ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো ও পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী নতুন পরিকল্পনা তৈরি করেছে। এসব পরিকল্পনায় বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী অ-পারমাণবিক বোমা হিসেবে পরিচিত ‘মাদার অব অল বম্বস’ ব্যবহারের বিকল্পও রাখা হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে সামরিক অভিযান পুনরায় শুরুর নির্দেশ দিলে আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে কিংবা পরে এসব হামলা চালানো হতে পারে বলে জানিয়েছেন পরিকল্পনার বিষয়ে অবগত একাধিক মার্কিন কর্মকর্তা।
সিএনএনের এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জিবিইউ-৪৩/বি ম্যাসিভ অর্ডন্যান্স এয়ার ব্লাস্ট (এমওএবি) নামের এই বোমা ইরান যুদ্ধে প্রথমবারের মতো ব্যবহার করা হলে তা সংঘাতকে আরও তীব্র করে তুলতে পারে। তবে ইরানের গভীর ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংস করা কিংবা যুদ্ধের কৌশলগত ভারসাম্য বদলে দেওয়ার ক্ষেত্রে বোমাটি কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে মার্কিন সামরিক পরিকল্পনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের মধ্যেই সংশয় রয়েছে।
ছয় মাসের বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রের বোমা হামলা চললেও ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সমঝোতার স্পষ্ট অগ্রগতি নেই। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রে যুদ্ধটি ব্যাপকভাবে অজনপ্রিয় হয়ে ওঠায় রিপাবলিকানদের মধ্যে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচন নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে যুদ্ধের অবসান ঘটানোর জন্য ট্রাম্পের ওপর রাজনৈতিক চাপও বাড়ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য হামলার বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে হোয়াইট হাউসে আলোচনা চলছে। ট্রাম্প প্রকাশ্যে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে নতুন হামলা চালাবেন না বলে জানালেও তাঁর কয়েকজন উপদেষ্টা ব্যক্তিগত আলোচনায় জানিয়েছেন, এই অবস্থান চূড়ান্ত কি না, তা নিয়ে তাঁরা নিশ্চিত নন।
এক মার্কিন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে নতুন হামলার পরিকল্পনা তৈরির নির্দেশ দিয়েছেন। এসব পরিকল্পনায় এমওএবি ব্যবহারের বিষয়টিও রয়েছে। হামলার পর বিজয় ঘোষণা করে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি কমিয়ে আনার সম্ভাবনাও আলোচনায় এসেছে বলে সূত্রটি জানিয়েছে।
আরেকটি সূত্র সিএনএনকে জানিয়েছে, পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনসহ ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে হামলার পরিকল্পনাতেও এমওএবি ব্যবহারের কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ধারণা, ওই স্থানে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপাদান সংরক্ষিত রয়েছে। তবে এসব স্থাপনার প্রকৃত অবস্থা ও অবস্থান নিয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া তথ্য সীমিত।
গভীর ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় কার্যকারিতা নিয়ে সংশয়
এমওএবি বিশাল এলাকাজুড়ে ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে সক্ষম হলেও গভীর ভূগর্ভস্থ স্থাপনা ধ্বংসের জন্য এটি বিশেষভাবে তৈরি নয় বলে জানিয়েছেন সামরিক পরিকল্পনা সম্পর্কে অবগত সূত্রগুলো। জিপিএস-নির্দেশিত এই বোমা প্রায় নয়টি শহুরে ব্লকের সমপরিমাণ এলাকায় বিস্ফোরণের প্রভাব ফেলতে পারে। তবে গ্রানাইটের একাধিক স্তরে সুরক্ষিত বলে ধারণা করা পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনের মতো স্থাপনার গভীরে পৌঁছে সেগুলো ধ্বংস করার সক্ষমতা বোমাটির নাও থাকতে পারে।
সামরিক পরিকল্পনা সম্পর্কে অবগত এক সূত্রের ভাষ্য, এমওএবি মূলত বিশাল এলাকাজুড়ে ধ্বংসযজ্ঞ চালানো ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব তৈরির অস্ত্র; গভীর ভূগর্ভে প্রবেশ করে লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করার জন্য এটি নকশা করা হয়নি।
