ফ্রান্সে সহিংস বিক্ষোভের পর বিভিন্ন শহরে কারফিউ, চাপে ম্যাক্রনের সরকার
ফন্ট সাইজ:
100%
জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও সরকারের নীতির প্রতিবাদে দেশজুড়ে বিক্ষোভের পর ফ্রান্সের কয়েকটি শহরের নির্দিষ্ট এলাকায় কারফিউ জারি করা হয়েছে। গত শনিবারের বিক্ষোভে সংঘর্ষ, দোকানপাটে লুটপাট ও সরকারি স্থাপনায় ভাঙচুরের ঘটনায় নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে স্থানীয় প্রশাসনকে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে সরকার।
সোমবার প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু জানান, সহিংসতার ঝুঁকি রয়েছে এমন এলাকায় আংশিক ও স্থানীয়ভাবে কারফিউ জারির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে আপাতত পুরো প্যারিসে কারফিউ জারির পরিকল্পনা নেই। পরিস্থিতির অবনতি হলে জরুরি অবস্থা জারির বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হতে পারে বলে জানিয়েছেন তিনি।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্যারিসের প্লাস দ্য লা রিপাবলিক ও লে আল এলাকার আশপাশে রাত ১১টা থেকে মঙ্গলবার ভোর ৬টা পর্যন্ত কারফিউ জারি করা হয়। এ ছাড়া রাজধানীর নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় রাত ৮টা থেকে বিক্ষোভ ও জনসমাবেশ নিষিদ্ধ করা হয়। উত্তর ফ্রান্সের লিল, দোয়ে, ওয়াতিনিয়ে ও দেন্যাঁ শহরে অপ্রাপ্তবয়স্কদের চলাচলে রাতের বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। দক্ষিণের মার্সেই শহরে জনসমাবেশ ও বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
গত ১৭ অক্টোবর শনিবার ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানির উচ্চমূল্য, জনসেবার সংকট এবং সরকারের নীতির প্রতিবাদে ব্যাপক বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। এতে শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন। তবে কয়েকটি স্থানে বিক্ষোভ সহিংসতায় রূপ নেয়। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, দোকানপাটে লুটপাট এবং সরকারি স্থাপনায় অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সহিংসতার ঘটনায় প্রায় ২ হাজার ৪০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ঘটনায় একজন বিক্ষোভকারীর হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মৃত্যু হয়। আহত হয়েছেন প্রায় এক হাজার পুলিশ ও নিরাপত্তা সদস্য। তবে হতাহত ও গ্রেপ্তারের সংখ্যা সম্পর্কে পরবর্তী হালনাগাদ তথ্য প্রকাশিত হলে হিসাব পরিবর্তিত হতে পারে।
মধ্য ফ্রান্সের লিমোজ শহরে পৌর ভবনে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। মার্সেইয়ে পৌর ভবনেও হামলা চালানো হয়। প্যারিসের অভিজাত বিপণিকেন্দ্র প্লাস ভঁদোম এলাকায় একাধিক বিলাসপণ্যের দোকানের সামনের অংশ ও কাচ ভাঙচুর করা হয়। এসব ঘটনায় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
ফ্রান্সের ক্ষুদ্র ব্যবসা খাতের প্রতিনিধিদের হিসাবে, বিক্ষোভ ও সহিংসতায় প্রায় তিন হাজার দোকান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের সহায়তা এবং কর্মীদের চাকরি রক্ষায় সরকার বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী লেকর্নু জানিয়েছেন, মঙ্গলবার থেকে ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মীদের জন্য আংশিক বেকারত্ব সহায়তার ব্যবস্থা করা হবে। পাশাপাশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সহিংসতার পর নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়েছেন প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রনের সরকার। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনিয়েজ পদত্যাগের প্রস্তাব দিলেও ম্যাক্রন তা গ্রহণ করেননি। বরং নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতা পর্যালোচনা, পুলিশের প্রস্তুতি জোরদার এবং গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহে ঘাটতি থাকলে তা চিহ্নিত করার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী লেকর্নু সহিংসতার পেছনে উগ্র বামপন্থী গোষ্ঠীগুলোর ভূমিকার অভিযোগ তুলেছেন। তবে বামপন্থী নেতা জঁ-লুক মেলঁশোঁ এ অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ দাবি করেছেন। অন্যদিকে সরকার জানিয়েছে, শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ জানানোর অধিকার বজায় রেখেই লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও জননিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে ফ্রান্সের পর্যটন খাতেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ১৯ অক্টোবর প্যারিসের বিভিন্ন এলাকায় ভাঙচুরের চিহ্ন, ক্ষতিগ্রস্ত দোকানপাট ও পোড়া গাড়ি দেখা যায়। কয়েকটি পর্যটনস্থলে প্রবেশে বিঘ্ন ঘটায় দর্শনার্থীদের ভোগান্তি হয়। পর্যটন খাতের প্রতিনিধিরা আশঙ্কা করছেন, সহিংসতার ঘটনা দীর্ঘস্থায়ী হলে বিদেশি পর্যটকদের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তবে পর্যটন চাহিদায় সামগ্রিক প্রভাব কতটা পড়বে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
ফ্রান্সে আগামী শনিবার নতুন করে বিক্ষোভের কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন আয়োজকেরা। ফলে পরিস্থিতি আবারও উত্তপ্ত হয়ে ওঠার আশঙ্কা রয়েছে। সরকার ও স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, সম্ভাব্য সহিংসতা ঠেকাতে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হবে।
২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে এই পরিস্থিতি ম্যাক্রনের সরকারের জন্য নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। জীবনযাত্রার ব্যয়, জননিরাপত্তা এবং সরকারি পরিষেবার মান নিয়ে মানুষের অসন্তোষ রাজনৈতিক বিতর্ককে আরও তীব্র করতে পারে। এখন সরকারের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পুনরুদ্ধারে সহায়তা এবং সাধারণ মানুষের অসন্তোষের কার্যকর সমাধান খুঁজে বের করা।
