চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে খোলাবাজারে বিক্রয় (ওএমএস) কর্মসূচিতে চাল ও আটা বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা এবং ভর্তুকি বরাদ্দ কমানোর সিদ্ধান্তে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ খাদ্য নিরাপত্তা নেটওয়ার্ক (খানি)। শহরের নিম্ন আয়ের মানুষের খাদ্য নিরাপত্তার বিষয় বিবেচনা করে সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি। সোমবার (১৯ অক্টোবর) খানি বাংলাদেশ থেকে পাঠানো এক প্রেস বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয়।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, গত ১৫ অক্টোবর খাদ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে চলতি অর্থবছরের ওএমএস লক্ষ্যমাত্রা উপস্থাপন করা হয়। এতে চাল বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা ২ লাখ ৪০ হাজার টন এবং আটা ৩ লাখ ৫০ হাজার টন নির্ধারণ করা হয়। গত অর্থবছরে ৩ লাখ ৪ হাজার টন চাল ও ৪ লাখ ৪৯ হাজার টন আটা বিক্রি হয়েছিল। অর্থাৎ চাল প্রায় ২১ শতাংশ এবং আটা ২২ শতাংশ কমানো হয়েছে, যা সম্মিলিতভাবে প্রায় ১ লাখ ৬৩ হাজার টন কম। ওএমএসের ভর্তুকি বরাদ্দ ৪ হাজার ৯৬ কোটি টাকা থেকে কমিয়ে ৩ হাজার ৪১১ কোটি টাকা করা হয়েছে। এছাড়া চলতি অর্থবছরে খাদ্য খাতে মোট ভর্তুকি ৭ হাজার ৯৭৩ কোটি টাকা করা হয়েছে, যা আগের বছর ছিল ৮ হাজার ৫০৪ কোটি টাকা।
খানি জানায়, ওএমএস মূলত শহরের নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য পরিচালিত হয়। শহরে দরিদ্রদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি বেশ সীমিত। তথ্য অনুযায়ী, শহরে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ২০১০ সালের ৭৪ লাখ থেকে বেড়ে ২০২২ সালে ৭৯ লাখে দাঁড়িয়েছে। আর ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের সংখ্যা ১ কোটি ৩৩ লাখ থেকে বেড়ে ১ কোটি ৫৩ লাখ হয়েছে। দেশের অতিদরিদ্র পরিবারগুলোর প্রায় অর্ধেক কোনো সামাজিক সুরক্ষা পায় না, আর শহরে এই হার প্রায় ৬৪ শতাংশ।
সংগঠনটি জানায়, সম্প্রতি প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে দারিদ্র্যের কঠিন চিত্র উঠে এসেছে। লিভিং স্ট্যান্ডার্ড সার্ভে ২০২৫ অনুযায়ী, গত এক বছরে মৌলিক জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে শহরাঞ্চলের ৪০ দশমিক ১৯ শতাংশ পরিবার ঋণ নিয়েছে। জাতীয় পর্যায়ে পরিবারের গড় মাসিক আয় ৩৩ হাজার ৫১৩ টাকা হলেও গড় ব্যয় ৩৫ হাজার ৩১১ টাকা। সিটি করপোরেশন এলাকায় গড় মাসিক ব্যয় সর্বোচ্চ ৪৬ হাজার ৭৭৮ টাকা। গত সেপ্টেম্বর মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ।
ওএমএসে প্রতি কেজি চাল ৩০ টাকায় বিক্রি হয়, যেখানে খোলাবাজারে মোটা চাল ৫০ থেকে ৫৫ টাকা এবং মাঝারি চাল ৫৬ থেকে ৬৫ টাকা। ওএমএসের সুবিধা না পেলে নিম্ন আয়ের একটি পরিবারকে কেজিতে অন্তত ২০ থেকে ২৫ টাকা বেশি খরচ করতে হবে। কম বরাদ্দ করা ৬৪ হাজার টন চালের হিসেবে পরিবারগুলোর অতিরিক্ত ব্যয় হবে প্রায় ১২৮ থেকে ১৬০ কোটি টাকা। আটার হিসাব যোগ করলে এই খরচের পরিমাণ আরো বাড়বে।
এর ফলে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো খাদ্যের পরিমাণ বা পুষ্টিমান কমাতে বাধ্য হতে পারে। এটি শিশু, গর্ভবতী নারী ও বয়স্কদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। একই সঙ্গে বাড়তি খরচ মেটাতে গিয়ে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো মৌলিক খাতে ব্যয় কমানো কিংবা ঋণ নেয়ার প্রবণতা বাড়বে। এছাড়া বাজারে চালের দাম স্থিতিশীল রাখতে ওএমএস ভূমিকা রাখে। সম্প্রতি চালের দাম নতুন করে বাড়ায় সরকারি সরবরাহ কমলে বাজারে সংকট তৈরি হতে পারে।
খাদ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে ওএমএস বরাদ্দের সিদ্ধান্তটি চূড়ান্ত নয় এবং প্রয়োজনে অতিরিক্ত বরাদ্দের সুযোগ রয়েছে। এ অবস্থানকে স্বাগত জানিয়ে খানি জানায়, বর্তমান মূল্যস্ফীতির বাজারে সেই প্রয়োজন তৈরি হয়েছে।
পরিস্থিতি মোকাবেলায় খানি ৪টি মূল সুপারিশ পেশ করেছে। প্রথমত, ওএমএসে চাল ও আটার লক্ষ্যমাত্রা এবং ভর্তুকি অন্তত গত বছরের পর্যায়ে রাখা ও মূল্যস্ফীতি অনুযায়ী সমন্বয় করা। দ্বিতীয়ত, শহর ও শিল্পাঞ্চলের বস্তি এলাকায় বিক্রি কেন্দ্রের সংখ্যা বাড়ানো। তৃতীয়ত, ডিলার পর্যায়ে ডিজিটাল তদারকি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। চতুর্থত, শহরের দরিদ্র ও বাস্তুচ্যুত মানুষের জন্য সুনির্দিষ্ট সামাজিক সুরক্ষা কৌশল তৈরি করা।
সংগঠনটি মনে করে খাদ্য মানুষের মৌলিক অধিকার। তাই অর্থনৈতিক ধীরগতি ও মূল্যস্ফীতির সময় সুবিধা কমানো নয়, বরং নিরাপত্তা কর্মসূচি জোরদার করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
—বিজ্ঞপ্তি
