বর্জন না করলে অর্জন করা যায় না। কোনো নতুন কিছু পেতে গেলে কিংবা অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে ত্যাগ, তিতিক্ষা অবশ্যম্ভাবী। পরীক্ষায় ভালো ফলাফল প্রত্যাশা করলে, আদাজল খেয়ে পরীক্ষার জন্য প্রতি নিতে হবে। সেখানে ঘুম, খাওয়া, বিনোদন সবই নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে সাময়িকভাবে শৃঙ্খলিত থাকবে।
কিন্তু মানুষ সহজাতভাবে পেতে প্রত্যাশী। সহজে ও অনায়াসে কাক্সিক্ষত বস্তু পেতে চায়। আমরা সরকারের নিকট থেকে সব ধরনের সাহায্য সহযোগিতা দাবি করি। দাবি পূরণ না হলে আন্দোলনে নেমে পড়ি। আমরা শহরবাসী পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ এবং সকল নাগরিক সুবিধা ভোগ করতে চাই, অথচ সরকারকে কিংবা স্থানীয় প্রশাসনকে সহযোগিতা করবো না।
আমার বাড়ি, আঙিনা আমি পরিষ্কার করব না, নির্দিষ্ট স্থানে আবর্জনা ফেলব না, ড্রেনের মধ্যে পুরানো লেপ, কাঁথা বা অব্যবহৃত নানাবিধ বস্তু ফেলে জমাট বাঁধাবো। বৃষ্টি হলে নর্দমা রাস্তা পানিতে সয়লাব হবে। তখন সরকার আর স্থানীয় প্রশাসনকে কটূক্তি করবো। অর্থাৎ আমরা আমাদের পরিবর্তন করবো না, শুধু পরিবর্তন চাইব।
এই তো ক’দিন হলো প্রধানমন্ত্রী জনগণের প্রতি আহ্বান জানালেন “আসুন আমরা সপ্তাহে দু’দিন ঘরবাড়ি,আঙিনা পরিচ্ছন্ন রাখার উদ্যোগ নিই”। কয়জন প্রভাবিত হবেন জানি না, তবে ঘরবাড়িতে মশা, মাছি, পোকামাকড়, ইঁদুরের উৎপাত হলে বলবো সরকার কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। অথচ অসুস্থ হলে আমার পরিবার বিপদ্গ্রস্ত হবে এতে প্রতিবেশী বা সরকার কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হবে না।
অন্যদিকে সরকার তৃণমূল পর্যায়ে দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য নানা উদ্যোগ গ্রহণ করছেন। কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড ইত্যাদির সূচনা করে হতদরিদ্র পরিবারে কিছু সচ্ছলতা আনতে চাচ্ছেন। অথচ সরকারের নিয়ন্ত্রণ নেই ব্যবসায়ীদের উপর। তেলওয়ালা তেলের দাম, ঔষধওয়ালা ঔষধের দাম, গ্যাসওয়ালা গ্যাসের দাম যার যার ইচ্ছেমতো দাম নির্ধারণ করে বিক্রি করছে। কার্যত সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। ঐ যে প্রণোদনা ঔষধ, তেল, গ্যাস ইত্যাদি ক্রয় করতে চলে যায়। ফলে দরিদ্রতা যেই তিমিরে ছিল, সেখানেই রয়ে গেল। মহৎ উদ্দেশ্য ধূলায় ধূসরিত হলো। এখানেও দেখুন আমরা পরিবর্তন হচ্ছি না, সুযোগ বুঝে আরো মুনাফার জন্য যেন জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছি।
