ওয়াশিংটন, ১৮ অক্টোবর-যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর আসন্ন ভারত সফরকে ঘিরে দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক শুরু হয়েছে। আগামী সোমবার ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে মুম্বাইয়ে বৈঠক করবেন রুবিও। এরপর গুজরাটের জামনগরে একটি তেল শোধনাগার পরিদর্শনে যাওয়ার কথা রয়েছে তার।
তবে এই সফরে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে যাচ্ছেন না রুবিও। এ নিয়ে ভারতের বিরোধী দলগুলো প্রশ্ন তুলেছে, দেশের শীর্ষ কূটনীতিককে কি নিজের দেশের মাটিতেই বিদেশি কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা করার জন্য ‘তলব’ করা হচ্ছে?
যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোরের একটি বক্তব্যের পর এই বিতর্ক আরও বেড়েছে। তিনি জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন আশা করছে, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করসহ দেশটির জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা রুবিওর সঙ্গে দেখা করতে মুম্বাই যাবেন। মার্কিন রাষ্ট্রদূতের এই বক্তব্যের সমালোচনা করে বিরোধী কংগ্রেস দলের নেতারা বলেছেন, বিষয়টি ভারতের কূটনৈতিক মর্যাদার জন্য অস্বস্তিকর।
এমন এক সময়ে এই বিতর্ক সামনে এসেছে, যখন বাণিজ্য, শুল্ক এবং রাশিয়ার কাছ থেকে ভারতের তেল কেনার বিষয় নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের সম্পর্কের মধ্যে টানাপোড়েন চলছে।
রুবিও কী নিয়ে আলোচনা করবেন?
মধ্য এশিয়ার পাঁচটি দেশের সঙ্গে ‘সি৫+১’ সম্মেলনে অংশ নিতে উজবেকিস্তানের সমরকন্দ সফর শেষে রোববার ভারতে পৌঁছানোর কথা রয়েছে মার্কো রুবিওর। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, এই সফরে দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারত্ব, জ্বালানি সহযোগিতা ও বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা করবেন তিনি। পাশাপাশি ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গেও বৈঠক করার কথা রয়েছে তার।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানিয়েছেন, মুম্বাইয়ে বৈঠকে জ্বালানি, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রতিরক্ষা এবং গুরুত্বপূর্ণ ও উদীয়মান প্রযুক্তি নিয়ে আলোচনা হবে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দুর প্রতিবেদন অনুযায়ী, জামনগরে রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের পরিচালিত বিশ্বের বৃহত্তম একক স্থানের তেল শোধনাগার পরিদর্শন করবেন রুবিও। সেখানে আম্বানি পরিবারের আয়োজিত একটি সংবর্ধনা অনুষ্ঠানেও তার অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।
দিল্লি সফর বাদ দেওয়ার কারণ কী?
মার্কো রুবিও কেন নয়াদিল্লি সফর করছেন না, সে বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো কারণ জানানো হয়নি। তবে তার সফরের জ্বালানি ও বিনিয়োগকেন্দ্রিক কর্মসূচিতে গুজরাটের জামনগরের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
ভারতের অন্যতম শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠী রিলায়েন্স যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর জ্বালানি কূটনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভেনেজুয়েলার অপরিশোধিত তেলের অন্যতম বড় ক্রেতা রিলায়েন্স। ওয়াশিংটনও ভারতকে ভেনেজুয়েলার তেল কেনার জন্য উৎসাহ দিচ্ছে।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে নতুন একটি তেল শোধনাগার নির্মাণের প্রকল্পে বিনিয়োগ করছে রিলায়েন্স। সংবাদমাধ্যমটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত মার্চে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই প্রকল্পকে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।
‘তলব’ বিতর্কে সরব বিরোধীরা
বৃহস্পতিবার নয়াদিল্লিতে ব্লুমবার্গ নিউ ইকোনমি ফোরামে বক্তব্য দেওয়ার সময় মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোর বলেন, রুবিওর সঙ্গে বৈঠকের জন্য ওয়াশিংটন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করসহ দেশটির অন্য কর্মকর্তাদের মুম্বাই যাওয়ার প্রত্যাশা করছে।
রাষ্ট্রদূতের এই বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক জয়রাম রমেশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লেখেন, তার বক্তব্য ‘বেশ অস্বাভাবিক’।
লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী আরও কঠোর ভাষায় মন্তব্য করেন। তার ভাষায়, রুবিও যেন নিজের কোনো কর্মচারীকে মুম্বাইয়ে তলব করেছেন। কংগ্রেস নেতা পবন খেরাও বলেন, ভারতের মাটিতে বিদেশি সরকারের পক্ষ থেকে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে তলব করার ঘটনা নজিরবিহীন।
বাণিজ্য ও রাশিয়ার তেল নিয়ে টানাপোড়েন
গত বছর বাণিজ্য আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর ভারতীয় অধিকাংশ পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছিল ট্রাম্প প্রশাসন। পরে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতার কাঠামোর আওতায় এই শুল্ক কমিয়ে ১৮ শতাংশ করা হয়। তবে এরপরের আলোচনা থমকে গেছে।
ভারতের অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ এ মাসে জানিয়েছেন, বাণিজ্য আলোচনা কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। তবে দেশটির বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়াল বলেছেন, চুক্তির প্রথম ধাপ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। তিনি জানান, বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ার মতো প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর তুলনায় ভারতীয় রপ্তানিকারকেরা সুবিধা না পেলে নয়াদিল্লি এই চুক্তিতে সই করবে না।
রাশিয়ার কাছ থেকে ভারতের তেল কেনার বিষয়টিও দুই দেশের সম্পর্কের মধ্যে বড় বিরোধের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি রাশিয়া ও ইরানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরও জোরদার করার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন একটি আইনে রুশ তেল বা গ্যাসের শীর্ষ পাঁচ আমদানিকারক দেশের পণ্যে সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের সুযোগ রাখা হয়েছে। তবে তেলের উচ্চমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং ৩ নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে চাপ কমানোর চেষ্টা হিসেবে শুক্রবার ট্রাম্প নিষেধাজ্ঞা থেকে ছাড় দেওয়ার লক্ষ্যে একটি নির্বাহী আদেশে সই করেছেন।
দুই দেশের মধ্যে এত টানাপোড়েন চললেও প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে সহযোগিতা বেড়েছে। কার্নেগি এনডাওমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের জ্যেষ্ঠ গবেষক সমীর লালওয়ানির মতে, দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে সাধারণ মানুষের ধারণার অবনতি হলেও কৌশলগত সহযোগিতার ভিত্তি এখনো টিকে আছে। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দুই দেশের বাণিজ্য প্রায় ১২ শতাংশ বেড়ে ২৪০ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছিল।
সব মিলিয়ে, মার্কো রুবিওর দিল্লি সফর বাদ দিয়ে মুম্বাইয়ে বৈঠক করার সিদ্ধান্তকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ক শুধু সফরসূচির বিষয় নয়। এর মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের কূটনৈতিক সম্পর্ক, বাণিজ্যিক স্বার্থ এবং জ্বালানিনীতি নিয়ে চলমান টানাপোড়েনও সামনে এসেছে।
এস এম/ ১৮ অক্টোবর ২০২৬
