- Anandabazar
- Photogallery
- US military have no major win in last 81 years, what is weakening America dgtl
কোরিয়া, ভিয়েতনাম থেকে আজকের ইরান, গত ৮১ বছরে কেন কোনও যুদ্ধ জেতেনি ‘সুপার পাওয়ার’ আমেরিকা?
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে লাগাতার যুদ্ধে জড়িয়েছে আমেরিকা। কিন্তু, চূড়ান্ত বিজয় প্রায় নেই বললেই চলে। কেন এই দুরবস্থা?
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ১২ অক্টোবর ২০২৬ ১৫:০৭
লাগাতার ইরানকে ধুলোয় মিশিয়ে ফেলার হুমকি দিচ্ছিন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর জেরে সাবেক পারস্যে ফের আক্রমণের ঝাঁজ বৃদ্ধির বাড়ছে জল্পনা। যদিও তাতে জয়ের সম্ভাবনা কতটা, তা নিয়ে বেশ সন্দিহান বিশেষজ্ঞমহল। কারণ তাঁদের বক্তব্য, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর কোনও লড়াইয়েই নির্ণায়ক জয় পায়নি ‘সুপার পাওয়ার’ আমেরিকা। উল্টে লাগাতার সংঘর্ষে জড়িয়ে বিপুল অর্থ এবং লোকক্ষয়, দুটোই করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
০২ / ২০
উদাহরণ হিসেবে কোরীয় যুদ্ধের কথা বলা যেতে পারে। ১৯৫০ সালে শুরু হওয়া ওই লড়াইয়ে সরাসরি হস্তক্ষেপ করে আমেরিকা। কিন্তু, তা সত্ত্বেও তিন বছর পেরিয়ে অমীমাংসিত ভাবে শেষ হয় সংঘর্ষ। শুধু তা-ই নয়, ওই সময় বহু চেষ্টা করেও ডেমোক্রেটিক পিপল্স রিপাবলিক অফ কোরিয়ার (পড়ুন, উত্তর কোরিয়া) অস্তিত্ব মুছে দিতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র। উল্টে পরবর্তী দশকগুলিতে আরও শক্তিশালী হয়ে আত্মপ্রকাশ করে তারা।
০৩ / ২০
১৯৫৩ সালে সংঘর্ষবিরতি চুক্তি হওয়ার পর থেকে ধাপে ধাপে উত্তর কোরিয়ার উপর বিপুল নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দেয় আমেরিকা। ২১ শতক আসতে আসতে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে একরকম ‘একঘরে’ হয়ে পড়ে পিয়ংইয়ং। এই পরিস্থিতিতে সবাইকে চমকে দিয়ে ২০০৬ সালের সেপ্টেম্বরে আচমকাই পরমাণু অস্ত্রের সফল পরীক্ষা চালায় ডিপিআরকে (ডেমোক্রেটিক পিপল্স রিপাবলিক অফ কোরিয়া)। আণবিক হামলার আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্রও তৈরি করেছে তারা।
০৪ / ২০
উত্তর কোরিয়া পরমাণু শক্তিধর হোক, তা কখনওই চায়নি আমেরিকা। সেই কারণেই নিষেধাজ্ঞার চাপে পিয়ংইয়ংকে পিষে দেওয়ার ছক কষে মার্কিন প্রশাসন। যদিও তাতে এতটুকু সাফল্য পায়নি ওয়াশিংটন। উল্টে, প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় নতুন এক ‘দৈত্যে’র জন্ম দিয়ে ফেলেছে তারা। তার আতঙ্কে কাঁটা হয়ে আছে যুক্তরাষ্ট্রের দুই ‘বন্ধু’ রাষ্ট্র, জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়া। সরকারি ভাবে দ্বিতীয়টি আবার রিপাবলিক অফ কোরিয়া (আরওকে) নামে পরিচিত।
০৫ / ২০
