একটি বহুতল আবাসিক ভবন বাইরে থেকে দেখতে অসাধারণ। আকর্ষণীয় প্রবেশপথ, সুন্দর লবি, সুইমিংপুল, আধুনিক সুযোগ–সুবিধা—সবই আছে। কিন্তু ভেতরে ঢুকে দেখা গেল, পরিবারের সদস্যদের স্বাভাবিকভাবে একসঙ্গে বসার জায়গা নেই, রান্নাঘর ও দৈনন্দিন কাজের পরিসর অস্বস্তিকর এবং ঘরে পর্যাপ্ত আলো–বাতাস আসে না। এমন একটি ভবনকে আমরা কতটা সফল স্থাপত্য বলতে পারি? শুধু সুন্দর দেখালেই কি একটি ভবন বসবাসের উপযোগী হয়ে ওঠে?
আমাদের দেশে সরকারি–বেসরকারি পর্যায়ে প্রতিনিয়ত অসংখ্য ভবন নির্মিত হচ্ছে। আবাসিক বহুতল ভবন, বাণিজ্যিক স্থাপনা, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ নানা প্রকল্প শহরের চেহারা বদলে দিচ্ছে। নির্মাণপ্রযুক্তি উন্নত হচ্ছে, ভবনের উচ্চতা বাড়ছে, নতুন উপকরণ যুক্ত হচ্ছে। কিন্তু ভবনের বাইরের চেহারা নিয়ে যতটা আলোচনা হয়, তার ভেতরে মানুষের জীবন কীভাবে চলবে, তা নিয়ে কি ততটা ভাবা হচ্ছে? নির্মাণের পরিমাণ বাড়লেও পরিকল্পনা, নকশা ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারের মান কতটা এগোচ্ছে?
সমস্যাটি শুধু নকশার নয়, ভবন নির্মাণের পুরো প্রক্রিয়ার। আমাদের দেশে পদ্ধতিগত পরিকল্পনাকে যথেষ্ট গুরুত্ব না দেওয়ার প্রবণতা রয়েছে। অনেকের কাছে স্থপতির কাজ মানেই একটি সুন্দর ভবনের নকশা তৈরি করা। অথচ একটি প্রকল্প কেন হচ্ছে, কার জন্য হচ্ছে, মানুষ সেখানে কীভাবে থাকবে বা কাজ করবে, ভবনটি কীভাবে নির্মিত ও পরিচালিত হবে—এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা থেকেই স্থাপত্যের কাজ শুরু হওয়া উচিত।
একটি প্রকল্পের শুরুতে জমির বৈশিষ্ট্য, ব্যবহারকারীর চাহিদা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা, পরিবেশ ও জলবায়ু বুঝে সামগ্রিক পরিকল্পনা তৈরি করতে হয়। এরপর স্থাপত্যের সঙ্গে যুক্ত হয় কাঠামোগত প্রকৌশল, বৈদ্যুতিক ও যান্ত্রিক ব্যবস্থা, অগ্নিনিরাপত্তা, পানিনিষ্কাশন, ল্যান্ডস্কেপ, আলোকসজ্জাসহ নানা বিশেষায়িত নকশা। নির্মাণ ব্যবস্থাপনা থেকে ভবিষ্যৎ পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণও এর অংশ। এসব কাজ একজন মানুষের পক্ষে একা করা সম্ভব নয়। প্রতিটি ক্ষেত্রের জন্য বিশেষায়িত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা প্রয়োজন। কেউ দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় একাধিক বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করতে পারেন, কিন্তু তার অর্থ সব দায়িত্ব একাই পালন করবেন, তা নয়।

স্থপতির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা হলো বিভিন্ন বিশেষজ্ঞের কাজকে প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে সমন্বিত রাখা। বিশেষ করে বহুতল আবাসিক ভবনের ক্ষেত্রে বাসস্থানের বিন্যাস বা লে–আউটের বিষয়টি নতুন করে ভাবা জরুরি। আমাদের পারিবারিক সম্পর্ক, একসঙ্গে বসবাসের ধরন, অতিথি আপ্যায়ন, রান্নাবান্না, ব্যক্তিগত পরিসর, শিশু ও বয়স্ক মানুষের চাহিদা—সবকিছুর সঙ্গে বাসস্থানের বিন্যাসের সম্পর্ক রয়েছে। অথচ জমির আকার, বিধিনিষেধ কিংবা বাণিজ্যিক চাহিদার অজুহাতে অনেক সময় দুর্বল লে–আউট মেনে নেওয়া হচ্ছে। পরে আকর্ষণীয় বহিরাবরণ ও কিছু বাড়তি সুবিধা দিয়ে ভবনটিকে বাজারজাত করা হচ্ছে। কিন্তু ভবন বিক্রি হয়ে যাওয়া আর ভবনটি বসবাসের জন্য সফল হওয়া এক কথা নয়। একটি পরিবারের জীবনযাপনের ধরন বদলায়, প্রজন্ম বদলায়। সেই পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সুযোগও নকশায় থাকা দরকার।
