ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু রোববার সতর্ক করে বলেছেন, ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলের প্রতি বৈরী সরকার ক্ষমতায় আসতে পারে। এতে ওয়াশিংটনের সঙ্গে দেশটির সামরিক সহায়তা ও কৌশলগত সম্পর্ক হুমকির মুখে পড়তে পারে। তিনি বলেন, ইসরায়েলকে নতুন আন্তর্জাতিক জোট গড়ে তুলতে হবে।
একই সঙ্গে আগামী এক দশকে প্রতিরক্ষা খাতে অতিরিক্ত প্রায় ৪৫০ বিলিয়ন শেকেল বরাদ্দের পরিকল্পনার কথা জানান তিনি।
ইসরায়েলের ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনের নয় দিন আগে এক অনুষ্ঠানে নিজের নিরাপত্তানীতি তুলে ধরার সময় এসব মন্তব্য করেন নেতানিয়াহু। এর কয়েক ঘণ্টা পরই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চলমান নির্বাচনী প্রচারণায় প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে নেতানিয়াহুর পুনর্নির্বাচনের প্রতি সমর্থন জানান।
নেতানিয়াহু বলেন, ‘দুই বছর পর এমন একজন প্রেসিডেন্ট ক্ষমতায় আসতে পারেন, তিনি পুরুষ বা নারী–যে কেউ হতে পারেন, যিনি ইসরায়েলের প্রতি অত্যন্ত বৈরী হবেন। তখন আপনারা কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দেবেন? যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কীভাবে সম্পর্ক বজায় রাখবেন? আর এর বাইরেও কী ধরনের সমাধান প্রয়োজন হবে?’
ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সরকার ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তা দেয়া বন্ধ করতে পারে, এমনকি দেশটির বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও অস্ত্র নিষেধাজ্ঞায় যোগ দিতে পারে–এমন আশঙ্কার প্রেক্ষাপটে এসব মন্তব্য করেন নেতানিয়াহু।
নেতানিয়াহু বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে সম্ভাব্য বড় পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুতি নেয়ার পাশাপাশি ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনের বাকি বছরগুলো কাজে লাগিয়ে ইসরায়েলকে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে হবে।
তিনি বলেন, ‘প্রথমত, আগামী দুই বছর এবং তার পরের দুই বছর–ভালো ও খারাপ সব পরিস্থিতিতেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘দ্বিতীয়ত, অন্য দেশগুলোর সঙ্গে জোট গড়ে তুলতে হবে। এ অঞ্চলের এবং এর বাইরের অনেক দেশের সঙ্গে আমি এখন সেই কাজই করছি। ভারত ছোট কোনো দেশ নয়, আরও অনেক দেশ রয়েছে।’
ইসরায়েলের মিত্রদেশের পরিসর বাড়ানোর আরেকটি সুযোগ হিসেবে লাতিন আমেরিকার রাজনৈতিক পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করেন তিনি।
নেতানিয়াহু বলেন, ‘লাতিন আমেরিকায় বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটছে। আর মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে ব্রাজিলেও বিশাল পরিবর্তন আসতে পারে। আমাদের মিত্রদেশের পরিসর বাড়াতে হবে এবং এমন সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে, যা আমাদের সবার কাছে মূল্যবান করে তুলবে।’
ইউরোপের দেশগুলোর সঙ্গে ইসরায়েলের টানাপোড়েনপূর্ণ সম্পর্ক নিয়েও কথা বলেন নেতানিয়াহু। তার অভিযোগ, কিছু দেশের সরকার প্রকাশ্যে ইসরায়েলের নিন্দা জানালেও দেশটির সঙ্গে সহযোগিতা অব্যাহত রাখতে চায়।
তিনি বলেন, ‘যেসব দেশ আমাদের নিন্দা করে, তাদের আবার বেশ সাহসও আছে বলতে হবে। তারা আমাদের নিন্দা করে, আবার আমাদের কাছেই আসে। আমি তাদের বলি, এটা আপনাদের ওপর নির্ভর করছে। আপনারা কীভাবে আচরণ করছেন, তার ওপরই সবকিছু নির্ভর করছে।’
নেতানিয়াহুর যুক্তি, ইসরায়েলের এখনো কূটনৈতিক প্রভাব রয়েছে। তবে ওয়াশিংটনসহ বিভিন্ন দেশের রাজধানীতে নীতিগত পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলতে আন্তর্জাতিক বিষয়ে যথেষ্ট দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা প্রয়োজন হবে।
রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেয়া পৃথক এক পোস্টেও যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পরিবর্তনের সম্ভাবনার বিষয়টি পরোক্ষভাবে স্বীকার করেন নেতানিয়াহু। ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনের বাকি সময়কে ইসরায়েলের কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনের সুযোগ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
নেতানিয়াহু লেখেন, ‘আমার বন্ধু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মেয়াদের আর দুই বছর বাকি আছে। সব ক্ষেত্রে আমাদের বড় লক্ষ্যগুলো পূরণ করার জন্য এটাই উপযুক্ত সময়।’
প্রতিরক্ষা ব্যয়ের বিষয়ে নেতানিয়াহু বলেন, আগামী এক দশকে ইসরায়েলের সামরিক সক্ষমতা শক্তিশালী করতে তিনি প্রায় ৪৫০ বিলিয়ন শেকেল বরাদ্দ দিতে চান। এর আগে অতিরিক্ত প্রায় ৩৫০ বিলিয়ন শেকেলের একটি প্রতিরক্ষা ব্যয় প্যাকেজে সম্মতি দেয়া হয়েছিল বলে আগের প্রতিবেদনগুলোতে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর ভবিষ্যৎ আকার নিয়ে নেতানিয়াহু বলেন, সামরিক বাহিনীর পরিসর বাড়াতে হবে। তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ প্রযুক্তির অগ্রগতি জনবলের প্রয়োজনীয়তা কিছুটা কমাতে পারে।
বড় বা ছোট—ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) আকার যে বাড়াতে হবে, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘আইডিএফের আকার বাড়বে, তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে অনেক ক্ষেত্রে জনবলের প্রয়োজন কমে আসায়, তা আমাদের প্রত্যাশিত হারে বাড়বে না। তবু সামরিক বাহিনীর আকার বাড়াতে হবে। আর সে জন্য অবশ্যই অর্থ ও জনবল–দুটিই বরাদ্দ করতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সামরিক সক্ষমতা ও শক্তি নিশ্চিত করতে আমি এ খাতে প্রায় ৪৫০ বিলিয়ন শেকেল বিনিয়োগ করছি।’
ইরান প্রসঙ্গে নেতানিয়াহু বলেন, তার ভাষায়, দেশটির ওপর ভয়াবহ সামরিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতি করা হলেও ইরানি শাসনব্যবস্থা এখনো হুমকি হয়ে রয়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, তেহরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি পুনর্গঠন, অন্যান্য অপ্রচলিত অস্ত্র তৈরি এবং আঞ্চলিক মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর নেটওয়ার্ক পুনরায় গড়ে তোলার চেষ্টা করবে।
তিনি বলেন, ‘ক্যান্সারের মতো, ওই শাসনব্যবস্থা টিকে থাকা পর্যন্ত এর অবসান হবে না। তারা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করবে, পারমাণবিক কর্মসূচি নতুন করে শুরু করবে, অন্যান্য অপ্রচলিত অস্ত্রের কর্মসূচি পুনরায় চালু করবে এবং তাদের অক্ষ পুনর্গঠন করবে।’
নেতানিয়াহুর দাবি, ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েল ইতোমধ্যে তাদের প্রায় ৯০ শতাংশ লক্ষ্য অর্জন করেছে। তিনি ইরানের নেতৃত্বকে মারাত্মকভাবে দুর্বল বলে বর্ণনা করেন।
তিনি বলেন, ‘মানুষ রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করছে না কেন? কারণ, এই মুহূর্তে তাদের হত্যা করা হচ্ছে। সরাসরি হত্যা করা হচ্ছে। তারা নিজেদের দেশের হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করছে বা আহত করছে। এই শাসনব্যবস্থার চরিত্রই এমন।’
এরপর নেতানিয়াহু স্পষ্টভাবে বলেন, ইরানের সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করাই তার নীতির লক্ষ্য।
তিনি বলেন, ‘শাসনব্যবস্থার পতন ঘটাতে আমাদের পরিকল্পনা অত্যন্ত বিস্তৃত এবং দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এটাই আমার পরিকল্পনা। নিরাপত্তা সংস্থাগুলোকে আমি এই নির্দেশই দিয়েছি এবং এটাই ঘটবে।’
রাশিয়ার সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক নিয়েও কথা বলেন নেতানিয়াহু। তিনি এই সম্পর্ককে ধারাবাহিক সহযোগিতার পরিবর্তে পরস্পরবিরোধী জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা সম্পর্ক হিসেবে বর্ণনা করেন।
তিনি বলেন, ‘প্রয়োজন হলেই আমরা কথা বলি। রাশিয়ার নিজস্ব স্বার্থ রয়েছে, আর আমাদের রয়েছে ইসরায়েল রাষ্ট্রের স্বার্থ। এই স্বার্থগুলো সব সময় এক হয় না। কখনো কখনো সেগুলো পরস্পরের সঙ্গে সংঘাতেও জড়ায়।’
ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার সঙ্গে ইরানের সহযোগিতাকে স্বার্থের সংঘাতের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন নেতানিয়াহু। এ ছাড়া ইসরায়েলবিরোধী বট নেটওয়ার্কের বিষয়টিও তোলেন তিনি। তার অভিযোগ, এসব নেটওয়ার্ক চরম ইহুদিবিদ্বেষী বক্তব্য ছড়িয়ে দিচ্ছে।
নেতানিয়াহু বলেন, ‘আমরা এসব বিষয় নিয়ে কথা বলি এবং তা খুব স্পষ্টভাবেই বলি। আর সহযোগিতার সুযোগ থাকলে আমরা সেটিও করি।’