এবার নজর একটু অন্যদিকে দেই। নদী নালা,খাল বিল হাওর ভূমিদস্যুতা, শিল্প বর্জ্য গণ অসচেতনা, বর্জ্য এবং প্রাকৃতিক কারণে এগুলো দিনে দিনে ভরাট হয়ে জল অনিষ্কাশন ও জলাবদ্ধতার সৃষ্টি করে জনজীবন তথা রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন কার্য বাধা সৃষ্টি করছে। সরকার নদী, খাল খননের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। খাল খননের ফলে প্রাকৃতিক জলাধারের সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে কৃষক সেচের জন্য সময়মতো পানি পাবে। কৃষক জলে মাছ পাবে, সাধারণ মানুষ দুটো ধরতে পারবে। খালের পাড়ে ফসলাদি হলে কমবেশি অনেকাংশে পুষ্টি জোগাবে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সদিচ্ছার ফলে অনেক স্থানে খাল খনন সম্ভব হয়েছে বা হচ্ছে। অনেক স্থানে শত চেষ্টা করেও খাল খনন শুরু করানো যাচ্ছে না। উদাহরণ স্বরূপ ঠিকরাবাদ এলাকায় বামমান্দ্রা খালটি পানিসম্পদ মন্ত্রী নির্দেশনা দেওয়ার পরেও নানা অজুহাতে পানি উন্নয়ন বোর্ড খালটি খননের জন্য দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। ফলশ্রুতিতে খালটি দিন দিন ভরাট হচ্ছে, সরকারি স্থানে স্থাপনা গড়ে উঠছে, পরিবেশ বিনষ্ট হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর পরিবেশ উন্নয়ন ও পরিচ্ছন্ন অভিযান মাঠে মারা যাচ্ছে। ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, চিকনগুনিয়া সহ অন্যান্য পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে। স্বাস্থ্যখাত একসময় বিপন্ন হবে।
প্রতিটি মেট্রোপলিটন শহরের নিকটবর্তী অঞ্চল, যাকে শহরতলি বলা হয়-তা মূল শহরের সুবিধা ভোগ করে। খুলনার নিকটবর্তী অঞ্চল, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন অঞ্চলগুলি যাতায়াত ব্যবস্থা, পানি ও তার পয়োনিষ্কাশন সেই মান্ধাতা আমলেরই রয়ে গেছে। উন্নয়নের প্রথম শর্ত হলো যোগাযোগব্যবস্থা। স্থানীয় প্রশাসন কাগজে কলমে ব্যস্ত। বাস্তবতার নিরিখে অসুবিধাগুলো দূরীভূত করার প্রচেষ্টা গ্রহণ করে না। তারা কোনো সময় সরেজমিনে পরিদর্শন করে না। বাংলা প্রবাদ আছে ‘সর্বাঙ্গে ব্যথা ওষুধ লাগাবো কোথা’।
বাংলাদেশের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে এই রোগ ক্রনিক হয়ে গেছে। যেমন সড়ক ও জনপদ বিভাগ। এরা সংস্কারের চেয়ে সংশোধনে বেশী বিশ্বাসী। কোনো রাস্তা ভালোভাবে সংস্কার করলে দীর্ঘস্থায়ী ও আর্থিক অপচয় রোধ করা যায়। তারা সেভাবে না গিয়ে ভাঙা রাস্তা বছরে পাঁচ-সাতবার ক্ষণিক প্রলেপ দিয়ে মেরামত করে, এ মেরামতে সরকারের আর্থিক অপচয় হয় অনেক বেশী। অল্প অল্প বাজেট করে পাঁচ সাত বারে যে খরচ হয় তা একবার করলে এর অর্ধেক খরচ হতো। এখানে সরকারের আর্থিক অপচয় হয় দ্বিগুণ, অথচ তা দৃষ্টিগোচর হয় না।
সওজ বলে এটি এলজিইডি করবে, সিটি কর্পোরেশন বলে এ রাস্তা কেডিএ করবে, এ টানা হেঁচড়ায় জনগণ বছরের পর বছর দুর্ভোগের শিকার হয়। উদাহরণ স্বরূপ, রুপসা সেতু থেকে রুপসা স্ট্যান্ড পর্যন্ত রাস্তাটি পনেরো বছরেও সম্পন্ন হয়নি।
যে দিকে চোখ দিবেন দেখা যায় অনিয়ম, অসহযোগিতা। দলীয় নেতা কর্মী, সরকারি কর্মচারী কেউ সরকারের তথা প্রধানমন্ত্রী মহোদয়ের আহ্বানে আশানুরূপ সাড়া দিচ্ছে না।
এসব দেখে মনে হয় প্রধানমন্ত্রীর ‘আই হ্যাভ-এ প্ল্যান’ এর বিপরীতে অসহযোগিতার প্রতিযোগিতায় ওরাও বলছে ‘উই হ্যাভ এ প্ল্যান’।
লেখক : সহ-সভাপতি, খুলনা সাহিত্য পরিষদ।
খুলনা গেজেট/এনএম