দুই কোরিয়াকে বাদ দিলে অবশ্যই বলতে হবে ভিয়েতনাম যুদ্ধের কথা। ১৯৫৫ সালে শুরু হলেও গোড়ায় এই লড়াইয়ে সরাসরি অংশগ্রহণ করেনি আমেরিকা। প্রথম পর্যায়ে সামরিক উপদেষ্টা ও আর্থিক সহায়কের ভূমিকা পালন করছিল তারা। কিন্তু, ৬০-এর দশকের মাঝামাঝি সেই নীতি থেকে সরে এসে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশটিতে সেনা পাঠাতে থাকে যুক্তরাষ্ট্র। সেখানকার বিভিন্ন এলাকায় লাগাতার বোমাবর্ষণ করে মার্কিন বায়ুসেনা।
০৬ / ২০
১৯৬৫ সালে থেকে টানা আট বছর মরণপণ লড়েও ভিয়েতনামে শেষ হাসি হাসতে ব্যর্থ হয় ওয়াশিংটন। তত দিনে একাধিক ‘যুদ্ধাপরাধের’ দাগ লেগে গিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ফৌজের গায়ে। সরকারি মতে, এই সংঘর্ষে প্রাণ হারান ৫৮,০০০-এর বেশি মার্কিন সৈনিক। এই ইস্যুতে আমেরিকার অভ্যন্তরে চড়ছিল অসন্তোষের পারদ। ফলে কিছুটা বাধ্য হয়েই ১৯৭৩ সালে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশটি থেকে বাহিনী প্রত্যাহার করে তারা।
০৭ / ২০
মার্কিন ফৌজ ঘরে ফেরার পর ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে উঠতে ভিয়েতনামের বেশি সময় লাগেনি। লড়াই থামতেই সেখানে প্রতিষ্ঠিত হয় কমিউনিস্ট সরকার। সালটা ছিল ১৯৭৫। চরম মতাদর্শগত বিরোধ থাকা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত সেটা মেনে নেয় আমেরিকা। এর মধ্যেই ১৯৭৯ সালে সামরিক অভিযান চালিয়ে আফগানিস্তান দখল করে সোভিয়েত ফৌজ। সঙ্গে সঙ্গেই হিন্দুকুশের কোলের দেশটি থেকে তাদের তাড়াতে ‘ছায়াযুদ্ধে’ নামে যুক্তরাষ্ট্র।
০৮ / ২০
গত শতাব্দীর ৭০ ও ৮০-এর দশকে আফগানিস্তানকে সোভিয়েত দখলমুক্ত করতে পাকিস্তানের সাহায্য নেয় আমেরিকা। মার্কিন অর্থানুকূল্যে কট্টরপন্থী একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী গড়ে তোলে ইসলামাবাদ। তারা পরিচিতি পায় ‘মুজ়াহিদিন’ বা ধর্মযোদ্ধা নামে। এদের দিয়েই হিন্দুকুশের কোলের দেশটিতে গেরিলা যুদ্ধ চালাতে থাকে যুক্তরাষ্ট্র। ফলে ১৯৮৯ সালে সেখান থেকে চম্পট দেয় মস্কোর বাহিনী। ওয়াশিংটনের এই গোপন অভিযানের নাম ছিল ‘অপারেশন সাইক্লোন’।
০৯ / ২০
আফগানিস্তানে মার্কিন গুপ্তচরবাহিনী সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির (সিআইএ) সাফল্য বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। মুজ়াহিদিনের ছদ্মবেশে অচিরেই সেখানে জন্ম হয় ‘আল-কায়দা’ নামের এক কুখ্যাত জঙ্গিগোষ্ঠীর। ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক শহরে ভয়ঙ্কর এক ‘ফিদায়েঁ’ হামলা চালায় তারা। যাত্রীবাহী বিমান ছিনতাই করে ধাক্কা মারে বিশ্ববাণিজ্য কেন্দ্রের (ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার) জোড়া ইমারতে। ফলে চোখের নিমেষে ধুলোয় মিশে যায় ওই দুই গগনচুম্বী অট্টালিকা।
১০ / ২০
আমেরিকার ভিতরে হওয়া ভয়ঙ্কর এই সন্ত্রাসী হামলায় নিহতের সংখ্যা ছিল প্রায় ৩,০০০। এই ঘটনার তদন্তে উঠে আসে ‘আল-কায়দা’র প্রতিষ্ঠাতা ওসামা বিন-লাদেনের নাম। আফগানিস্তানে তাঁর লুকিয়ে থাকার খবর পায় মার্কিন গোয়েন্দা বাহিনী। ফলে তাঁকে খতম করতে হিন্দুকুশের কোলের রাষ্ট্রটির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে যুক্তরাষ্ট্র। এর নাম দেওয়া হয় ‘অপারেশন এন্ডুরিং ফ্রিডম’। এই সামরিক অভিযানে ওয়াশিংটনের দখলে আসে কাবুল।
১১ / ২০
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, গোটা আফগানিস্তান দখলে এলেও লাদেনের টিকিও ছুঁতে পারেনি আমেরিকা। শেষ পর্যন্ত ২০১১ সালে পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদে কমান্ডো অভিযান চালিয়ে তাঁকে খতম করে মার্কিন ফৌজ। এর পর ২০২১ সালে কাবুল থেকে বাহিনী প্রত্যাহার করে যুক্তরাষ্ট্র। ফলে সেখানে ক্ষমতায় ফেরে তালিবান। ওয়াশিংটনের চোখে তারা আর একটি সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠী। তা ছাড়া, ২০ বছর লড়েও ‘আল-কায়দা’কে নিশ্চিহ্ন করতে পারেনি তারা।
১২ / ২০
১৯৯১ সালে কুয়েতের স্বাধীনতার নামে ইরাকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে আমেরিকা। যুক্তরাষ্ট্রের সেই সেনা অভিযানের নাম ছিল ‘অপারেশন ডেজ়ার্ট স্টর্ম’। ২০০৩ সালে ফের বাগদাদে চড়াও হয় মার্কিন ফৌজ। এ বার তাদের হাতে গ্রেফতার হন কিংবদন্তি ইরাকি প্রেসি়ডেন্ট সাদ্দাম হুসেন। বিচারে মৃত্যুদণ্ড হয় তাঁর। তা সত্ত্বেও পশ্চিম এশিয়ার আরব রাষ্ট্রটিতে ওয়াশিংটনের সাফল্যকে নজরকাড়া বলতে নারাজ বিশ্লেষকদের একাংশ।
১৩ / ২০
সাবেক সেনাকর্তাদের অনেকেই মনে করেন, বাগদাদ জয় করেও সেখান থেকে কিছুই পায়নি আমেরিকা। উল্টে সাদ্দামের পতনে সেখানে গজিয়ে ওঠে ‘ইসলামিক স্টেট’ বা দায়েশের মতো কুখ্যাত জঙ্গিগোষ্ঠী। পাশাপাশি, পরবর্তী বছরগুলিতে আরব রাষ্ট্রটির বিভিন্ন এলাকায় প্রভাব বিস্তারে সক্ষম হয় ইরান। বর্তমানে সেখানে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে তেহরান মদতপুষ্ট একাধিক বিদ্রোহী দল। ফলে, তাঁদের হাতে ইরাকের দু’টুকরো হওয়ার বাড়ছে আশঙ্কা।
১৪ / ২০
১৯৯৯ সালে মার্কিন নেতৃত্বাধীন ইউরোপীয় সামরিক জোট নেটোর হামলার মুখে পড়ে কসোভো থেকে বাহিনী প্রত্যাহারে বাধ্য হয় যুগোস্লাভিয়া। কিন্তু, তাতে রাজনৈতিক ভাবে ওই এলাকাটির যে ভাগ্য খুলেছে, এমনটা নয়। বরং স্বাধীনতা ঘোষণা করতে পরবর্তী ন’বছর সময় লেগে যায় তাদের। শেষে ২০০৯ সালে ওই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলেও আন্তর্জাতিক ভাবে রাষ্ট্রের মর্যাদা পায়নি কসোভো। একে সার্বিয়ার একটি অংশ বলেই মনে করে চিন ও রাশিয়া।
১৫ / ২০
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইজ়রায়েলকে সঙ্গে নিয়ে ইরান আক্রমণ করে বসে আমেরিকা। যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ গোটা পশ্চিম এশিয়াকে ভয়ঙ্কর এক যুদ্ধের মধ্যে ঠেলে দিয়েছে বললে অত্যুক্তি হবে না। সংশ্লিষ্ট লড়াইয়ে ইতিমধ্যেই তেহরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের মুখে পড়ে একগুচ্ছ যুদ্ধবিমান, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ইন্টারসেপ্টর রকেট এবং রেডার হারিয়েছে মার্কিন ফৌজ। তাদের সামুদ্রিক ড্রোনও আটক করেছে সাবেক পারস্যের সেনা।
১৬ / ২০
ইরান যুদ্ধে এখনও পর্যন্ত ৪,২৬০ কোটি ডলারের বেশি খরচ করে ফেলেছে আমেরিকা। অথচ, লড়াই থেকে তাদের প্রাপ্তি শূন্য বলেই মনে করেন বিশ্লেষকদের একাংশ। পশ্চিম এশিয়ার অধিকাংশ আরব রাষ্ট্রে রয়েছে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি। তেহরানের দাপটে আগামী দিনে সেগুলি যুক্তরাষ্ট্রের হাতছাড়া হওয়া একেবারেই অসম্ভব নয়। তা ছাড়া, সামুদ্রিক তেল বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা হরমুজ় প্রণালী বন্ধ রেখেছে সাবেক পারস্য। ফলে বিশ্ব জুড়ে দেখা দিয়েছে জ্বালানি সঙ্কট।
১৭ / ২০
সামরিক ক্ষেত্রে মার্কিন ব্যর্থতার কাহিনি এখানেই শেষ নয়। ১৯৮০ সালে ইরানে অবস্থিতি আমেরিকার দূতাবাসে ঢুকে সেখানকার কর্মীদের পণবন্দি করে একদল বিদ্রোহী। তাঁদের উদ্ধারে ‘অপারেশন ইগল ক্ল’ নামের একটি কমান্ডো অভিযানে নামে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা। যদিও খালি হাতেই ফিরতে হয় তাঁদের। ১৯৮৩ সালে লেবাননে জঙ্গি হামলায় প্রাণ হারান ২৯৯ জন সৈনিক। এদের বড় অংশই ছিলেন ওয়াশিংটনের নাগরিক।
১৮ / ২০
অত্যাধুনিক হাতিয়ার ও অতি শক্তিশালী বাহিনী থাকা সত্ত্বেও লড়াইয়ের ময়দানে আমেরিকার ঘন ঘন ‘পরাজয়ের’ নেপথ্যে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে সে দেশের একটি আইন। তার নাম গোল্ডওয়াটার-নিকোলস অ্যাক্ট। ১৯৮৬ সালের অক্টোবরে তাতে সই করেন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান। এর উপর ভিত্তি করেই একাধিক আঞ্চলিক কমান্ড গড়ে তুলেছে যুক্তরাষ্ট্র। এর মাথায় রয়েছে চার বা পাঁচ তারা জেনারেল।
১৯ / ২০
গোল্ডওয়াটার-নিকোলস আইনের জেরে সামরিক বাহিনীর পুনর্গঠন এবং আধুনিকীকরণে সুবিধা হয় আমেরিকার। কিন্তু, এতে একটা নতুন বিপদের মুখে পড়ে যুক্তরাষ্ট্র। কারণ, নতুন নিয়মে স্বতন্ত্র ভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা পেয়ে গিয়েছেন বিভিন্ন কমান্ডের মাথায় থাকা জেনারেলরা। ফলে যাবতীয় সমস্যাকে সামরিক দৃষ্টিতে দেখতে শুরু করেছেন তাঁরা। তা ছাড়া, কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এবং তাঁদের চিন্তাভাবনার মধ্যে ফারাক তৈরি হচ্ছে।
২০ / ২০
বিশ্বের বিভিন্ন রণাঙ্গনে এরই খেসারত মার্কিন ফৌজ দিচ্ছে বলে স্পষ্ট করেছেন সামরিক বিশ্লেষকদের একাংশ। গত আট দশকে তাদের একমাত্র বড় সাফল্য হল সস্ত্রীক ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তুলে আনা, এ বছরের শুরুতেই কারাকাসে ঢুকে যেটা করেছে আমেরিকার বাহিনী। সংশ্লিষ্ট অভিযানটির সাঙ্কেতিক নাম ‘অপারেশন অ্যাবসোলিউট রিজ়লভ’ বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ দফতরের সদর কার্যালয় পেন্টাগন।
সব ছবি: সংগৃহীত।
পরবর্তী গ্যালারি
ধ্বংসের মুখে ডিজ়নির আদলে তৈরি শত শত দুর্গ! পরিত্যক্ত ‘ভূতুড়ে’ গ্রামের মর্মান্তিক পরিণতির নেপথ্যে কোন রহস্য?
