পতিত সরকারের রেখে যাওয়া আর্থিক খাতের বিশৃঙ্খলা, কর আদায়ে দুর্বলতা, বাড়তি দারিদ্র্য ও বেকারত্বের চাপ মোকাবিলায় পুনঃঅর্থায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি বলেন, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, সামাজিক সুরক্ষা বলয় সম্প্রসারণ, বন্ধ কলকারখানা চালু এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য বড় অঙ্কের অর্থায়ন প্রয়োজন। এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশনসহ (আইএফসি) বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
আজ সোমবার (১২ অক্টোবর) থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককের কুইন সিরিকিত ন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে (কিউএসএনসিসি) আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক সভায় যোগ দিতে এসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।
রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, অতীতের আর্থিক অনিয়ম, কর অব্যাহতির অপব্যবহার, কর জালিয়াতি এবং বিশেষ গোষ্ঠীকে পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়ার কারণে দেশের রাজস্ব আহরণ কমেছে। এর ফলে অর্থনীতিতে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। এর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি খাতে বাড়তি ব্যয়ের চাপ যুক্ত হয়েছে।
তিনি বলেন, সরকার উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া এসব সমস্যা মোকাবিলা করে অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার ও পুনর্গঠনের পথে এগিয়ে নিতে চায়। এ জন্য একদিকে সর্বজনীন জীবনচক্রভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা বলয় গড়ে তুলতে হবে, অন্যদিকে বিনিয়োগ বাড়িয়ে বন্ধ কলকারখানা চালু এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে।
ব্যাংক খাতে আস্থা ফেরানো অগ্রাধিকার
ব্যাংক খাতের সংকট প্রসঙ্গে উপদেষ্টা বলেন, অতীতের লুটপাট ও অনিয়মের দায় সাধারণ জনগণের ওপর চাপানো গ্রহণযোগ্য নয়। জনগণের অর্থের অপব্যবহারের কারণে যে ক্ষতি হয়েছে, তার খেসারত যেন সাধারণ মানুষকে দিতে না হয়, সে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
তিনি বলেন, ব্যাংকব্যবস্থায় আস্থা ফিরিয়ে আনা সরকারের অন্যতম দায়িত্ব। অতীতে ব্যাংক খাতে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি তৈরির আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল। এখন আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং প্রয়োজনীয় পুনঃঅর্থায়নের মাধ্যমে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ লক্ষ্যে আইএফসিসহ সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে আলোচনা চলছে।
রাজস্ব আহরণের দুর্বলতা তুলে ধরে তিতুমীর বলেন, বাংলাদেশের জিডিপির তুলনায় কর আদায়ের অনুপাত অত্যন্ত কম। আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি করের আওতা বাড়ানো এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় সংস্কার করা জরুরি। এর মাধ্যমে সামাজিক সুরক্ষা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ জনগুরুত্বপূর্ণ খাতে ব্যয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
বন্ধ কলকারখানা চালুতে বিশেষ অর্থায়ন
বন্ধ কলকারখানা পুনরায় চালু এবং উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, দেশে বিপুলসংখ্যক বেকার, বিশেষ করে শিক্ষিত ও তরুণ বেকার জনগোষ্ঠী রয়েছে। তাদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
এ ক্ষেত্রে বন্ধ শিল্পকারখানা চালু করার উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে তিতুমীর বলেন, এসব কারখানা পুনরায় সচল করা গেলে উৎপাদন বাড়বে, কর্মসংস্থান তৈরি হবে এবং অর্থনীতিতে গতি ফিরবে। এ জন্য বিশেষ অর্থায়নের ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে। বন্ধ কলকারখানা চালুর ক্ষেত্রে ৭ শতাংশ ঋণাত্মক সুদে অর্থায়নের কথা উল্লেখ করেন তিনি।
তাঁর মতে, শুধু আর্থিক সহায়তা দিয়ে অর্থনীতির সংকট কাটানো সম্ভব নয়। একই সঙ্গে ব্যাংক খাতে সুশাসন, বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ, রাজস্ব সংস্কার এবং কর্মসংস্থানভিত্তিক উন্নয়ন কৌশল বাস্তবায়ন করতে হবে।
সামাজিক সুরক্ষা ও কর্মসংস্থানে গুরুত্ব
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির অতীত অভিজ্ঞতা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা বলেন, স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে নতুন উদ্যোক্তা শ্রেণির বিকাশ, তৈরি পোশাকশিল্পের সম্প্রসারণ এবং বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। নব্বইয়ের দশকের পর আনুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিও অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে অবদান রেখেছে।
তিনি বলেন, অতীতের এসব অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এবারও কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও সামাজিক নিরাপত্তা সম্প্রসারণকে অর্থনৈতিক সংস্কারের কেন্দ্রে রাখতে হবে। দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার ব্যয় যাতে আরও না বাড়ে, সে বিষয়েও সরকার সতর্ক রয়েছে।
জ্বালানি মূল্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম বাড়লে দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন। এ কারণে জনগণের ওপর অতিরিক্ত চাপ না বাড়িয়ে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।
বহুপাক্ষিক সংস্থার অর্থায়ন ও বিদেশি বিনিয়োগের আশা
বাংলাদেশের সংস্কার কর্মসূচিতে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের সম্পৃক্ততার বিষয়টি তুলে ধরে তিতুমীর বলেন, বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি) এবং ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকসহ বিভিন্ন বহুপাক্ষিক সংস্থার সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ছে। এডিবির ৫ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন ঘোষণা এবং জ্বালানি খাতে ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকের সহায়তার বিষয়টিও তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার, পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং দ্রুত পুনর্গঠনের জন্য বহুমুখী উৎস থেকে অর্থায়ন প্রয়োজন। এর একটি বড় অংশ আসবে দেশীয় ও বিদেশি বিনিয়োগ থেকে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়ন সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়নে সহায়ক হবে।
বিদেশি বিনিয়োগের সম্ভাবনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, চীনা বিনিয়োগের পাশাপাশি জাপানের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে। গাড়ি উৎপাদন খাতে টয়োটা এবং বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক উদ্যোগে মারুবেনি করপোরেশনের আগ্রহের কথাও উল্লেখ করেন তিনি। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলের বাংলাদেশ সফর এবং সিলিকন ভ্যালির প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়টি তুলে ধরেন।
তিতুমীরের মতে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশে বিনিয়োগের নতুন সুযোগ তৈরি করা সম্ভব। সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, কর্মসংস্থান বাড়ানো এবং সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করে অর্থনীতিকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেওয়া।