একইভাবে বিদ্যালয়, হাসপাতাল, অফিস কিংবা সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের নকশাও একধরনের হতে পারে না। প্রতিটি ভবনের ব্যবহারকারীর চাহিদা ও মানসিক অভিজ্ঞতা আলাদা। একটি বিদ্যালয়ে শিশুর স্বাচ্ছন্দ্য, হাসপাতালে রোগীর উদ্বেগ, অফিসে কাজের সমন্বয়—এসবের সঙ্গে স্থাপত্যের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। অথচ আমাদের স্থাপত্যচর্চার দৃশ্যমান অংশ অনেকটাই অভিজাত শ্রেণির প্রকল্পকেন্দ্রিক। সাধারণ মানুষের আবাসন, কর্মপরিবেশ ও জনপরিসরের স্থাপত্য নিয়ে আরও গভীরভাবে কাজ করা প্রয়োজন।
এখানেই অংশগ্রহণমূলক পরিকল্পনার গুরুত্ব। একটি প্রকল্প শুধু উদ্যোক্তা, স্থপতি কিংবা প্রকৌশলীর সিদ্ধান্তে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। যাঁরা ভবনটি ব্যবহার করবেন, তাঁদের অভিজ্ঞতা ও মতামত শুরু থেকে বিবেচনায় আসা দরকার। বিদ্যালয়ের পরিকল্পনায় শিক্ষক–শিক্ষার্থী, হাসপাতালে চিকিৎসক–নার্স–রোগী, আবাসনে বাসিন্দা ও রক্ষণাবেক্ষণকর্মীদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা মূল্যবান। অংশগ্রহণ মানে সবাই মিলে নকশা আঁকা নয়; বরং মানুষের প্রকৃত প্রয়োজন বুঝে বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে তার যথাযথ সমাধান খোঁজা। স্থাপত্যকে অভিজাত পরিসরের বাইরে নিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নের উপায় হিসেবে দেখতে হবে।
আমাদের প্রতিবেশী ভারত ও ভিয়েতনামের কিছু স্থাপত্য উদ্যোগ থেকে শেখার সুযোগ রয়েছে। ভারতের অরণ্য আবাসন প্রকল্পে সীমিত আয়ের মানুষের সামাজিক সম্পর্ক ও সময়ের সঙ্গে বাসস্থান পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ভিয়েতনামের কিছু নগর আবাসনেও সীমিত জমির মধ্যে আলো–বাতাস, সবুজ পরিসর ও পারিবারিক জীবনকে গুরুত্ব দেওয়ার চেষ্টা দেখা যায়। এসব উদাহরণ অনুকরণের জন্য নয়; বরং মনে করিয়ে দেয়, ভালো স্থাপত্যের শুরু স্থানীয় জীবন ও বাস্তবতা থেকে হয়।
আমাদের ভবন পরিকল্পনায় আরেকটি অবহেলিত বিষয় হলো প্রবেশ ও চলাচলের ব্যবস্থা। পার্কিং, গাড়ি ও পথচারীর চলাচল, বৃষ্টির সময় নিরাপদ প্রবেশপথ, র্যাম্প, লিফট এবং জরুরি বহির্গমন শুরু থেকেই বিবেচনায় থাকা দরকার। শিশু, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য সর্বজনীন প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করাও জরুরি। নির্মাণসামগ্রীর মান, কাঠামোগত নিরাপত্তা, ধারণক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ রক্ষণাবেক্ষণ একই পরিকল্পনার অংশ।
এনামুল করিম নির্ঝর
স্থপতি ও চলচ্চিত্র নির্মাতা
