জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধের ক্ষেত্রে প্রায়ই একটি প্রশ্ন সামনে আসে—জমির দলিল একজনের নামে থাকলেও সরকারি রেকর্ড যদি অন্য ব্যক্তির নামে হয়, তাহলে আইনগতভাবে প্রকৃত মালিক হিসেবে কাকে বিবেচনা করা হবে? এ ক্ষেত্রে দলিলের গুরুত্ব বেশি, নাকি জমির রেকর্ডের?
অভিজ্ঞ আইনজীবী সাবের চৌধুরীর মতে, জমির মালিকানা নির্ধারণে দলিল ও খতিয়ান—দুটিই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে শুধু রেকর্ডে নাম থাকলেই কোনো ব্যক্তি জমির চূড়ান্ত মালিক হয়ে যান না। জমির মালিকানা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে বৈধ দলিল, পূর্ববর্তী মালিকানার ধারাবাহিকতা এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক প্রমাণও বিবেচনায় নিতে হয়।
বিষয়টি একটি উদাহরণের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা যায়। ধরুন, কোনো জমির পূর্ববর্তী মালিকের নামে সিএস, এসএ ও আরএস রেকর্ড রয়েছে। ওই মালিকের কাছ থেকে একজন ব্যক্তি ২০ বছর আগে বৈধ দলিলের মাধ্যমে জমিটি কিনেছেন। পরবর্তী সময়ে ক্রেতা বিদেশে চলে যাওয়ায় বা জমির দেখাশোনা করতে না পারায় জমিটির সঙ্গে তার যোগাযোগ কমে যায়। এই সুযোগে অন্য একজন বিএস জরিপে জমিটি নিজের নামে রেকর্ড করিয়ে নেন।
এমন পরিস্থিতিতে শুধু বিএস রেকর্ডে নাম থাকার কারণে নতুন রেকর্ডধারী স্বয়ংক্রিয়ভাবে জমির বৈধ মালিক হয়ে যাবেন না। একইভাবে, দলিল থাকলেই সব পরিস্থিতিতে মালিকানা চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়—এমনটিও নয়। দলিলটি বৈধ কি না, বিক্রেতার জমি বিক্রির অধিকার ছিল কি না এবং মালিকানার ধারাবাহিকতা ঠিক রয়েছে কি না, সেসব বিষয়ও যাচাই করা জরুরি।
আইনগতভাবে জমির খতিয়ান বা রেকর্ড মূলত জমির স্বত্ব ও দখলসংক্রান্ত তথ্যের গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ। তবে রেকর্ডে ভুল থাকতে পারে এবং উপযুক্ত আইনি প্রক্রিয়ায় তা সংশোধনের সুযোগও রয়েছে। অন্যদিকে, নিবন্ধিত দলিল জমি হস্তান্তরের গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হলেও দলিলের বৈধতা ও বিক্রেতার স্বত্বের বিষয়টি প্রয়োজন অনুযায়ী পরীক্ষা করতে হয়।
তাহলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কী?
জমির দলিল একজনের নামে আর রেকর্ড অন্যজনের নামে থাকলে, শুধু একটি নথির ভিত্তিতে প্রকৃত মালিক নির্ধারণ করা ঠিক নয়। দলিল, পূর্ববর্তী খতিয়ান, মালিকানার ধারাবাহিকতা, দখল এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক নথি পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। বিরোধ দেখা দিলে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিস বা উপযুক্ত আদালতের মাধ্যমে বিষয়টির নিষ্পত্তি করা যেতে পারে।
অতএব, জমির মালিকানা নির্ধারণে দলিল ও রেকর্ড—উভয়ই গুরুত্বপূর্ণ। তবে কোনো একটি নথিতে নাম থাকাকে এককভাবে চূড়ান্ত মালিকানার প্রমাণ ধরে নেওয়া উচিত নয়; প্রকৃত স্বত্ব নির্ধারিত হবে সংশ্লিষ্ট সব তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে।