ধরনা অবশ্যই প্রতিবাদ, তবে অহিংস। মানুষকে তা জুড়ে নেবে, আলগা করে দেবে না। নৈতিক কাঠিন্য পরিমাপের জন্য এ শব্দটি জোরালো।
মস্ত বড় ‘স্টার’ তখন অরিন্দম। কোনও সিনেমায় অরিন্দম রয়েছে মানেই যথেষ্ট। সময়বিশেষে, ‘মোর দ্যান এনাফ’। পুরনো এক বন্ধু দেখা করতে এল অরিন্দমের সঙ্গে। প্রাথমিক সম্ভাষণের পরে বন্ধুটি চাইল– অরিন্দমকে কোন একটি বিশেষ স্থানে নিয়ে যেতে। অরিন্দম জানতে চাইল– কোথায়। বন্ধুটি বলল– এমন তো কথা ছিল না! অর্থাৎ বন্ধু যদি অন্য বন্ধুকে কোথাও যেতে বলে, সেটি হবে শর্তহীন, প্রশ্নহীন, বিশ্বাসের সেতুতে ভাসমান। কথা না-বাড়িয়ে অরিন্দম বেরিয়ে পড়ে। অনেকখানি পথ পেরিয়ে তারা আসে একটি বন্ধ কারখানার সামনে, সেখানে কর্মীরা ধরনায় বসেছে, শ্রমিকদের মর্যাদা ও স্বীকৃতির দাবিতে। অরিন্দমের বন্ধুটি অনুরোধ করে, একবারটি নেমে এসে এই বিক্ষোভমুখর জনসমষ্টির পাশে দাঁড়াতে। এতে শ্রমিক-বন্ধুদের মনোবল অটুট থাকবে।
কিন্তু অরিন্দম রাজি হয় না। গাড়ি থেকে নামতে, লোকসমক্ষে যেতে, প্রকাশ্যে কিছু বলতে– সবেতে ‘না’। সে গোপনে অর্থসাহায্য করতে পারে, তবে ফটফটে আলোর মতো রাজনীতির অঙ্কে দৃশ্যমান ও সর্বজনবিদিত হতে নারাজ। অরিন্দম মনে করে, সে যেহেতু সিনেমা জগতের লোক, তাই ছায়াপুতুলের পৃথিবীতেই তাকে মানায় ভাল। মত ও অমতে অকপটে কথা বলা, তার কাজ নয়। একটি ‘ধরনা’-দৃশ্যকে কেন্দ্র করে সত্যজিৎ রায় অরিন্দমের অন্তরমহলের যে-ছবি এঁকেছেন ‘নায়ক’ সিনেমায়, অবিশ্বাস্য বললে কম বা হয়।
মার্কিন আইনজীবী স্যামুয়েল উইলবার্ট টাকার আলেকসান্দ্রিয়া লাইব্রেরিতে সিট-ইন পালন করেছিলেন ১৯৩৯ সালে। লক্ষ্য ছিল, লাইব্রেরি ও লেখাপড়ার প্রক্রিয়া থেকে কৃষ্ণাঙ্গ বিদ্বেষ মুছে দেওয়া।
‘ধরনা’ শব্দের ব্যঞ্জনায় ভারতীয়ত্ব প্রকট। তবে এ শব্দটি প্রধান প্রধান ইংরেজি ভাষার অভিধানে ঠাঁই পেয়েছে বহু দিন হল। ইংরেজিতে অবশ্য ‘ধরনা’ বোঝাতে ‘সিট-ইন’ শব্দটিও ব্যবহারও করা হয়। গত শতকের চারের দশকের আগে থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ‘সিট-ইন’ বোঝাতে একটি নির্দিষ্ট স্থানে বসে শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ জানানোর প্রথা বহমান। মার্কিন আইনজীবী স্যামুয়েল উইলবার্ট টাকার আলেকসান্দ্রিয়া লাইব্রেরিতে সিট-ইন পালন করেছিলেন ১৯৩৯ সালে। লক্ষ্য ছিল, লাইব্রেরি ও লেখাপড়ার প্রক্রিয়া থেকে কৃষ্ণাঙ্গ বিদ্বেষ মুছে দেওয়া। মার্কিন শ্বেতাঙ্গ সমাজে বর্ণ-বিভাজন ও উষ্মা দুই ছিল। টাকার মাধ্যমে তা মুছে দিতে চেয়েছিলেন। ‘ফেলোশিপ অফ রিকনসিলেশন’ গোষ্ঠীর সদস্য জেমস পার্মার জুনিয়র শিকাগোর একটি রেস্তোরাঁর সামনে ২৭ জনকে নিয়ে ধরনায় বসেন। দাবি ছিল, ওই রেস্তোরাঁয় কৃষ্ণাঙ্গদের প্রবেশাধিকার দিতে হবে।
‘ধরনা’-র মতো শব্দকে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের পরিসরে খ্যাত করেছেন মহাত্মা গান্ধী। অহিংসার পথে, শান্তিপূর্ণভাবে, লম্বা সময় ধরে ধরনা চালিয়ে গেলে, ব্রিটিশ মনোবল টাল খাবে, এমনটি ছিল তাঁর সত্যবদ্ধ ধারণা। ভারতের বর্তমান মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি দাগমুক্ত নির্বাচন করাতে পারেননি। বিজেপির বিরোধী দলেরা একত্র। ‘সিজেপি’-ও সমালোচনার মুখর। যন্তর মন্তরে ছিল বিপুল জনসমাবেশ। প্রতিবাদী মানুষ। তবে সদ্য নিয়ম হয়েছে, আর যন্তর মন্তরে প্রতিবাদ দেখানো যাবে না। প্রতিবাদের স্থান কেড়ে নেওয়ায় যেমন প্রশ্ন উঠেছে; তেমনই জিজ্ঞাসা– প্রতিবাদ স্থল পালটে গেলেই কি প্রতিরোধ থেমে যায়?