উপসাগরীয় অঞ্চলের ধনী বিনিয়োগকারীদের জন্য ডিজ়নির ধাঁচে তৈরি হয়েছিল শত শত প্রাসাদ। ২০ কোটি ডলার খরচ করে ৫০০টিরও বেশি এমন প্রাসাদ নির্মাণ করা হয়েছিল। আজ পুরো জায়গাটি একটি ‘ভূতুড়ে’ গ্রামে পরিণত হয়েছে। তার বিভীষিকাময় ছবি সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, যা দুঃস্বপ্নের মতো মনে হয়।
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ১২ অক্টোবর ২০২৬ ১২:৩৪
০১ / ১৮
কথিত আছে, রহস্যজনক ভাবে রাতারাতি এলাকা ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন বাসিন্দারা। আসলে বাস্তবে ওই এলাকার দুর্গ বা প্রাসাদগুলি কখনওই সম্পূর্ণ বসবাসযোগ্য ছিল না। অনেক ভিলার বাইরের কাঠামো তৈরি হয়ে গেলেও বিপুলসংখ্যক বাড়ির ভিতরের কাজ, সুযোগ-সুবিধা এবং প্রয়োজনীয় পরিকাঠামোর অভাব ছিল। বসবাসের জন্য প্রস্তুত হওয়ার আগেই বন্ধ হয়ে যায় নির্মাণকাজ। সেই থেকে খালিই পড়ে ছিল প্রাসাদসদৃশ বাড়িগুলি। ধীরে ধীরে এলাকাটি একটি ভূতুড়ে গ্রামের রূপ নেয়। তবে এখন সমাজমাধ্যমের সুবাদে তা বিশ্ব জুড়ে ট্র্যাভেল ভ্লগার এবং ভূতুড়ে জায়গায় ঘুরতে ভালবাসেন এমন মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করছে।
০২ / ১৮
উপসাগরীয় অঞ্চলের ধনী বিনিয়োগকারীদের জন্য ডিজ়নির আদলে তৈরি শত শত প্রাসাদ এখানে খালি পড়ে রয়েছে। নির্মাতারা যখন এই জরাজীর্ণ এলাকাটিকে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করছেন, তখন এর বিভীষিকাময় ছবিগুলি ছড়িয়ে পড়ে নেটমাধ্যমে। আর তা দেখলে দুঃস্বপ্ন বলেই মনে হয়।
০৩ / ১৮
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুসারে, প্রকল্পটির নির্মাণকারী সংস্থা সারোট গ্রুপ ২০ কোটি ডলারের বাজেট থেকে অর্থ উদ্বৃত্ত থাকা সত্ত্বেও সেটি শেষ করার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ জোগাড় করতে ব্যর্থ হয়। ২০১৯ সালে দেউলিয়া সুরক্ষা চেয়ে আবেদন করেছিল তারা।
০৪ / ১৮
এই অঞ্চলটি নিয়ে আরও একটি জনশ্রুতি রয়েছে। শোনা যায়, নির্মাণকারীরা দাবি করেছিলেন ওই এলাকার জলের রোগ নিরামযয়ের বিশেষ ক্ষমতা রয়েছে। তার ভিত্তিতে তাঁরা প্রতিটি বাড়ি গরম রাখার জন্য অঞ্চলের উষ্ণ প্রস্রবণগুলি ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন। সারোট গ্রুপের সিইও মেজ়ের ইয়েরদেলেন ২০১৯ সালে সংবাদমাধ্যম ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “এই জল পান করলে পেটের রোগ এবং কিডনির পাথর সেরে যায়। এতে স্নান করলে ত্বকের সমস্যা, বাত এবং স্লিপ ডিস্কও নিরাময় হতে পারে।”
০৫ / ১৮
