্ছে। বাজারসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে এমন নীতিমালা তৈরি করা হচ্ছে, যাতে একদিকে কোম্পানিগুলোর তালিকাভুক্তির সুযোগ বাড়ে, অন্যদিকে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থও সুরক্ষিত থাকে।’
বিএসইসি চেয়ারম্যান বলছিলেন, বিদ্যমান আইপিও নীতিমালায় সঞ্চিত লোকসান থাকা কোম্পানির তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তবে বিদ্যুৎকেন্দ্র, হোটেল, সিমেন্ট ও ইস্পাত কারখানার মতো বড় অবকাঠামো প্রকল্পে দীর্ঘ সময় ধরে বিনিয়োগ করতে হয়। এসব প্রকল্পের বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু হওয়ার আগপর্যন্ত লোকসান থাকা অস্বাভাবিক নয়।
এ কারণে সঞ্চিত লোকসান থাকার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে আইপিও নীতিমালায় পরিবর্তন আনা হচ্ছে বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘তবে এর অর্থ এই নয় যে যেকোনো লোকসানি কোম্পানি শেয়ারবাজারে আসার সুযোগ পাবে। নতুন নীতিমালায় কী শর্ত থাকবে, তা জনমতের জন্য প্রকাশিত খসড়া থেকে স্পষ্ট হবে।’
মাসুদ খান বলেন, বর্তমানে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ ও বিএসইসি যেসব নথিপত্র যাচাই করে, প্রস্তাবিত পরিবর্তনে সেগুলোর যাচাইয়ে নিরীক্ষকদের আরও বিস্তৃত দায়িত্ব দেওয়া হবে। এতে অনেকটা ফরেনসিক নিরীক্ষার মতো যাচাইপ্রক্রিয়া যুক্ত হবে। তার মতে, আইপিওতে আসতে চাওয়া কোম্পানির আর্থিক তথ্য ও প্রয়োজনীয় নথিপত্রের যথার্থতা যাচাই গুরুত্বপূর্ণ। নিরীক্ষার প্রক্রিয়া আরও কার্যকর হলে কোম্পানির আর্থিক অবস্থার বিষয়ে তুলনামূলকভাবে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাবেন বিনিয়োগকারীরা।
আইপিও নীতিমালায় ঋণ পরিশোধের শর্ত পরিবর্তনের কথাও জানান বিএসইসি চেয়ারম্যান। তার বক্তব্য অনুযায়ী, বিদ্যমান নিয়মে ঋণ পরিশোধের জন্য যে ৩০ শতাংশের শর্ত রয়েছে, সেটি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে কোম্পানিগুলোর ঋণের চাপ এবং দেশের সামগ্রিক আর্থিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে পরিবর্তনের মাত্রা নির্ধারণ করা হবে।
তিনি বলেন, অনেক কোম্পানি ইতোমধ্যে অতিরিক্ত ঋণনির্ভর হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে আরও শিথিলতা দিলে ভবিষ্যতে বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। এ ছাড়া শেয়ারের মূল্য নির্ধারণের পদ্ধতিতেও বড় পরিবর্তন আনা হচ্ছে। মাসুদ খানের দাবি, নতুন পদ্ধতিতে আন্তর্জাতিক মূল্যায়নপদ্ধতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখা হবে।
আইপিওর পাশাপাশি সরাসরি তালিকাভুক্তির বিধিমালাতেও পরিবর্তন আনা হচ্ছে বলে জানান বিএসইসি চেয়ারম্যান। তার বক্তব্য অনুযায়ী, বহুজাতিক কোম্পানি, ব্যাংক, বীমা কোম্পানি, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান এবং যেসব কোম্পানির বার্ষিক লেনদেন বা মোট সম্পদ এক হাজার কোটি টাকার বেশি, সেগুলো সরাসরি তালিকাভুক্তির যোগ্যতার আওতায় আসতে পারে।
তিনি জানালেন, ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি কোম্পানি আইপিও ও সরাসরি তালিকাভুক্তির বিষয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছে। নতুন নীতিমালার মাধ্যমে শেয়ারবাজারে ভালো কোম্পানি আনার সুযোগ বাড়বে। তবে সরাসরি তালিকাভুক্তির যোগ্যতা, প্রক্রিয়া ও শর্তাবলি চূড়ান্ত বিধিমালা প্রকাশের পরই নিশ্চিত হওয়া যাবে। পুঁজিবাজারের আকার বাড়াতে নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্তির পাশাপাশি বন্ড, ডেরিভেটিভস, রিয়েল এস্টেট ইনভেস্টমেন্ট ট্রাস্ট (রিট) ও এক্সচেঞ্জ ট্রেডেড ফান্ডের (ইটিএফ) মতো নতুন বিনিয়োগ পণ্য চালুর ওপর গুরুত্ব দেন মাসুদ খান।
তিনি বলেন, ‘শুধু পুঁজিবাজারের ওপর নির্ভর করে শেয়ারবাজারের গভীরতা বাড়ানো সম্ভব নয়। বিনিয়োগের পণ্য ও সুযোগের বৈচিত্র্য বাড়াতে হবে। ডেরিভেটিভস বাজার চালুর প্রস্তুতিতে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ অনেকটা এগিয়েছে। আগামী ছয় মাসের মধ্যে এ বাজার চালু হতে পারে।’
এ ছাড়া উন্মুক্ত ধরনের মিউচুয়াল ফান্ডের প্রসারে লাইসেন্সধারী এজেন্ট তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ক্যাপিটাল মার্কেটের (বিআইসিএম) মাধ্যমে প্রশিক্ষণ দিয়ে সনদ দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। মাসুদ খান আরও জানান, পুঁজিবাজারের উন্নয়নে নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্তি, বিনিয়োগ পণ্যের বৈচিত্র্য, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা সব ক্ষেত্রেই একযোগে কাজ করছে কমিশন।


