‘ঢাকের তালে কোমর দোলে…’। জনপ্রিয় বাংলা গান তৈরির বহু আগে থেকে ঢাকের তালে গোটা এলাকা মাতানো ঢাকের হাট বসে বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জে। এই কিশোরগঞ্জ জেলার কটিয়াদী উপজেলার পুরাণ বাজার অর্থাৎ যেখানে এই ঢাকের হাট বিখ্যাত, তা বিশিষ্ট চলচ্চিত্র নির্মাতা সত্যজিৎ রায়ের জন্মস্থান। প্রায় ৫০০ বছর ধরে বসছে ঐতিহ্যবাহী ঢাকের হাট। দুর্গাপুজো শুরুর ঠিক দু-তিনদিন আগে থেকেই অভিনব ঢাকের হাটে মেতে ওঠেন সকলে। বৃহস্পতিবারের হাট ছিল বেশ জমজমাট।
সিলেট জেলার কাজল মিঞার ‘কাজল ব্যান্ড’ কটিয়াদী পৌর এলাকার কালিবাড়ির মণ্ডপের জন্য এদিনই চুক্তি হয়েছে এক লক্ষ ২০ হাজার টাকায়। পুজোয় চুক্তিবদ্ধ হতে দেশের নানা প্রান্ত থেকে ঢাকিদের দল তাঁদের নানা ধরনের বাদ্যযন্ত্র নিয়ে ওই হাটে হাজির হয়েছেন। নেচে নেচে তাঁরা বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা মণ্ডপের কর্তাব্যক্তিদের মনোরঞ্জনের চেষ্টা করছেন। দৃষ্টি আকর্ষণ করতে অনেককে আবার বাহারি পোশাকে সেজে বাদ্যের তালে তালে নাচ দেখিয়েছেন। আর দরকষাকষি করে চুক্তিও করছেন। পুজো শুরুর সপ্তাহ খানেক আগে থেকে তারা হাজির হন। গাজীপুর, মুন্সিগঞ্জের বিক্রমপুর, সিলেট, নারায়ণগঞ্জ, ফরিদপুর-সহ বিভিন্ন জেলার দক্ষ বাদক দল ঢাক, করতাল, খঞ্জনি, সানাই, ট্রামপ্যাড, করতাল ও অন্যান্য বাদ্যযন্ত্র নিয়ে হাটে এসেছেন।
পুজোয় চুক্তিবদ্ধ করার জন্য কিশোরগঞ্জ ছাড়াও পার্শ্ববর্তী নরসিংদী, ময়মনসিংহ, নেত্রকোণা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, হবিগঞ্জ আর সুনামগঞ্জ থেকে পুজোমণ্ডপের কর্তারা এসে প্রতিটি বাদক দলের পরিবেশনা আর দক্ষতা পরখ করে দেখছেন। এরপর দরদাম করে পারিশ্রমিক সাব্যস্ত করে সঙ্গে করে পছন্দের দলটি নিয়ে যাচ্ছেন। ঢাকার গাজীপুরের কোনাবাড়ি এলাকার গণেশ চন্দ্র দে তাদের মণ্ডপের জন্য নরসিংদীর শিবপুরের সত্যেন্দ্র মণি দাস-সহ দুই ঢাকিকে চুক্তিবদ্ধ করেছেন ২১ হাজার ৫০০ টাকায়। আবার বাজিতপুর উপজেলার সচরাচর ইউনিয়নের জহরপুর এলাকার গোপাল সূত্রধর তাঁদের মণ্ডপের জন্য মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার বিক্রমপুরের ভজন দাস ঢাকীকে নিয়েছেন ২০ হাজার টাকায়।
কাপাসিয়া উপজেলার ঢাকী সুমন চন্দ্র মনিদাস এই হাটে আসছেন ২০ বছর ধরে। কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার বারঘরিয়া এলাকার ঢাকি আবু হানিফ এবং জেলা শহরের সতাল এলাকার ঢাকি সোহাগ মিঞা, ট্রামপ্যাড বাদক জয়নাল আসছেন ১৬ বছর ধরে। প্রতিটি পুজো যেতেই বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার দেখা যায়। তবে দুর্গাপুজোর উৎসবে থাকে বাদ্যযন্ত্রের বাড়তি জমজমাট আয়োজন।
ঢাকের হাট ব্যবস্থাপনা কমিটির যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক রতন কুমার সাহা জানালেন, তারা হাটে টেবিল আর রেজিস্টার খাতা নিয়ে বসে সুষ্ঠুভাবে তদারকির দায়িত্ব পালন করেন।মণ্ডপের কর্তা আর ঢাকিদের নাম-ঠিকানা ফোন নম্বর-সহ লিপিবদ্ধ রাখেন। তিনি আরও জানান, এখানে এলাকার রাজা নবরঙ্গ প্রায় ৫০০ বছর আগে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে এই ঐতিহ্যবাহী ঢাকের হাটের প্রচলন করেন। এরপর থেকে প্রতিবছর নিয়মিত হাট বসছে। দেশের নানা প্রান্ত থেকে ঢাকিরা যেমন আসছেন, মণ্ডপের কর্তারাও আসছেন। প্রশাসনের সহায়তায় তাদের সুষ্ঠুভাবে ব্যবস্থাপনা করা হয়ে থাকে। বাইরের ঢাকিদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থাও করা হয়ে থাকে।