কথা হচ্ছে তুরস্কের ‘বুর্জ আল বাবাস’ প্রকল্প নিয়ে। তুরস্কে অবস্থিত এই পরিত্যক্ত গ্রামে প্রকল্পটির নির্মাণকাজ ২০১৪ সালে প্রথম শুরু হয়েছিল। প্রাথমিক ভাবে এটি বিদেশি ক্রেতাদের জন্য একটি বিলাসবহুল আবাসন প্রকল্প হিসেবে পরিকল্পনা করা হয়েছিল। তুরস্কের উত্তর-পশ্চিম পর্বতমালার পাদদেশে অবস্থিত এই গ্রামটিকে ক্ষুদ্রাকৃতি ভিলার একটি ডায়োরামার (অর্থাৎ, ত্রিমাত্রিক প্রতিরূপ বা কোনও বাস্তব ঘটনার ক্ষুদ্রাকৃতির ত্রিমাত্রিক দৃশ্যপট) মতো দেখায়।
০৬ / ১৮
তুরস্কের মুদুরনু শহরের কাছের পাহাড়গুলি থেকে দেখা যায়, ডিজ়নির ধাঁচের সারি সারি একই রকম প্রাসাদ দাঁড়িয়ে রয়েছে মাথা তুলে। কোনও বাস্তব আবাসন প্রকল্পের চেয়ে কল্পজগতের সিনেমার সেট বলে ভুল হতে পারে। বুর্জ আল বাবাস নামের এই উচ্চাভিলাষী প্রকল্পটি ধনী আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের, বিশেষত পশ্চিম এশিয়ার ক্রেতাদের জন্য একটি বিলাসবহুল প্রকল্প হিসেবে পরিকল্পনা করা হয়েছিল। প্রায় ৫৮৭টি প্রাসাদের মতো ভিলা (ফরাসি ভাষায় যাকে ‘শ্যাঁতো’ বলে) আংশিক ভাবে নির্মিত হয়েছিল। সেগুলি ছিল এমন একটি প্রকল্পের অংশ যেখানে ৭০০টিরও বেশি বাড়ি এবং উচ্চ মানের সুযোগ-সুবিধা থাকার কথা ছিল।
০৭ / ১৮
প্রায় ২০ কোটি ডলার মূল্যের এই প্রকল্পটি ২০১৮ সালে হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়। কারণ, এর নির্মাতা সংস্থা সারোট গ্রুপ তীব্র আর্থিক সঙ্কটে পড়ে। এর ফলস্বরূপ এটি বিশ্বের অন্যতম পরিত্যক্ত আবাসন প্রকল্পে পরিণত হয়।
০৮ / ১৮
এই বাড়িগুলি দেখতে সব একই রকম। প্রতিটির নীলচে ধূসর চূড়া আর তাতে গথিক স্থাপত্যশৈলীর আসবাব, যা ডিজ়নির চলচ্চিত্র এবং থিম পার্কের দুর্গগুলির কথা মনে করিয়ে দেয়। কিন্তু তুরস্কের এক বিধ্বংসী অর্থনৈতিক মন্দার কবলে পড়ে একসময়ের সেই বিশাল পরিকল্পনাটি ভেস্তে যায়। ফলে ছোট ছোট সারিবদ্ধ প্রাসাদগুলি সব ফাঁকা হয়ে যায়। এখন এগুলিই বিশ্বের ‘সবচেয়ে ভূতুড়ে’ পরিত্যক্ত বাসস্থানগুলির তালিকায় যুক্ত হয়েছে।
০৯ / ১৮
জানা যায়, ক্রেতাদের জন্য তিনটি ভিন্ন নকশা থেকে বেছে নেওয়ার সুযোগও থাকত। ভিলাগুলি এমন ভাবে নকশা করা হয়েছিল যাতে প্রতিটি তলায় একটি করে জাকুজ়ি থাকে। বাসিন্দাদের জন্য লিফ্ট ও ইনডোর পুল বসানোর পরিকল্পনাও করা হয়েছিল। সারোট গ্রুপের সিইও মেজ়ের ইয়েরদেলেন এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, ৩৫০টিরও বেশি বাড়ি বিক্রি হয়ে গিয়েছিল। সেগুলির দাম অবস্থানভেদে ৩ লক্ষ ৭০ হাজার থেকে ৫ লক্ষ ডলারের মধ্যে।
১০ / ১৮
