সিরাজগঞ্জের একটি গ্রামের বেশকিছু লোক ভিক্ষাবৃত্তির সাথে জড়িত থাকায় গ্রামের নাম বদলে হয়েছে ফকিরপাড়া।
উল্লাপাড়া উপজেলার উধুনিয়া ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বাবুলিদহ গ্রাম। একসময় যে গ্রাম ছিলো নিছক একটি প্রত্যন্ত জনপদ, সময়ের সাথে উল্লেখিত গ্রামের মানুষের ভিক্ষাবৃত্তির কারণে স্থানীয়দের কাছে তার পরিচয় ‘ফকির পাড়া’নামে। সরকারি কাগজ-কলমে গ্রামের নাম বাবুলিদহ, অথচ এলাকার মানুষের মুখে মুখে এখন ‘ফকিরপাড়া’ নামে পরিচিত।
এলাকাবাসী জানায়, প্রায় ৩০ বছর আগে মনতার সরদার নামের এক লোক এই গ্রামে রাস্তার সাথে সরকারি জায়গায় এসে বাড়ি করেন। তিনি অসুস্থতার কারণে কাজকর্ম করতে না পারায়, বেছে নেন ভিক্ষাবৃত্তি। তিনি মারা যাওয়া পর থেকে তার ছেলে, মেয়ে স্ত্রী ও ছেলের বৌও এখন গ্রামের গ্রামের ভিক্ষা বৃত্তি করে জীবন-যাপন করছে। শুধু তারা নয়, এই গ্রামের প্রায় দুই হাজার মানুষ বসবাস করলেও অনেকেই নারী-পুরুষ ভিক্ষাবৃত্তি করে তাদের জীবন-যাপন করছে।
ভিক্ষুক নুরনবী সরদার (৪৫) বলেন, বাপ করেছে, বর্তমানে আমি ভিক্ষা করি। বাপের পথেই হাঁটছি। কথাগুলো বলার সময় চোখে মুখে ছিল জীবনের দীর্ঘ ক্লান্তির ছাপ। ভিক্ষা যেন তার কাছে কোনো পেশার নাম নয়, বরং বংশ পরম্পরায় পাওয়া এক বাস্তবতা।
আফসার আলী অপর একজন জানায়, আমার বাড়ি, জমিজমা নেই, সরকারি জায়গায় বসবাস করছি। কোন কর্ম নেই, এই কারণে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভিক্ষা করি। ভ্যান-রিক্সা চালনোর সুযোগ থাকলেও রাস্তা-ঘাট না থাকায় এই পেশা বেছে নিয়েছে। এই গ্রামের শুধু আমি না, আমাদের পরিবারে আমার মা, স্ত্রী, বোনও এই পেশা বেছে নিয়েছি। সরকারীভাবে কোন সাহায্য-সহযোগিতা পেলে অবশ্যই এই পেশা থেকে দুরে সড়ে স্বাভাবিক জীবন যাপন করবো। শুধু শারীরিক সমস্যা নয়, আর্থিক অনটনও ঘিরে ধরেছে তাকে। এখন ভিক্ষা করে সংসার চলে তার।
ভিখারীনি আলফা বেগম (৪৫) বলেন, “বাপ ভিক্ষা করেছে, এখন আমিও ভিক্ষা করি। সংসার চালানোর আর কোনো উপায় নেই।” স্বামী মারা গেছেন অনেক আগে। ছেলে মেয়েদের নিয়ে মহা বিপদে আছি। ছেলে মেয়েদের মুখে এক মুঠ খাবার তুলে দেওয়ার জন্য বাধ্য হয়েই নেমে পড়েন ভিক্ষাবৃত্তিতে।
স্থানীয় ইউপি সদস্য মো: জিলিম উদ্দিন জানান, দীর্ঘদিন ধরে এই এলাকার বেশ কয়েকটি পরিবারের মানুষ জীবিকা নির্বাহের জন্য ভিক্ষাবৃত্তির ওপর নির্ভরশীল। কেউ বাড়ি বাড়ি গিয়ে হাত পাতেন, কেউ আবার দূর-দূরান্তে ছুটে যান মানুষের দ্বারে দ্বারে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম একই পথে হাঁটতে হাঁটতে ভিক্ষাবৃত্তি যেন অনেকের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে।
তিনি আরো বলেন, রাস্তাঘাট না থাকায় এদের ছেলে-মেয়েরা লেখাপড়া সহ জীবিকা অর্জনের কোন পথ এদের নেই। তাই বাধ্য হয়ে এরা ভিক্ষাবৃত্তি বেছে নিয়েছে। এই কারণে ইউনিয়নের সবাই এই গ্রামটিকে ফকিরপাড়া বলে চেনেন। এই গ্রামে নেই কোন ভালো স্কুল, মাদ্রাসা ও কলেজ। শুধু একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে, তাও আবার ঠিকমত ছাত্র-ছাত্রী হয় না। এই গ্রামের শিক্ষার হার অত্যন্ত কম।
এলাকার সচেতন মহল মনে করেন, কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হলে বদলে যেতে পারে এই অবহেলিত জনপদের মানুষের জীবন। প্রশিক্ষণ, ক্ষুদ্র ঋণ, কর্মসংস্থান কিংবা ছোট ব্যবসার সুযোগ পেলে অনেকেই ভিক্ষাবৃত্তি ছেড়ে স্বাবলম্বী হতে পারেন।প্রত্যন্ত এই গ্রামের মানুষকে যোগাযোগ ব্যাবস্থাই ভিক্ষা বৃত্তিতে নামিয়েছে বলেও জানান তারা ।
উল্লাপাড়া উপজেলা সমাজ সেবা অফিসার মো: রফিকুল ইসলাম জানান, আমি সরজমিনে তদন্ত করে দেখেছি এদের মধ্যে কিছুসংখ্যক লোক প্রকৃত পক্ষেই ভিক্ষাবৃত্তির সাথে জড়িত। অন্যদিকে কিছু বেকার লোকও জীবিকার জন্য ভিক্ষাবৃত্তি করে থাকে। এদের পুনঃবাসন এর কথা বলা হলেও এখনো কেউ আসেনি। তিনি আরও বলেন, এদের মধ্যে বেশ কয়েকজ কে বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা কার্ড প্রদান করা হয়েছে।
সিরাজগঞ্জ জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান খাঁন বলেন, এ ব্যাপারে উল্লাপাড়া উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তাকে পরিদর্শন ও প্রতিবেদন প্রদানের কথা বলা হয়েছে। প্রতিবেদন পেলেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
অন্য এলাকা থেকে আসা লোকজন এই গ্রামটিকে ‘ফকিরপাড়া’ নামে চেনে। অনেকের কাছে নামটি হয়তো হাস্যরসের বিষয়, কিন্তু এই নামের আড়ালে রয়েছে অসংখ্য মানুষের দুঃখ-কষ্ট, অভাব আর বেঁচে থাকার সংগ্রাম।
