কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (অও) এখন আর কোনো বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি কিংবা ল্যাবরেটরির গবেষণার বিষয় নয়। আমাদের চোখের সামনেই এটি বিশ্ব অর্থনীতি, শিল্প উৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সাধারণ মানুষের কাজের ধরন বদলে দিচ্ছে। কয়েক বছর আগে চ্যাটজিপিটি (ঈযধঃএচঞ) বা জেমিনাই (এবসরহর) আসার পর বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে যে তোড়জোড় শুরু হয়েছিল, তা এখন আরও একধাপ এগিয়ে গেছে। এত দিন এআই দিয়ে আমরা কেবল তথ্য খুঁজতাম, ছবি আঁকাতাম কিংবা ই-মেইল লেখাতাম। কিন্তু এখন এসেছে ‘অ্যাজেন্টিক এআই (অমবহঃরপ অও)’, যা মানুষ ছাড়াই নিজে থেকে ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিতে পারে এবং নির্দিষ্ট লক্ষ্য ধরে ধরে বড় বড় প্রজেক্টের কাজ শেষ করতে পারে।
বিশ্বের উন্নত দেশগুলো যখন এই নতুন প্রযুক্তির ওপর ভর করে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াচ্ছে, তখন ১৭ কোটি মানুষের দেশ বাংলাদেশে এর প্রভাব কতটা পড়ছে? আমাদের দেশের সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ই-কমার্স খাত কিংবা সাধারণ মানুষ এই পরিবর্তনের সঙ্গে কতটুকু খাপ খাইয়ে নিতে পারছি, তা এখন খতিয়ে দেখা জরুরি।
বৈশ্বিক বাজার ও অর্থনীতির হিসাব-নিকাশ
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠানের তথ্য বলছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বাজার খুব দ্রুত বড় হচ্ছে। হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বিশ্বজুড়ে জেনারেটিভ এআই (এবহবৎধঃরাব অও)-ভিত্তিক ব্যবসার আকার দাঁড়ায় প্রায় ১৬১ বিলিয়ন ডলার। আগামী ২০৩৪ সালের মধ্যে এই প্রযুক্তিভিত্তিক অর্থনীতির আকার ১ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশ্বখ্যাত গবেষণাপ্রতিষ্ঠান প্রাইসওয়াটারহাউসকুপার্স (চঈি) তাদের এক প্রতিবেদনে দেখিয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্ব অর্থনীতিতে এআই প্রায় ১৫ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলার বাড়তি মূল্য যুক্ত করবে। এর সিংহভাগ সুবিধা তুলে নেবে চীন ও উত্তর আমেরিকার দেশগুলো। মাইক্রোসফট (গরপৎড়ংড়ভঃ), গুগল (এড়ড়মষব), মেটা (গবঃধ) কিংবা এনভিডিয়ার (ঘঠওউওঅ) মতো প্রযুক্তি জায়ান্ট কোম্পানিগুলো কেবল জিপিইউ (এচট) ডেটা সেন্টার ও লোকাল লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (খখগ) তৈরির পেছনেই শত শত কোটি ডলার ঢালছে। যুক্তরাষ্ট্র, সিঙ্গাপুর, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলোয় ব্যাংকিং, লজিস্টিকস, স্বাস্থ্যসেবা ও অনলাইন বাণিজ্যের অর্ধেকেরও বেশি কাজ এখন এআই অ্যালগরিদম দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে।
বিশ্ববাজারের তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থান : সিডিসিআরএর (ঈউঈজঅ) পর্যবেক্ষণ