খবর, ২০১৮ সালে অর্ধেকের বেশি নির্মাণকাজ শুরু হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তুরস্কের অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কার জেরে অনেক ক্রেতাই চুক্তি বাতিল করেন। ২০১৮ সালের অক্টোবরে তুরস্কের মুদ্রাস্ফীতির হার ২৫ শতাংশে পৌঁছেছিল, যা তার আগের ১৫ বছরে সর্বোচ্চ বলে জানা যায়। এর নেপথ্যে মূলত দেশটির মুদ্রা লিরার পতনের প্রভাবই ছিল বেশি। সেই পরিস্থিতিতে মেজ়ের বলেছিলেন, “আমাদের বিক্রি একেবারে বন্ধ হয়ে গিয়েছে। কিছু গ্রাহক তাঁদের চুক্তি বাতিল করেছেন। কেউ কেউ অর্থের লেনদেনও বন্ধ করে দিয়েছেন।”
১১ / ১৮
আজও সেই গ্রামটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। এখানে পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ পরিকাঠামো বা মানুষের বসবাসের কোনও চিহ্নই নেই। শোনা যায়, পরিত্যক্ত দুর্গের মেঝেয় কিছু নির্মাণশ্রমিকের জুতো, মোজা এবং নির্মাণের সরঞ্জামও পড়ে থাকতে দেখা যায়। ঠিক যেন মাঝপথে কাজ ছেড়ে চলে গিয়েছেন তাঁরা।
১২ / ১৮
এই অসমাপ্ত প্রকল্পটিকে আবাসন ব্যবসার ঝুঁকির এক প্রকট স্মারক হিসেবেও উল্লেখ করেছেন বিশেষজ্ঞেরা। তাঁদের দাবি, মুখ থুবড়ে পড়া এই প্রকল্প দেখিয়ে দেয় কী ভাবে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং পরিবর্তনশীল বাজার পরিস্থিতির কারণে সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী প্রকল্পগুলিও ব্যর্থ হতে পারে। নির্মাণকাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকে এই খালি ভিলাগুলি একটি ভৌতিক পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। তা সারা বিশ্বের চিত্রগ্রাহক এবং শহুরে পর্যটকদের আকর্ষণ করছে।
১৩ / ১৮
তুর্কি সংস্থা সারোট গ্রুপের তত্ত্বাবধানে ২০১৪ সালে বুর্জ আল বাবাসের নির্মাণকাজ শুরু হয়। সংস্থাটি ইউরোপীয় ধাঁচের ৭৩২টি ভিলা নির্মাণের পরিকল্পনা করেছিল, যার প্রতিটিতে ফরাসি ‘শ্যাঁতো’র মতো অলঙ্কৃত মিনার, বারান্দা এবং আলঙ্কারিক সম্মুখভাগ থাকার কথা ছিল। বাড়িগুলিকে মূলত উপসাগরীয় দেশগুলির বিত্তশালী ক্রেতাদের অবকাশযাপনের আবাস হিসেবে তৈরি করা হয়েছিল। এই বিরাট পরিকল্পনায় বাজার, রেস্তরাঁ, তুর্কি স্নানাগার, স্পা, খেলাধুলোর ব্যবস্থা এবং বিনোদন কেন্দ্রও অন্তর্ভুক্ত ছিল। লক্ষ্য ছিল, একে শুধু একটি আবাসন প্রকল্প না বানিয়ে একটি বিশেষ বিলাসবহুল কমিউনিটি হিসেবে গড়ে তোলা।
১৪ / ১৮
প্রকল্পটির স্বতন্ত্র স্থাপত্যশৈলী এমন ভাবে নকশা করা হয়েছিল, যাতে এটি আন্তর্জাতিক বিলাসবহুল আবাসন বাজারে স্বতন্ত্র পরিচিতি লাভ করে। নির্মাতাদের বিশ্বাস ছিল, ইউরোপীয় দুর্গের দ্বারা অনুপ্রাণিত বাহ্যিক নকশার সঙ্গে আধুনিক অভ্যন্তরীণ গৃহসজ্জা এবং রিসর্ট-ধাঁচের সুযোগ-সুবিধার সমন্বয়ে তৈরি বাড়িগুলি ধনী বিদেশি ক্রেতাদের আকৃষ্ট করবে। ইস্তানবুল থেকে গাড়িতেই যাতায়াত করা যায় এমন দূরত্বের মধ্যে অবস্থিত এবং বন ও পাহাড় দ্বারা বেষ্টিত হওয়ায়, তুরস্কের জনবহুল উপকূলীয় পর্যটনকেন্দ্রগুলির তুলনায় এটি একটি শান্ত বিকল্প হয়ে উঠবে, এমনটাই বলা হয়েছিল। এর মূল লক্ষ্য ছিল এমন একটি অবকাশযাপনের স্থান তৈরি করা, যা বিলাসবহুল জীবনযাপনকে প্রাকৃতিক পরিবেশের সঙ্গে মিশিয়ে দেবে।