তবে ইরানকে কূটনৈতিকভাবে চাপ দিতে বোমাটি মনস্তাত্ত্বিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, এ ধরনের হামলা ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা বা যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত সামরিক লক্ষ্য অর্জন নিশ্চিত করার জন্য যথেষ্ট নাও হতে পারে। তবু পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান পুনরায় শুরু না করেও সংঘাতের বর্তমান পরিস্থিতি বদলানোর একটি বিকল্প হিসেবে এটি বিবেচিত হচ্ছে।
এমওএবি ব্যবহারে বেসামরিক হতাহতের ঝুঁকি নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষ করে জনবসতির কাছাকাছি জ্বালানি অবকাঠামো বা অন্য স্থাপনায় হামলা হলে বিস্ফোরণের ব্যাপক প্রভাব সামরিক লক্ষ্যবস্তুর বাইরেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
স্থল অভিযানের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করতে বড় ধরনের স্থল অভিযান প্রয়োজন হতে পারে বলে মনে করেন প্রশাসনের ভেতরে ও বাইরের কিছু বিশ্লেষক। তবে এ ধরনের অভিযানে হাজারো মার্কিন সেনার প্রাণহানির ঝুঁকি রয়েছে। ট্রাম্প ইরানে মার্কিন সেনা পাঠানোর বিষয়ে আগ্রহী নন বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন।
একই সময়ে যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার এমন একটি পথ খুঁজছে হোয়াইট হাউস, যাতে ট্রাম্প অন্তত প্রতীকী বিজয় দাবি করতে পারেন এবং কূটনৈতিক সমঝোতার সম্ভাবনাও নষ্ট না হয়। এর মধ্যে হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করার বিষয়ে সমঝোতার সম্ভাবনাও রয়েছে বলে সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
পেন্টাগনের পরিকল্পনা সম্পর্কে অবগত আরেকটি সূত্র জানিয়েছে, এমন কিছু হামলার বিকল্প তৈরি করা হয়েছে, যা মূলত বড় ধরনের শক্তি প্রদর্শনের মতো হতে পারে। এসব হামলায় যুদ্ধ শুরুর ঘোষিত লক্ষ্য পূরণ না হলেও ট্রাম্পকে সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসার রাজনৈতিক সুযোগ করে দেওয়াই এর একটি উদ্দেশ্য হতে পারে।
হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা সিএনএনকে বলেছেন, সম্ভাব্য বা বিদ্যমান সংবেদনশীল সামরিক পরিকল্পনা নিয়ে তারা মন্তব্য করে না। তবে ইরান যেন কখনো পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে ট্রাম্প সব বিকল্প খোলা রেখেছেন। পেন্টাগনের এক কর্মকর্তা বলেছেন, প্রেসিডেন্ট ও প্রতিরক্ষামন্ত্রীর নির্দেশনা বাস্তবায়ন এবং যেকোনো পরিস্থিতিতে মিশনের সাফল্য নিশ্চিত করতে সামরিক বাহিনী বিভিন্ন ধরনের অভিযান পরিকল্পনা করে।
আগেও ব্যবহৃত হয়েছে বোমাটি
ইরাক যুদ্ধের সময় তৈরি এমওএবি মাটিতে আঘাত করার আগেই বিস্ফোরিত হয়ে চারদিকে ব্যাপক বিস্ফোরণপ্রভাব সৃষ্টি করে। ২০০৩ সালে পরীক্ষার শেষ পর্যায়ে মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, অস্ত্রটি তৈরির অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল মনস্তাত্ত্বিক অভিযান—যাতে বিশাল বিস্ফোরণের ভয়াবহতা শত্রুপক্ষের সেনাদের মনোবল ভেঙে দেয় এবং তাদের আত্মসমর্পণে প্রভাবিত করে।
বড় সেনাদল, সামরিক সরঞ্জাম ও মাটির ওপরের শক্তিশালী বাঙ্কার ছিল বোমাটির প্রাথমিক লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে। পরে গুহা ও টানেলের মতো অপেক্ষাকৃত নরম ভূস্তরের নিচে থাকা লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধেও এর ব্যবহার বিবেচনায় নেওয়া হয়।
২০১৭ সালে ট্রাম্প তাঁর প্রথম মেয়াদে আফগানিস্তানে ইসলামিক স্টেটের (আইএস) অবস্থানের বিরুদ্ধে এমওএবি ব্যবহারের অনুমোদন দেন। আফগান কর্মকর্তাদের সে সময়ের তথ্য অনুযায়ী, ওই হামলায় আইএসের ৩৬ যোদ্ধা নিহত হয়। ধ্বংস হয় তিনটি ভূগর্ভস্থ টানেল, অস্ত্র ও গোলাবারুদ। সে সময় আফগান ও মার্কিন কর্মকর্তারা কোনো বেসামরিক নাগরিক নিহত না হওয়ার কথা জানিয়েছিলেন।
তবে ওই হামলার পরও লক্ষ্যবস্তুর জন্য এত বড় বোমার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। ইরানের বিরুদ্ধে এটি ব্যবহার করা হলে একই ধরনের প্রশ্ন আবারও সামনে আসতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সূত্র: সিএনএন
এমএস/