বিশ্ব অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের প্রযুক্তি গ্রহণের হার তুলনা করলে এক বড় ধরনের তফাত চোখে পড়ে। আন্তর্জাতিক তথ্য সংস্থা গ্যালাপ (এধষষঁঢ়) এবং আমাদের দেশে ডিজিটাল বাণিজ্য নিয়ে গবেষণাকারী প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর ডিজিটাল কমার্স রিসার্চ অ্যান্ড অ্যাডভোকেসির (ঈউঈজঅ) যৌথ পর্যবেক্ষণ থেকে এক আশঙ্কাজনক চিত্র পাওয়া যায়।
সাধারণ মানুষের ধারণা : বাংলাদেশের প্রায় ৬৪ শতাংশ মানুষ এআই প্রযুক্তি সম্পর্কে এখনো পরিষ্কার কিছু জানেন না। সারা দেশের ১০ দশমিক ১ শতাংশের মতো প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ জীবনের কোনো না কোনো কাজে এআই ব্যবহার করেছেন।
দৈনিক ব্যবহারকারী : বাংলাদেশে প্রতিদিন নিয়মিত এআই ব্যবহার করেন, এমন মানুষের হার দেশের মোট জনসংখ্যার মাত্র ১ দশমিক ৮ শতাংশের নিচে।
প্রতিবেশীদের সঙ্গে তুলনা : সিঙ্গাপুরে প্রায় ৭৭ শতাংশ মানুষ এআইয়ের সঙ্গে পরিচিত এবং ৪৭ শতাংশ মানুষ প্রতিদিন এটি ব্যবহার করছেন। ভিয়েতনামে নিয়মিত এআই ব্যবহার করেন ৪৩ দশমিক ২ এবং ভারতে প্রায় ১৮ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ।
দক্ষতা ও মানসিকতা : ভিয়েতনামের ৯১ দশমিক ৪ শতাংশের বেশি মানুষ মনে করেন, প্রযুক্তি তাদের জীবন সহজ করবে। তবে বাংলাদেশে মাত্র ৩২ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ মনে করেন, এআই তাদের জীবনের মান উন্নত করবে। সিডিসিআরএর পর্যালোচনায় দেখা গেছে, মূলত কারিগরি প্রশিক্ষণের অভাব এবং চাকরি হারানোর ভয় থেকেই মানুষের মনে এই অনাস্থা ও অনাগ্রহ কাজ করছে।
বাংলাদেশে কোন কোন খাতে এআই ব্যবহার হচ্ছে?
জাতীয় পর্যায়ে পিছিয়ে থাকলেও আমাদের তরুণ সমাজ ও কিছু সুনির্দিষ্ট বাণিজ্যিক খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বাস্তব ব্যবহার শুরু হয়ে গেছে:
ডিজিটাল কমার্স ও অনলাইন ব্যবসা : সেন্টার ফর ডিজিটাল কমার্স রিসার্চ অ্যান্ড অ্যাডভোকেসির তথ্য মতে, বাংলাদেশের ছোট-বড় ই-কমার্স (ঊ-ঈড়সসবৎপব) ও ফেসবুকভিত্তিক বাণিজ্যের (ঋ-ঈড়সসবৎপব) প্রায় ৩৫ শতাংশ উদ্যোক্তা কাস্টমার চ্যাটবট, কনটেন্ট তৈরি, বিজ্ঞাপন চালানো এবং পণ্যের হিসাব রাখতে প্রারম্ভিক এআই টুল ব্যবহার করছেন। এতে করে উদ্যোক্তাদের ব্যবসার খরচ ২০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে এসেছে।
ফ্রিল্যান্সিং ও আইটি সেক্টর : দেশের সাড়ে ছয় লাখ সক্রিয় ফ্রিল্যান্সার ও সফটওয়্যার প্রকৌশলীদের বড় একটি অংশ এখন প্রতিদিনের কোডিং, ডিজাইন ও ক্লায়েন্ট সার্ভিসে এআই ব্যবহার করছেন। এতে তাদের কাজের দক্ষতা ও গতি ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
ব্যাংকিং ও মোবাইল ফাইন্যান্স : বিকাশ ও নগদের মতো এমএফএস (গঋঝ) সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রাহকের অনলাইন জালিয়াতি সনাক্ত করতে (ঋৎধঁফ উবঃবপঃরড়হ) এবং চ্যাটবটের মাধ্যমে প্রায় ৯০ শতাংশ গ্রাহক সেবা দিতে এআই প্রযুক্তির সাহায্য নিচ্ছেন।
পোশাকশিল্প ও অন্যান্য : আমাদের তৈরি পোশাক (জগএ) খাতে সুতা ও কাপড়ের অপচয় কমাতে এবং মান নিয়ন্ত্রণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাচালিত সফটওয়্যার ব্যবহার হচ্ছে, যা ভুলের পরিমাণ প্রায় ৫ থেকে ৭ শতাংশ কমিয়ে এনেছে।
কর্মসংস্থান ও শ্রমবাজারের ঝুঁকি?
বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার মতে, এআইয়ের কারণে সারা বিশ্বে প্রায় ৪০ শতাংশ চাকরির ধরন বদলে যাবে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য এটি বেশ উদ্বেগের বিষয়।
আইএমএফ ও সিডিসিআরএর যৌথ পর্যবেক্ষণ থেকে জানা যায়, বাংলাদেশে প্রচলিত ডেটা এন্ট্রি, সাধারণ কল সেন্টার সেবা, প্রাথমিক হিসাবরক্ষণ এবং ফ্রিল্যান্সিংয়ের শুরুর দিকের প্রায় ৪২ শতাংশ কাজ ধীরে ধীরে এআই স্বয়ংক্রিয়ভাবে করে ফেলবে। ফলে শুধু কায়িক শ্রমের কাজের চেয়ে প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারা দক্ষ কর্মীর চাহিদা বাজারে দ্রুত বাড়ছে।
সরকারের উদ্যোগ ও ‘জাতীয় এআই নীতি’
সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে সরকারি পর্যায় থেকেও প্রযুক্তিগত নীতিমালায় জোর দেওয়া হচ্ছে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (ওঈঞ) বিভাগ ‘জাতীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নীতি (ঘধঃরড়হধষ অও চড়ষরপু) ২০২৫-৩০’ খসড়া চূড়ান্ত করেছে।
জাতীয় বাংলা এলএলএম : নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষায় এবং সরকারের ডেটা সুরক্ষায় প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ কোটি টাকা খরচে একটি জাতীয় ‘বাংলা লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (ইধহমষধ খখগ)’ ও এআই ইনোভেশন ফান্ড তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
আইনি সুরক্ষা : সাইবার অপরাধ, ডেটা চুরি ও ভুয়া ছবি বা ভিডিও তৈরি ঠেকাত চার স্তরের ঝুঁকিভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ আইন ও ‘জাতীয় এআই এথিক্স বোর্ড’ গঠনের কাজ চলছে।
আগামীর বাংলাদেশ : সিডিসিআরএর চারটি সুপারিশ
বাংলাদেশ যেন কেবল বিদেশি প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে না থাকে; বরং নিজেরা এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পারে, সে জন্য সেন্টার ফর ডিজিটাল কমার্স রিসার্চ অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি চারটি প্রধান নীতিগত প্রস্তাব করেছে :
এক. ব্যাপকভিত্তিক প্রশিক্ষণ (গধংং টঢ়ংশরষষরহম) : প্রথাগত সিলেবাস বদলে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় থেকে এআই ও প্রযুক্তিভিত্তিক প্রশিক্ষণ শুরু করা।
দুই. ছোট উদ্যোক্তাদের সহায়তা (ঝগঊ ঝঁঢ়ঢ়ড়ৎঃ) : ই-কমার্স ও এসএমই খাতের উদ্যোক্তারা যাতে কম খরচে এআই প্রযুক্তি ব্যবহার ও শেখার সুযোগ পান, সে জন্য সরকারি প্রণোদনা দেওয়া।
তিন. প্রান্তিক মানুষের কাছে প্রযুক্তি পৌঁছানো : শহরের বাইরে গ্রাম ও কৃষি খাতের জন্য সহজ বাংলা ভয়েসভিত্তিক (কণ্ঠস্বরে পরিচালিত) এআই সেবা চালু করা।
চার. গবেষণা ও সঠিক নীতি : প্রযুক্তি যেভাবে দ্রুত বদলাচ্ছে, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাস্তবমুখী আইনি কাঠামো ও সরকারি-বেসরকারি যৌথ গবেষণা নিশ্চিত করা।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কোনো সাময়িক বিষয় নয়, এটি বিশ্ব অর্থনীতির নতুন ভিত্তি। এই পরিবর্তনকে আটকে রাখা সম্ভব নয়; বরং একে সঠিক নিয়মে কাজে লাগানোই একমাত্র বুদ্ধিমত্তার পরিচয়। সরকারি সিদ্ধান্তগুলো দ্রুত বাস্তবে রূপ দেওয়া এবং আমাদের তরুণ সমাজকে সময়োপযোগী দক্ষতায় গড়ে তোলার ওপরই নির্ভর করছে দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি। এআই সরাসরি মানুষের চাকরি কাড়বে না, তবে এআই ব্যবহার জানা মানুষেরা পিছিয়ে পড়া মানুষদের পেছনে ফেলে এগিয়ে যাবেÑ এটিই আজকের দিনের সবচেয়ে বড় সত্য।