১৫ / ১৮
নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার আগেই প্রায় ৩৫০টি ভিলা বিক্রি হয়ে যায়। তবুও প্রকল্পটি শীঘ্রই মারাত্মক আর্থিক সঙ্কটের সম্মুখীন হয়। তুরস্কের অর্থনৈতিক মন্দা, মুদ্রার অস্থিতিশীলতা এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের চাহিদা কমে যাওয়ায় নির্মাতা সংস্থার উপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয়। সারোট গ্রুপের বিপুল ঋণের বোঝাও বাড়তে থাকে এবং নির্মাণের খরচও বেড়ে যায়। ২০১৮ সালে কাজ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় এবং সংস্থাটি দেউলিয়া সুরক্ষা চেয়ে আবেদন করে। এর ফলে আংশিক ভাবে নির্মিত শত শত ভিলা ক্রেতা বা বাসিন্দা ছাড়াই পড়ে থাকে।
১৬ / ১৮
এখন সেখানে গেলে পর্যটকেরা সেই ভূখণ্ড জুড়ে বিস্তৃত সাদা প্রাসাদের দীর্ঘ সারি দেখতে পাবেন। অনেক ভবনের অন্দরসজ্জা এখনও অসম্পূর্ণ। নির্মাণসামগ্রী খোলা অবস্থায় এবং ঘরগুলি সব খালি পড়ে রয়েছে। সেগুলির কাজ আর কখনও হয়নি। ভিলাগুলির মাঝখান দিয়ে রাস্তা ও পায়ে চলার পথ চলে গিয়েছে। কিন্তু পরিকল্পিত শপিং সেন্টার, স্পা এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।
১৭ / ১৮
দেউলিয়া ঘোষণার কার্যক্রমের পর নির্মাতা সংস্থার সঙ্গে যুক্ত প্রতিনিধিরা আশা করেছিলেন, একটি আর্থিক পুনর্গঠন পরিকল্পনার অধীনে প্রকল্পের কিছু অংশ শেষ পর্যন্ত সম্পন্ন করা যেতে পারে। যদিও এই উন্নয়ন প্রকল্পটি পুনরুজ্জীবিত করার বিষয়ে আলোচনা হলেও বুর্জ আল বাবাসের বিশাল অংশ এখনও অসম্পূর্ণ এবং জনশূন্যই রয়ে গিয়েছে। এই প্রকল্পটি শেষ পর্যন্ত সম্পূর্ণ হবে, পুনর্নির্মিত হবে না কি একটি উচ্চাভিলাষী আবাসন প্রকল্পের ব্যর্থতার স্মারক হিসেবে সংরক্ষিত থাকবে, তা এখনও অনিশ্চিত।
১৮ / ১৮
বুর্জ আল বাবাস নেটমাধ্যমের অন্যতম পরিচিত পরিত্যক্ত নিদর্শন হয়ে উঠেছে। কারণ এটি জাঁকজমকপূর্ণ স্থাপত্যের সঙ্গেই একটি ব্যর্থ বিনিয়োগের গল্পকে জুড়ে দিয়েছে। জনমানবহীন শত শত অভিন্ন প্রাসাদসদৃশ ভিলার দাঁড়িয়ে থাকার ছবি সমাজমাধ্যমে অগণিত ভ্রমণকাহিনি, তথ্যচিত্র এবং পোস্টের জন্ম দিয়েছে। এর আকর্ষণীয় রূপের বাইরেও, এই প্রকল্পটি মনে করিয়ে দেয়, কী ভাবে দ্রুত পরিবর্তনশীল অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী উন্নয়ন প্রকল্পগুলিকেও ভূতুড়ে এলাকায় রূপান্তরিত করতে পারে।
