ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে গ্রিসে অনিয়মিত অভিবাসন ঠেকাতে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে গ্রিস ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)।
বিশেষ করে লিবিয়া ও মিশর হয়ে বাংলাদেশি নাগরিকদের ইউরোপে প্রবেশ ঠেকাতে বাংলাদেশের সহযোগিতা চাইছে ইউরোপীয় কর্তৃপক্ষ। এ লক্ষ্যে ফ্লাইট চলাচলে কড়াকড়ি, অভিবাসীদের পরিচয় শনাক্তকরণ এবং তাদের দেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে ঢাকার ওপর চাপ বাড়ানো হচ্ছে।
শুক্রবার গ্রিসের সংবাদমাধ্যম ‘কাথিমেরিনি’ এবং শনিবার অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক গ্রিক সংবাদমাধ্যম ‘গ্রিক সিটি টাইমস’-এর দুটি পৃথক প্রতিবেদনে এসব উদ্যোগের বিস্তারিত উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে গ্রিসের ক্রিট দ্বীপে এক হাজারের বেশি অনিয়মিত অভিবাসী পৌঁছেছেন। তাদের বড় একটি অংশ দ্বীপটির দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের ইয়ারাপেত্রা উপকূলে অবতরণ করেন। এর ফলে সমুদ্রপথে অনিয়মিত অভিবাসীদের আগমন নিয়ে গ্রিক প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গ্রিসে সামগ্রিকভাবে অনিয়মিত অভিবাসীদের আগমন কিছুটা কমেছে। ২০২৫ সালের অগাস্ট থেকে চলতি বছর জুলাই পর্যন্ত এক বছরে দেশটিতে অনিয়মিত অভিবাসীদের মোট আগমন ৬২ হাজার থেকে কমে ৪২ হাজারে নেমে এসেছে। তবে সামগ্রিক সংখ্যা কমলেও লিবিয়া থেকে ক্রিটে পৌঁছানোর সমুদ্রপথটি ইউরোপের জন্য ‘সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ’ রুটগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে।
বর্তমানে লিবিয়ায় পাঁচ লাখেরও বেশি আশ্রয়প্রার্থী ও অনিয়মিত অভিবাসী অবস্থান করছেন বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। এ ছাড়া লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলের স্থানীয় প্রশাসন ও কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে প্রত্যাশিত সহযোগিতা না পাওয়ায় সমুদ্রপথে মানবপাচার ও অনিয়মিত অভিবাসন ঠেকানো গ্রিসের জন্য আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
গ্রিক কর্তৃপক্ষ সুদানসহ অন্যান্য যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ থেকে আসা শরণার্থীদের সঙ্গে বাংলাদেশি নাগরিকদের অভিবাসনকে একভাবে দেখছে না। তাদের যুক্তি, সুদানের নাগরিকেরা গৃহযুদ্ধ ও জীবনহানির ঝুঁকি থেকে বাঁচতে দেশ ছাড়ছেন।
অন্যদিকে, বাংলাদেশি অভিবাসীদের ক্ষেত্রে যুদ্ধ বা রাজনৈতিক সংঘাতের কারণে বাস্তুচ্যুত হওয়ার বিষয়টি প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে না। গ্রিক কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিতে, তাদের অনেকে উন্নত জীবন ও কাজের সন্ধানে আন্তর্জাতিক বিমানপথ ব্যবহার করে প্রথমে বিভিন্ন দেশে যান, পরে সেখান থেকে সমুদ্রপথে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টা করেন।
প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশিরা প্রথমে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন উপসাগরীয় দেশে যান। সেখান থেকে সংযোগকারী ফ্লাইটে মিশরের কায়রো কিংবা লিবিয়ার বেনগাজি ও ত্রিপোলি বিমানবন্দরে পৌঁছান। তারপর তাদের কেউ কেউ মানবপাচারকারী চক্রের সহায়তায় লিবিয়ার উপকূল থেকে ট্রলার বা নৌকায় ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে গ্রিসের ক্রিট দ্বীপে প্রবেশের চেষ্টা করেন। বিপজ্জনক এই সমুদ্রযাত্রায় অভিবাসীদের জীবনহানির ঝুঁকিও থাকে।
এই পথে অনিয়মিত অভিবাসন ঠেকাতে বাংলাদেশ, উপসাগরীয় দেশ এবং উত্তর আফ্রিকার দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বিতভাবে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নিচ্ছে গ্রিস ও ইইউ। এক্ষেত্রে বাংলাদেশিদের ভ্রমণপথ, পরিচয় শনাক্তকরণ এবং অনিয়মিতভাবে গ্রিসে প্রবেশকারীদের প্রত্যাবাসনের বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে।
‘গ্রিক সিটি টাইমস’-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “লিবিয়া ও মিশর হয়ে অনিয়মিত অভিবাসনের পথ বন্ধ করতে বাংলাদেশ সরকারের সহযোগিতা চাইছে গ্রিস ও ইইউ।” অন্যদিকে, ‘কাথিমেরিনি’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “অনিয়মিত প্রবেশ ঠেকাতে লিবিয়া ও মিশরগামী ফ্লাইটের ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপের জন্য বাংলাদেশকে অনুরোধ ও চাপ দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে অনিয়মিতভাবে গ্রিসে প্রবেশকারীদের পরিচয় শনাক্ত করে দেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে ঢাকার সঙ্গে সমন্বয় বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।”
প্রতিবেদন অনুযায়ী, পরিকল্পিত পদক্ষেপগুলোর একটি হলো মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে কায়রো, বেনগাজি ও ত্রিপোলিগামী ফ্লাইটে বাংলাদেশি যাত্রীদের যাতায়াতের ক্ষেত্রে ট্রানজিট সুবিধা ও টিকিটিং ব্যবস্থায় কড়াকড়ি আরোপ করা। এ বিষয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর সহযোগিতা চাইছে এথেন্স। তবে এসব বিধিনিষেধ কার্যকর হয়েছে কি না, সে বিষয়ে প্রতিবেদনে সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই।
আরেকটি উদ্যোগের লক্ষ্য, অনিয়মিতভাবে ইতোমধ্যে গ্রিসে প্রবেশ করা বাংলাদেশি নাগরিকদের দ্রুত পরিচয় শনাক্ত করা এবং তাদের দেশে ফেরত পাঠানো। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে সরাসরি সমন্বয় বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। বিশেষ চার্টার্ড বিমানে করে এসব অভিবাসীকে সরাসরি ঢাকায় ফেরত পাঠানোর বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এ ধরনের প্রত্যাবাসন পরিকল্পনা চূড়ান্ত অনুমোদন পেয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
পাশাপাশি, অনিয়মিত অভিবাসীদের আগমন বন্ধ করতে গ্রিক সরকার তাদের আশ্রয়ের আবেদন গ্রহণ বা বিবেচনার স্বাভাবিক আইনি প্রক্রিয়া সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার মতো পদক্ষেপের কথাও ভাবছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। তবে এ ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়েছে কি না, কারা এর আওতায় পড়বেন এবং কীভাবে তা কার্যকর করা হবে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত রূপরেখা এখনো স্পষ্ট নয়।
